মোঃ ফারুক, পেকুয়া:
সাইফুল ইসলাম রুবেল। পশ্চিম উজানটিয়া পাড়ার মোস্তাক আহমদের ছেলে। উজানটিয়া ইউনিয়ন পরিষদস্থ ডিজিটাল সেন্টারে উদ্যোক্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম চৌধুরীর একনিষ্ঠ সমর্থক হিসাবে বিগত ৫ বছর ধরে উদ্যোক্তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভূয়া জন্ম নিবন্ধন বানিয়ে দেয়া, সার্ভার কপি বের করতে অতিরিক্ত টাকা আদায়, চেয়ারম্যান আর সচিবের স্বাক্ষর স্ক্যান করে জন্ম নিবন্ধন দেয়া, টাকা না দিলে আইডি কার্ড জব্দ, প্রত্যায়নপত্র দিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায়, জনপ্রতিনিধিদের দেয়া ত্রাণের তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়ার মত গুরুতর অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা। এমনকি এসমস্ত ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে উদ্যোক্তা সাইফুল ইসলাম রুবেল ও তার অনুসারীর হাতে হামলার শিকারও হয়েছেন বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী।

এমনকি গত ২২ জুলাই ডাব্লিউএফপি’র দেয়া আর্থিক টাকা থেকে জনপ্রতি ১শ টাকা করে কেটে নেয়ার পর স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে ফেরত দিতে বাধ্য হন। সর্বশেষ গত ২জুলাই পশ্চিম উজানটিয়ার বাসিন্দা লাল মিয়ার ছেলে আবুল করিম বাদি হয়ে পেকুয়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ওই অভিযোগে সাইফুল ইসলাম রুবেল ইয়াবা বিক্রির সাথে জড়িত বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন। এসব ঘটনার কারণে স্থানীয়রা তার বিরুদ্ধে গণসাক্ষর করে লিখিত অভিযোগ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী পেকুয়ারচর এলাকার বাসিন্দা পেঠানের ছেলে নুরুল ইসলাম অভিযোগ করে জানান, আমার ছেলে মো. এমরানের জন্ম নিবন্ধন কার্ডের জন্য রুবেলের কাছে গেলে সে ১৬০০ টাকার বিনিময়ে আমাকে একটি কার্ড দেন। পরে দেখি তার দেওয়া কার্ডের তথ্য অনুসারে অনলাইনে ভেরিফাই কপি পাওয়া যাচ্ছেনা। সম্পূর্ন ভূয়া একটি জন্ম নিবন্ধন তিনি আমাকে দিয়েছেন। এ বিষয়ে আমি চেয়ারম্যানকে অবহিত করলে চেয়ারম্যান টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য রুবেলকে নির্দেশ দেয়। কিন্তু এখনো আমার টাকা ফেরত দেয়নি।

পেকুয়ার চরের মোস্তাক আহমেদের ছেলে আব্দুস সালাম বলেন, আমাকেও ভূয়া জন্ম নিবন্ধন দিয়ে ৮০০ টাকা নেয় রুবেল। পরে স্থানীয় এক গণমাধ্যমকর্মীর সহায়তায় আমাকে ৩০০ টাকা ফেরত দেয়।

ষাট দুনিয়া পাড়ার বানুর হোছনের ছেলে আবদুচ ছোবহান বলেন, আমি পরিষদে বিচারের কাজে গিয়ে ফটোকপি করার জন্য আইডি কার্ডটি রুবেলের হাতে দিলে তিনি ফটোকপি করে আমাকে দেন। পরে মূল আইডি কার্ড খুঁজলে আমার কাছ থেকে দুই হাজার টাকা দাবী করেন। টাকা দিতে না পারাতে আমাকে ৩ ঘন্টা পরিষদে তার রুমে আটকে রাখে। একই এলাকার বাসিন্দা সাহাব উদ্দিনের ছেলে মোঃ বেলাল বলেন, পাসপোর্টের জন্য একটি প্রত্যায়ন থেকে সাইফুল ইসলাম আমার কাছ থেকে ৫শ টাকা আদায় করেন।

ঠান্ডার পাড়ার ইদ্রিস মিয়ার ছেলে মোঃ রাসেল বলেন, গত ২৩ জুলাই ডাব্লিউএফপি’র দেয়া আর্থিক টাকা নেয়ার জন্য ইউপি কার্যালয়ে যায়। ওই সময় আইডি কার্ডের একটি সার্ভার কপির জন্য সাইফুর ইসলাম রুবেলের কাছে গেলে তিনি আমার কাছ থেকে ৬শ টাকা দাবী করেন। পরে স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতিবাদের মুখে অতিরিক্ত টাকা ছাড়ায় আমাকে সার্ভার কপি দিতে বাধ্য হন।

ত্রাণের জন্য জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশকৃত তালিকা থেকেও এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে উদ্যোক্তা রুবেলের বিরুদ্ধে। ইউপি সদস্য পারভিন আক্তার এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আমার সুপারিশকৃত তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য তাকে চেয়ারম্যান আর আমি বকাবকি করার পাশাপাশি পরবর্তীতে এমন কাজ না করার জন্য সতর্কতা করেছি।

সর্বশেষ গত ২জুলাই পশ্চিম উজানটিয়ার বাসিন্দা লাল মিয়ার ছেলে আবুল করিম বাদি হয়ে পেকুয়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ওই অভিযোগের বেশ কয়েকজন বিবাদীর মধ্যে সাইফুল ইসলাম রুবেল ইয়াবা বিক্রি ও নিরহ লোকদের হুমকি দেয়ার মত অভিযোগে জড়িত বলে উল্লেখ করেন। বর্তমানে পেকুয়া থানার শিমুল নাথ অভিযোগটির তদন্ত করছে।

এবিষয়ে জানতে চাইলে ইউপির উদ্যোক্তা সাইফুল ইসলাম রুবেল বলেন, একটি অভিযোগ ছিল তা সত্য। চেয়ারম্যান স্যার বলার সাথে সাথে ওই লোকের টাকাগুলো ফেরত দিয়ে দিয়েছি। ডাব্লিউএফপি’র টাকা দেয়ার সময় চৌকিদার ১শ টাকা করে নিয়েছিল তা আবার ফেরত দেয়া হয়েছে। অন্য সব অভিযোগ মিথ্যা। আমি চেয়ারম্যানের লোক হিসাবে একটি মহল চক্রান্ত শুরু করেছে। আর থানায় যেই অভিযোগ দেয়া হয়েছে তাদের সাথে আমাদের পারিবারিক শত্রুতা আছে। আমি মাদক বিক্রিতো দূরের কথা আমি কখনো সিগারেট পর্যন্ত খাইনি।

স্বাক্ষর জালিয়াতির ব্যাপারে উজানটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোজাহের আহমেদ বলেন, উদ্যোক্তা সাইফুল ইসলাম কর্তৃক আমার স্বাক্ষর স্ক্যান করে ভূয়া জন্ম নিবন্ধন তৈরি করা কপিটি আমি দেখেছি। আমাকে না জানিয়ে এভাবে স্বাক্ষর জালিয়াতি করাটা আমার জন্য খুবই বিব্রতকর। এটা প্রতারণামূলক অপরাধ। আমি বিষয়টি চেয়ারম্যানের সাথে আলোচনা করবো।

উজানটিয়া ইউপি চেয়ারম্যান এম শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নুরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি একটি অভিযোগের ব্যাপারে আমাকে জানানোর সাথে সাথে টাকাগুলো ফেরত দেয়ার জন্য বলেছি। আর কোন অভিযোগ আমাকে কেউ অবগত করেনি। চেয়ারম্যান হিসাবে ওই অভিযোগগুলো আমাকে আগে করা দরকার ছিল। এছাড়াও সাইফুল ইসলাম বর্তমান এক ইউপি সদস্যের আত্মীয়। সাবেক এক ইউপি সদস্যের সাথে তাদের ভোটের রাজনীতি রয়েছে। স্থানীয় কোন্দলের বিষয়টি তারা ইউপি কার্যালয়ে নিয়ে আসতে চাচ্ছে বলে আমি মনে করি। আর স্থানীয় কিছু মানুষ সুবিধাভোগ করার জন্য তাকে ব্যবহারও করেছে। এছাড়াও সামনে যেহেতু ভোট এসেছে তাই চক্রান্তকারীরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ শুরু করেছে। এ বিষয়ে সাংবাদিক ভাইয়েরা সরেজমিন তদন্ত করলে সত্যতা পাবে।

এবিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা(ইউএনও) সাঈকা সাহাদাত বলেন, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •