মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুস্কুলে নির্মিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলবায়ু উদ্বাস্তু আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২০ টি ভবনের নামকরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে।নির্মাণাধীন ভবনটি সহ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নামকরণকৃত ২০টি ভবনের নাম হলো : (১) সাম্পান (২) কেওড়া (৩) রজনীগন্ধা (৪) গন্ধরাজ (৫) হাসনাহেনা (৬) কামিনী (৭) গুলমোহর (৮) গোলাপ (৯) সোনালী (১০) নীলাম্বরী (১১) ঝিনুক (১২) কোরাল (১৩) মুক্তা (১৪) প্রবাল (১৫) সোপান (১৬) মনখালী (১৭) শনখালী (১৮) দোলনচাঁপা (১৯) ইনানী ও (২০) বাঁকখালী।

বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থান করা প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মাহবুব হোসেন খুরুস্কুল আশ্রয়ণের ভবন গুলোর নামকরণের বিষয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি আরো জানান, প্রকল্পের আবাসিক ভবনগুলো সব ৫ তলা হলেও একটি ভবন হবে দশ তলা। যার নাম হবে “শেখ হাসিনা টাওয়ার”। এই ভবনের অবস্থান হবে পর্যটন জোনে।

বৃহস্পতিবার ২৩ জুলাই সকাল সাড়ে ১০ টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৫৩ একর জমির উপর ১৩৯ টি বহুতল ভবন নির্মিত হবে। প্রকল্পে পুনর্বাসন করা হবে মোট ৪ হাজার ৪ শত ৯ টি পরিবারকে। প্রথম পর্যায়ে সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে ১৯ টি বহুতল ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ করেছে। আর একটি ভবনের নির্মাণ কাজ চলছে।

উদ্বোধনের মাধ্যমে ৬০০ জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারকে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
প্রতিটি পাঁচতলা ভবনে থাকছে ৪৫৬ বর্গফুট আয়তনের ৩২টি করে ফ্ল্যাট।

কক্সবাজার শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে খুরুশকুলে বাঁকখালী নদীর তীরে ২৫৩ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে এই ‘বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প’। পুরো এলাকাকে চারটি জোনে ভাগ করে ক্রমান্বয়ে ১৩৯টি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করা হবে সেখানে।

সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ১৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হলে এসব ভবনে বসবাসের সুযোগ পাবে ৪ হাজার ৪০৯টি জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার। যারা কক্সবাজার বিমানবন্দরের নিকটে ফদনার ডেইল, কুতুবদিয়া পাড়া, চরপাড়া ও সমিতি পাড়ায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন বহু বছর ধরে। ১০০১ টাকার নামমাত্র মূল্যে এসব ফ্ল্যাট পাবে উদ্বাস্তুর জীবন কাটানো পরিবারগুলো।

প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন বলেন, এটাই দেশের সবচেয়ে বড় আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্প । “জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর জন্য এখানে যে পুনর্বাসন, এটাকে আমরা বিশ্বের বৃহত্তম জলবায়ু পুনর্বাসন প্রকল্প বলতে পারি। এ ধরনের প্রকল্প পৃথিবীতে বিরল।”

১৯৯৭ সালের ১৯ মে কক্সবাজার জেলাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওইসব এলাকা পরিদর্শন করে গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনের তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন। সেই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৭ সালে ‘আশ্রয়ণ’ নামে প্রথম প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

এর আগে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প শুরু হয় ২০১০ সালে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল ৩ লাখ ১৯ হাজার ১৪০টি পরিবার ঘর পেয়েছে।

অন্যান্য আশ্রয়কেন্দ্রগুলো তৈরি করা হয়েছে পাকা ও আধা পাকা দালানের ব্যারাক আকারে। বহুতল ভবনে ফ্ল্যাট নির্মাণ খুরুশকুলের এই আশ্রয়ণ প্রকল্পেই দেশে প্রথম বলে জানান, প্রকল্প পরিচালক মাহবুব হোসেন। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের আবাসনের জন্য এই বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষে শুরু হয় ভবন নির্মাণ।

কক্সবাজারের জেলা প্রসাশক মোঃ কামাল হোসেন জানান, কক্সবাজার বিমানবনন্দর সম্প্রসারণের সময় ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবারের তালিকা করা হয়। তারাই এ প্রকল্পে বসবাসের সুযোগ পাবে। এই প্রকল্প দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জেলা প্রসাশকের নেতৃত্বে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন আরো জানান, বৃহস্পতিবার ২৩ জুলাই উদ্বোধনের সকল প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

শহর থেকে খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পে যাওয়ার জন্য সুপ্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পের ভেতরের রাস্তা নির্মাণের কাজও শেষ হয়েছে। কাটা হয়েছে পুকুর। জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার জন্য নদীর পাশে সাত মিটার উঁচু বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, ৪৫৬ বর্গফুট আয়তনের প্রতিটি ফ্ল্যাটে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সিলিন্ডারের সুবিধা থাকবে। প্রকল্প এলাকায় থাকবে ফায়ার স্টেশন, পুলিশ ফাঁড়ি। প্রতিটি ভবনের ওপর সৌর বিদ্যুতের প্যানেল স্থাপন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের সঙ্গে নদীর ধারে ঝাউবন করার নির্দেশ দিয়েছেন জানিয়ে মাহবুব হোসেন বলেন, “আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম এবং ভারনারেবল ২০ গ্রুপের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে।”

প্রকল্পের নির্মাণ কাজের দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর দশম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং এরিয়া কমান্ডার মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, “এটি অত্যন্ত নয়নাভিরাম একটি জায়গা। এই জায়গাটিকে সুরক্ষিত করার জন্য মাটি ভরাট করে অনেক উঁচু করা হয়েছে। প্রতিটি ভবনের নিচের তলায় কোনো ফ্ল্যাট রাখা হয়নি। ফলে ঘূর্ণিঝড় হলে জলোচ্ছ্বাসের পানি ঢোকারও কোন আশঙ্কা নেই।”

তিনি জানান, সুপেয় পানির জন্য ইতোমধ্যে ১০টি গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। দুটি পুকুরও খনন করা হয়েছে। স্কুল তৈরি করা হয়েছে। প্রচুর তালগাছ ও ঝাউগাছ লাগানো হয়েছে।

২০২৩ সালে পুরো প্রকল্পের কাজ যখন শেষ হবে, তখন এখানে যে কেবল ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবার আশ্রয় পাবে, তা নয়। প্রায় ১০০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হবে আধুনিক পর্যটন জোন। ১৪টি খেলার মাঠ, সবুজ চত্বর, মসজিদ, মন্দির, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পুলিশ ফাঁড়ি, ফায়ার স্টেশন, তিনটি পুকুর, নদীতে দুটি জেটি, বিদ্যুতের ২টি সাবস্টেশন থাকবে এখানে।

২০ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ৩৬ কিলোমিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য পরিশোধন ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা, তীর রক্ষা বাঁধ, ছোট সেতু, ঘাটলা ও খাল থাকবে পুরো প্রকল্প এলাকায়।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, আশ্রয়ণ কেন্দ্রে যারা ফ্ল্যাট পাবেন তাদের ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে।

যারা ফ্ল্যাট পাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই মসজীবী। সে কারণে সেখানে একটি শুঁটকি মহালও থাকবে। সেজন্য বিক্রয় কেন্দ্র ও প্যাকেজিং শিল্পও গড়ে তোলা হবে সেখানে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •