কুতুব উদ্দিন


বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া মেজর সিনহা মো: রাশেদ খান (বিএ-৬৯৩১) যশোরের বীর হেমায়েত সড়কের বাসিন্দা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম এরশাদ খান ও হাসিনা আক্তারের একমাত্র পুত্র সন্তান। তাঁর ২ বোন রয়েছে। তাঁর পিতা এরশাদ খান ১৯৮৭-৮৮ সালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইউএনও হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সিনহা মো: রাশেদ খান ১৯৮৪ সালের ২৬ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম আদনান। ঢাকার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইসএসসি পাশ করার পর সিনহা মো: রাশেদ ৫০ তম বিএমএ লং কোর্সের একজন কর্মকর্তা হিসাবে ২০০৪ সালের ২২ ডিসেম্বর মাত্র ২০ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাংলাদেশের এলিট ফোর্স এসএসফ (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) এর একজন বাচাইকৃত চৌকস সেনা অফিসার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও ১৬ বছরের সেনা কর্মজীবনে তিনি সেনাবাহিনীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। মেজর পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় সিনহা মো: রাশেদ খান সেনাবাহিনী থেকে ২০১৮ সালের ২৯ নভেম্বর স্বেচ্ছায় অবসর নেন।
মেজর(অবঃ) রাশেদ খান সিনহা ছিলেন একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। কর্তব্যবোধের প্রতি ছিলেন অসামান্য দৃঢ়চেতা। জীবনযাপনে প্রণালির সারল্য, বন্ধুবাৎসলতা, দায়িত্বের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়, গভীর দেশপ্রেম তাঁকে দিয়েছিল বিশিষ্টতা। জ্ঞানপিপাসা ও পাঠাভ্যাস, মৌলিক চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি, অকুতোভয়ে নিজের বিবেক-অনুযায়ী চলা ও বলা স্বল্পবাক কিন্তু অসাধারণ বাকসিদ্ধ। ছিলেন একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। ক্ষুদ্র জীবনকে একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ না রেখে তাকে উপভোগ করার এক অপূর্ব মানসিকতার অধীকারী ছিলেন। মানুষে প্রতি অনুরাগ ও দায়িত্ববোধ, কঠোর পরিশ্রম এসবই ছিল তাঁর চরিত্রগুণ। জীবনের রূপ, রস, গন্ধকে নিজের মতো করে উপভোগ করাই ছিলো তাঁর স্বপ্ন। তাই তিনি বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনাও করেছিলেন। হতে চেয়েছিলেন একজন ভূপর্যটক।

২০১৬ সালে এক বিবাহ অনুষ্ঠানে তাঁর সাথে আমার আলাপচারিতা। আলাপচারিতা থেকে আস্তে আস্তে তা বন্ধুত্বে পরিণত হয়। মাঝে মাঝে তাঁর নিমন্ত্রণে কর্মস্থল রামু সেনানিবাসে যাওয়া এবং তিনি কক্সবাজার আসলে আড্ডা দেওয়ার মধ্যদিয়ে পরিচয়টা বন্ধুত্বের বন্ধনে রূপান্তরিত হয়। তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানপিপাসু মানুষ। যখনই তাঁর বাসায় যেতাম দেখতাম কোন না কোন বই তিনি পড়ছেন। তাঁর ছিল মানুষকে সহজে আপন করে নেওয়ার একটি অসাধারণ গুণ। ছিলনা কোন আত্ম অহমিকা। শরীরে প্রতি যত্ন নেওয়া ছিল তাঁর একটি নেশা। সামরিক বাহিনীর নিয়মিত অনুশীলন ছাড়াও তিনি দৈনিক ৩/৪ মাইল দৌড়াতেন। বাসায় ছিল শারীরিক অনুশীলনের যাবতীয় সরঞ্জামাদি। এছাড়াও গান শুনা এবং লং ড্রাইভিং ছিল তাঁর হবি। সুযোগ পেলেই তাঁর নিজস্ব কার নিয়ে তিনি লং ড্রাইভিং এ বের হয়ে যেতেন। তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠা, একাগ্রতা, আত্মমর্যাদাবোধ, সাহসীকতা, দায়িত্ববোধ এবং দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা দেখে মনে হয়েছিল একদিন তিনি তাঁর কর্মস্থল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনেক উপরের পর্যায়ে যাবেন এবং দেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন। রামুতে আসার আগে তিনি এসএসএফ এর মত একটি এলিট ফোর্সে ছিল। তারপর রামুতে এসেও তিনি তাঁর দায়িত্ববোধের প্রতি ছিলেন সদা সজাগ। আলোচনার টেবিলে তিনি কখনও তাঁর কর্মপরিধি বা কর্মস্থল নিয়ে কোন আলাপ করতেন না এবং তাঁর প্রকট ব্যক্তিত্বের কারণে তাঁকে সে বিষয়ে কেউ কোন প্রশ্নও করতো না। এমন একজন কর্মঠ, নিষ্ঠাবান মানুষ আমি খুব কম দেখছি। তবে তাঁর ছিল একটা সম্মোহনী শক্তি যার কারণে তিনি সহজে মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। মূলত তাঁর পাঠাভ্যাসই আমাকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। তিনি মাঝে মাঝে আমার থেকে বই পড়তে নিয়ে যেতেন। তবে তাঁর পড়ার বেশির ভাগ বই ছিল দর্শনভিত্তিক। শেষবার যখন তিনি রামু থেকে বদলি হয়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর হাতে আমার থেকে পড়তে নেওয়া দু’টি বই ছিল। আমাকে যখন তিনি বইগুলো ফেরৎ দিতে এবং শেষ বিদায় নিতে আসলেন আমি তাঁকে মহাত্মা আহমদ ছফা’র রচনাবলী’র একটি বই উপহার দিয়ে ছিলাম। সেদিন তিনি খুব খুশি হয়ে বলেছিল বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে এবং যোগাযোগ থাকবে। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস যে মানুষটাকে তাঁর মেধা, দায়িত্ববোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, শৃঙ্খলাবোধ দেখে আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নক্ষত্র ভাবতে শুরু করেছিলাম হঠাৎ শুনলাম তিনি সেনাবাহিনীর চাকুরী ছেড়ে দিয়েছেন। শুনে সেদিন খুব মন খারাপ হয়েছিল। তারপর অনেকদিন কোন যোগাযোগ ছিলনা। হঠাৎ করে গত ৩ জুলাই তিনি ফোন করে বলেন কক্সবাজার এসেছেন সাথে আরও তিনজন আছেন। যেহেতু করোনাকালে অন্য শহর থেকে এসেছেন তাই তিনি টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চত হয়ে নিতে চান তাঁরা কেউ করোনা আক্রান্ত কিনা। আমি ওভার ফোনে তাঁকে কক্সবাজার পৌরসভার কর্তৃক স্থাপিত পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে করোনা সেম্পল কালেকশন সেন্টারে তাঁদের সেম্পল দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিলাম। একজন মানুষ কতটুকু সচেতন হলে নতুন শহরে আসার পর নিজ থেকে করোনা টেস্ট করিয়ে নিশ্চিত হতে চায় তিনি বা তাঁর সঙ্গীরা করোনা আক্রান্ত কিনা।

পরের দিন যথারীতি তাঁদের করেনা টেস্ট হলো। তার পরের দিন তিনি আবার ফোন দিলেন এবং জানতে চাইলেন রিপোর্ট কখন পাবেন। আমি তাঁকে পৌরসভার একজন কর্মকর্তার নাম্বার দিলাম এবং বললাম তাঁর সাথে যোগাযোগ করে রিপোর্টটা নিয়ে নিতে। তারপরের দিন তিনি আমারে আবার ফোন করে বললেন, তিনি এখন ওয়াল্ড বীচ রিসোর্টে আছেন, কিন্তু যেহেতু ২/৩ মাস থাকবেন তাই একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে চান। আমি আমার এক পরিচিত ফ্ল্যাট মালিকে ফোন করে তাঁর ফ্লাইটটি দেখাতে বললাম। কিন্তু পরে শুনলাম ফ্ল্যাট পছন্দ না হওয়ায় তাঁরা চলে গেছেন। এরপর গত ২৩ জুলাই তিনি আমাকে একটা এসএমএস দেন যে তাঁরা এখন হিমছড়িতে নীলিমা রিসোর্টে আছেন, সময় পেলে যেন আমি একবার যাই। কিন্তু দূর্ভাগ্য আমার আর যাওয়া হলোনা। তিনি নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আমি আমার কাজ নিয়ে। কোরবানের দিন বিকেলে ঘুম থেকে উঠে পৌরসভার সেই উপকারী ভাইটির কয়েকটা মিস কল দেখে আমি তাঁকে ফোন ব্যাক করলাম। তিনি আমাকে জানালেন ভাই সিনহা ভাই তো নাই। উনি মারা গেছেন। তাঁর কথা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। এটা কেমন করে হয়? এ হতেই পারেনা। পরে যখন মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টির ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম। তখন আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না। আমার বন্ধু চলে গেলেন অনেকটা অপরিনত বয়সে। জাতীয় জীবনের প্রেক্ষাপটে এমন কিছুসংখ্যক মানুষ থাকেন যাঁদের প্রয়োজন জাতি, সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অপরিহার্য মনে করা হয়। তাঁদের চলে যাওয়া বা অনুপস্থিতি এ জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত। সিনহার মতো এমন মেধা, মনীষা ও মননশীতায় গড়া উজ্জ্বল নক্ষত্রের এই পরিনতির জন্য যারা দায়ী সুষ্ঠু ও নিরেপক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের শাস্তি চাই। আর কোন সিনহা যেন অকালে ঝরে না যায়।


লেখক:  সহকারী রেজিস্ট্রার, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •