ইসলাম মাহমুদ:

কক্সবাজারের রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ির বাঁকখালী নদীতে অবৈধ ভাবে স্যালো ইঞ্জিন চালিত মাটি কাটার ড্রেজার দিয়ে ড্রেজিং করে জোরপূর্বক মাটি ও বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে স্থানীয় প্রভাবশালী পেশাদার বালু খেকোরা।

এর ফলে স্থানীয় নদী তীরবর্তীদের ফসলি জমি ও বাড়িঘর বিলিন হওয়ার আশঙ্কায় দুটি গ্রামের মানুষের মাঝে চাপা আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়রা একাধিক বার বাঁধা দিয়েও বালু খেকোদের রোধ করতে পারেনি। উপরন্তু শুনতে হচ্ছে নানা হুমকি ধামকি।

শুধু তাই নয়, প্রশাসনের অবহেলায় বালু দস্যুরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রভাবশালীরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নদীর গভীর থেকে প্রতিদিন অসংখ্য ট্রাক বালু উত্তোলন করছে। এতে ওই এলাকায় কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো ব্লক খুলে পড়ছে। দুই গ্রামের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়েছে। ভুক্তভোগীরা বালু উত্তোলন বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও ফল পাচ্ছে না। তারা এ ব্যাপারে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সবার কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নদীর উত্তর পাড়ের খরুলিয়া কোনার পাড়া গ্রামের ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে বেলাল, দুধু মিয়াসহ স্থানীয় একটি সংঘবদ্ধ বালুখেকো চক্র দক্ষিণ মিঠাছড়ির পশ্চিম উমখালী গ্রামে বাঁকখালী নদীতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্লগের উত্তরপাশে বাঁকখালী নদীর মাঝে ২-টি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে প্রকাশ্যে মাটি ও বালু উত্তোলন করছে। প্রতিদিন তারা শত শত ট্রাক বালু উত্তোলন ও বিক্রি করে লাভবান হলেও এলাকার ফসলি জমি, নদীর পাড়ের ব্লগ ও বিভিন্ন স্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে। এতে নদীর তীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

উমখালী গ্রামের কয়েকজন বলেন, গত বছরও কোনারপাড়ার ছাত্রলীগ নেতা ‘জাহানঙ্গীর সিন্ডিকেট’ ওয়েস্টার্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাথে মিলে কয়েকশ কোটি টাকার বালু উত্তোলন করে। তখন নদী গর্তে আমাদের পাঁচ একর ফসলি জমি বিলীন হয়ে যায়। কয়েকশ কোটি টাকার বালু বিক্রি করেও তারা ক্ষান্ত হয়নি। এবার তাদের নিজস্ব ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করেছে। বালু দস্যুরা এলাকার প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তাদের বাধা দেয়ার সাহস করে না। এরা এবার ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নদীর গভীর থেকে বালু উত্তোলন করছে। এতে গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় পাড়ে বসানো ব্লগ, ঘর-বাড়ী, নদীর তীরবর্তী উমখালী, পশ্চিম উমখালী, মিঠাছড়ি, ঘাটপাড়া গ্রামসহ শত শত বিঘা আবাদি জমি ভাঙনের মুখে পড়েছে।

এদিকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে গ্রামের মানুষ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানালেও কোনো লাভ হয়নি। উপজেলা প্রশাসন আসছে এমন খবরে তারা আগে থেকেই সবকিছু গুছিয়ে সটকে পড়েন বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগীরা জানান, ড্রেজিং পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করা হলে ভরা বর্ষায় তাদের অবশিষ্ট বসত ভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলন হবে।

পশ্চিম উমখালী গ্রামের বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বলেন, শুকনো মৌসুমে এখানে আমরা চাষাবাদ করে জীাবকা নির্বাহ করতাম, কিন্তু অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করায় নদীর গভীরতা বেড়ে ভাঙ্গনের আশংকা দেখা দিয়েছে, এভাবে মাটি উত্তোলন করতে থাকলে আমাদের বাড়ী ঘর নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। নিষেধ করতে গেলে তারা আমাদের হত্যার হুমকি দেয়।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ২০১০ সালে বালু উত্তোলন নীতিমালায় যন্ত্রচালিত মেশিন দ্বারা ড্রেজিং পদ্ধতিতে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়াও সেতু, কালভার্ট, রেললাইনসহ মূল্যবান স্থাপনার এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন করা বেআইনি। অথচ বালু দস্যুরা সরকারি ওই আইন অমান্য করে মিঠাছড়ি-রাজারকুল সড়কের ২০ গজ দূরে থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে।

বালু উত্তোলনকারী জাহানঙ্গীর বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমি আমার জমি থেকে বালু উত্তোলন করতেছি এবং আমার বানানো রাস্তা দিয়ে বালু বহনকারী গাড়ী চলাচল করতেছে, তাতে কারো কি আসে যায় তা আমার দেখার বিষয় না।

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা বলেন, গ্রামবাসীর অভিযোগ পেয়েছি। খুব শিগগিরই উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) কক্সবাজার এর প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালি উত্তোলনের ফলে নদীর তীরবর্তী বাড়িঘর ভেঙে যাচ্ছে। মেশিনের শব্দে সৃষ্টি হচ্ছে মারাত্মক শব্দদূষণ। করোনার মধ্যে যারা এসব অবৈধ কাজে জড়িত তাদের অচিরেই আইনের আওতায় জরুরি।

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের কক্সবাজার জেলা সভাপতি এড. আবুহেনা মোস্তফা কামাল বলেন, বাঁকখালী নদীতে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালি উত্তোলন করায় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। অনেকেরই বসতঘর ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। অবিলম্বে এসব অবৈধ মেশিন বন্ধ করা জরুরি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •