সিবিএন ডেস্ক:

চলমান করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারিতে আক্রান্তদের টেস্ট ও রোগীদের চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৪৯৮ কোটি ৫৫ লাখ ৯৮ হাজার ২০০ টাকা বরাদ্দ চায় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ। কিন্তু এ মহামারিতে স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম-দুর্নীতি যেন মহাআকার ধারণ করেছে। এর আগের ছাড়কৃত অর্থের মধ্যে অন্তত ২০ কোটি টাকার বিল ভাউচার ঠিকমতো দাখিল করেনি স্বাস্থ্য বিভাগ। এছাড়া এন-৯৫ মাস্কসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয় ও হাসপাতালের কর্মীদের খাবারের বিলসহ অন্যান্য খরচের যথাযথ স্বচ্ছতার ব্যাপারে বিস্তর অভিযোগ ওঠায় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের চাহিদার অর্থ ছাড় করছে না অর্থ বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

তবে অর্থ বিভাগ থেকে এ টাকা ছাড় না করায় সেবা বিভাগের সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি) পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান অর্থ সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের নিকট দেয়া চিঠিতে বলেছেন, টাকা ছাড় করা না হলে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। তীব্র জন-অসন্তোষ তৈরি হবে। এতে করে সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। সর্বোপরি এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারে।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) বলছে, করোনা পরীক্ষা ও কোভিড-১৯ রোগের চিকিৎসা নিয়মিত রাখা, অত্যাবশ্যক মেডিকেল সরঞ্জামের সাপ্লাই চেইন অব্যাহত রাখা, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানসমূহের আস্থা ধরে রাখা, সিএমএসডিসহ সরকারের ভাবমূর্তি সমুজ্জ্বল রাখা তথা অতি জরুরি জনস্বার্থে জরুরিভিত্তিতে ৪৯৮ কোটি ৫৫ লাখ ৯৮ হাজার ২০০ টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন। তাই সম্প্রতি এ পরিমাণ টাকা বরাদ্দ চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ।

সিএমএসডি পরিচালক চিঠিতে বলেছেন, স্বাস্থ্য বিভাগের কেনাকাটায় অতীতে কোনো এক সিন্ডিকেটের যড়যন্ত্র ও প্রভাব অন্য ঠিকাদারকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। তবে তিনি চিঠিতে সরাসরি মিঠু সিন্ডিকেটের কথা না বললেও বলেছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কেনাকাটার বাজার নিয়ন্ত্রণকারী আগের মুষ্টিমেয় প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানসমূহকে নানাভাবে ভয়ভীতি ও প্রলোভন প্রদর্শন করছে। মালামাল সরবরাহ করা হলেও ঠিক সময়ে বিল পাওয়া যাবে না মর্মে প্রচার করে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারা আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। এই ‌‘মুষ্টিমেয় সিন্ডিকেট’ বলতে মিঠু সিন্ডিকেটকেই বোঝানে হয়েছে বলে মনে করেন অর্থবিভাগ ও দুদকের কর্মকর্তারা।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগার বলছে, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন মেডিকেল সামগ্রী জরুরি ভিত্তিতে কেনা প্রয়োজন। এজন্য অন্তত ২৭৯ কোটি টাকা জরুরি ভিত্তিতে ছাড় না করলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে কার্যাদেশ প্রদানকৃত তিন লাখ ৭৫ হাজার পিসিআর টেস্ট কিটের মূল্য ৮৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) থেকে দুই লাখ টেস্ট স্যাম্পল কিট (ডিটিএম ও সোয়াব স্টিক) কেনার জন্য ৩৩ কোটি ৩২ লাখ টাকার বিল বকেয়া রয়েছে। যার ফলে নতুন করে আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরবরাহকারীদের বিল পরিশোধ করতে না পারলে আস্থার সংকট দেখা দেবে।

একই সঙ্গে, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনা সত্ত্বেও অন্য প্রতিযোগী কোম্পানিগুলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ভুল তথ্য সরবরাহ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই অবস্থায় করোনা মোকাবিলায় জরুরি থোক বরাদ্দ হিসেবে আরও ১০০ কোটি টাকা ছাড়া করার অনুরোধ করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সবমিলিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ২৭৯ কোটি ৪৯ লাখ ৮ হাজার ২০০ টাকা ছাড় না করলে টেস্ট কিট, হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, পোর্টেবল এক্সরে মেশিন, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর, আইসিইউ বেড ইত্যাদির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে আংশিক বিলও পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।

এর আগে ২৪ জুন অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের এক সভার কার্যবিরণীতে বলা হয়, এসব মেডিকেলসামগ্রী কেনার জন্য ইতোমধ্যেই মন্ত্রিসভার অনুমোদন নেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ও অর্থনেতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটিতেও অনুমোদিত হয়েছে। সেখানে এসব সামগ্রী সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনার জন্য সুপারিশ করেছে কমিটি দুটি। ওই কার্যবিরণীতেও বলা হয়, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বকেয়া বিল দিতে না পারায় আমদানি বিঘ্নিত হচ্ছে। অথচ কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ প্রতিদিনই বাড়ছে। ফলে টেস্ট বাড়াতে না পারলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে চিকিৎসা ব্যবস্থা।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এটা একটা কন্টিনিউয়াস প্রসেস। অর্থ ছাড়ে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। কিন্তু সংক্রমণ যেহেতু বাড়ছে তাই আমাদের টেস্ট বাড়ানো জরুরি। এজন্য আমাদের আরও বেশি পরিমাণে টেস্ট কিটের প্রয়োজন।’

তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যখাত তো দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। অর্থবিভাগ তাদের কেনাকাটা নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছে সেটা খুবই যৌক্তিক। সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কেনাকাটা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে যেগুলো গ্রহণযোগ্য নয়।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •