মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া মেজর সিনহা মো: রাশেদ (বিএ-৬৯৩১) হত্যাকান্ডের ঘটনা তদন্তে যুগ্মসচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি মঙ্গলবার কক্সবাজারে সরেজমিনে তদন্তে নামছেন। কমিটি আগামীকাল মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলবেন। তাঁরা কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মেরিন ড্রাইভ রোডে বাহারছরা পুলিশ তদন্তকেন্দ্রে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহন, আলামত পর্যবেক্ষন ইত্যাদি কার্যক্রম করবেন। বিশ্বস্ত সুত্র এ তথ্য সিবিএন-কে নিশ্চিত করেছেন।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন-যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান’কে আহবায়ক করে গত ২ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে গঠিত কমিটিতে অপূর্ণ থাকা ২ জন সদস্যও ইতিমধ্যে কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রতিনিধি লে: কর্নেল সাজ্জাদ। যাঁকে মনোনীত করেছেন ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও কক্সবাজারের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মঈন উল্লাহ চৌধুরী। লে: কর্নেল সাজ্জাদ রামু সেনানিবাসের একজন কর্মকর্তা বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম এন্ড অপারেশন্স) মোঃ জাকির হোসেনকে দেওয়া হয়েছে। তাঁকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বিপিএম (বার) পিপিএম মনোনয়ন দিয়েছেন। কমিটি গঠনের আদেশে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিলো। এছাড়া কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোহা. শাজাহান আলি এই তদন্ত কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন, যাকে পূর্বের তদন্ত কমিটিতে আহবায়ক করা হয়েছিলো।

৪ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটিকে ৭ কার্যদিবস অর্থাৎ আগামী ১৬ আগস্টের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। পুনর্গঠিত এই কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে ঘটনার কারণ ও উৎস অনুসন্ধান, দোষীকে সনাক্তকরণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট মতামত দেবেন। তদন্ত কমিটির ৩ সদস্য লে: কর্নেল সাজ্জাদ, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম এন্ড অপারেশন্স) মোঃ জাকির হোসেন ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোহা. শাজাহান আলি কক্সবাজারে রয়েছেন। কমিটির আহবায়ক চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন-যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান’কে মঙ্গলবার সকালে কক্সবাজার পৌঁছাবেন। তদন্ত কমিটি তদন্তের প্রাথমিক কাজ শুরু করে দিয়েছেন। সোমবার তদন্তের কর্মপন্থা নির্ধারণ সহ অন্যান্য অফিসিয়াল কাজকর্ম সেরেছেন।

এদিকে, সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া মেজর সিনহা মো: রাশেদ হত্যার ঘটনা বিস্তারিত জানতে কক্সবাজারে অবস্থানরত পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বিপিএম (বার) পিপিএম সোমবার ৩ আগস্ট সকালে বাহারছরা তদন্ত কেন্দ্রের ঘটনা স্থল পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে তাঁর সাথে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম এন্ড অপারেনন্স) মো. জাকির হোসেন, কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বিপিএম (বার) সহ জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন।

গত ৩১ আগস্ট রাত্রে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ রোডে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া মেজর সিনহা মো: রাশেদ (৩৬) তাঁর কক্সবাজারমূখী প্রাইভেট কারটি নিয়ে টেকনাফের বাহারছরা শামলাপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের চেকপোস্টে পৌঁছালে গাড়িটি পুলিশ থামিয় দেয়। তখন সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া মেজর সিনহা মো: রাশেদ উপর দিকে তার হাততুলে তার কার থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে তাঁকে তদন্ত কেন্দ্রর ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী গুলি করে হত্যা করে বলে সেনা সদর থেকে গণমাধ্যমে প্রেরিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।

এ ঘটনায় পুলিশের টেকনাফের বাহারছরা তদন্ত কেন্দ্রর ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী সহ ২০ পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড করা হয়েছে। রোববার ২ আগস্ট সকালে তাদেরকে ক্লোজড করে পুলিশ লাইনে নিয়ে আসা হয়। একইসাথে বাহারছরা তদন্ত কেন্দ্রে কক্সবাজার জেলা পুলিশ থেকে নতুন পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বিপিএম (বার) গণমাধ্যমকে বলেছেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া মেজর সিনহা মো: রাশেদ খান এর মৃতদেহ কক্সবাজার থেকে যশোরে ২ আগস্ট নেওয়া হলে সেখানে এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। মেজর (অব:) সিনহা মো: রাশেদ খানকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় যশোর সেনানিবাসের কবরস্থানে দাফন করা হয়।

পুলিশের গুলিতে খুন হওয়া অবসর নেওয়া মেজর সিনহা মো: রাশেদ যশোরের বীর হেমায়েত সড়কের বাসিন্দা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম এরশাদ খান ও হাসিনা আক্তারের একমাত্র পুত্র সন্তান। তিনি ১৯৮৪ সালের ২৬ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া মেজর সিনহা মো: রাশেদ ৫০ তম বিএমএ লং কোর্সের একজন কর্মকর্তা হিসাবে ২০০৪ সালের ২২ ডিসেম্বর সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাংলাদেশের এলিট ফোর্স এসএসফ (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) এ একজন বাচাইকৃত চৌকস সেনা অফিসার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। মেজর পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় সিনহা মো: রাশেদ খান সেনাবাহিনী থেকে ২০১৮ সালের ২৯ নভেম্বর স্বেচ্ছায় অবসর নেন। ঢাকাস্থ স্টামফোর্ট ইউনিভার্সিটির ফ্লিম এন্ড মিডিয়া বিভাগ থেকে জাস্ট গো নামক একটি কোম্পানির পক্ষে ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়ার জন্য প্রামাণ্য তথ্য চিত্র নির্মানের লক্ষ্যে গত ৩ জুলাই থেকে তিনি ও আরো ৪ জন কক্সবাজারের হিমছড়ি নিলীমা রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •