নিজস্ব প্রতিবেদক:
করোনাকালে বেসরকারি প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক গুলোতে সংকুচিত হয়ে পড়েছে প্রসবজনিত সেবা। এমনকি করোনার ভয় বা করোনা রোগীর চাপে সরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতেও প্রসবজনিত মাতৃসেবা সংকুচিত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়াসহ আরো কিছু এলাকার মানুষের প্রসবজনিত মাতৃসেবার ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে কক্সবাজারের স্বনামধন্য হোপ ফাউন্ডেশন পরিচালিত হোপ হাসপাতাল ও জেলার বিভিন্ন স্থানের বার্থসেন্টারগুলো। কোথাও নিরাপত্তা ও সঠিক সেবা না পাওয়ার আশঙ্কায় প্রসবজনিত মাতৃসেবায় হোপ হসপিটাল ও হোপ বার্থসেন্টারগুলোতে ছুটে যাচ্ছে রোগীরা । রোগী বাড়লেও হোপ কর্তৃপক্ষ সেবা দিতে কোনোর ধরণের ঘাটতি রাখছে না। রোগী বাড়ার সাথে সাথে জরুরী সেবার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলসহ সব ধরণের সরঞ্জামও বৃদ্ধি করেছে। এতে ধারণ ক্ষমতার অধিক রোগীদের নিরবিচ্ছন্ন চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রেখেছে। এতে রোগীসহ সবার বেশ প্রশংসা কুড়াচ্ছে হোপ ফাউন্ডেশন।

হোপ ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, হোপ ফাউন্ডেশন ফর উইমেন এন্ড চিলড্রেন অব বাংলাদেশ পরিচালনায় কক্সবাজার সদর ও রামু উপজেলায় ৭টি ইউনিয়নে হোপ বার্থ সেন্টার/ডেলিভারী সেন্টার রয়েছে। চার বছর ধরে সেব বার্থসেন্টারের প্রসবসহ মাতৃসেবা দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে রামুর চেইন্দাস্থ হোপ হসপিটালেও প্রসবসহ নিরবিচ্ছিন্ন মাতৃসেবা অব্যাহত রয়েছে। এভাবে চিকিৎসা সেবায় ইতোমধ্যেই হোপ হসপিটাল ও হোপ বার্থসেন্টারগুলো মানুষের আস্থা ও প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

চলমান মহামারী করোনার সময়ে গ্রামের গর্ভবতী ও প্রসবজনিত মায়েরা কোথাও স্বাভাবিক চিকিৎসা পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে তাদের আস্থার ঠিকানা হয়ে উঠেছে হোপ হসপিটাল ও সাতটি হোপ বার্থসেন্টার। সেখানে গর্ভবতী ও প্রসবজনিত মায়েদের দিন-রাত ২৪ ঘন্টা স্বল্পমূল্যে/বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। হোপ হসপিটাল ছাড়াও করোনা কারণে রামু উপজেলার গর্জনিয়া, ঈদগড়, খুনিয়াপালং এবং কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল, পোকখালী, ঈদগাহ ও ভারুয়াখালীর বার্থসেন্টারগুলোতে রোগীদের অসংখ্য গর্ভবতী মায়ের সেবা ও স্বাভাবিক প্রসব সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সেন্টারগুলোতে দক্ষ মিডওয়াইফ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দিয়ে বর্তমানে প্রতিমাসে প্রায় ১০০টি নরমাল ডেলিভারী করা হচ্ছে। সঠিক পর্যবেক্ষণ ও সময় মতো চিকিৎসা ও প্রসবের কারণে অপ্রয়োজনীয় সিজারের সংখ্যা কমাতে হোপ সেন্টারগুলো বড় ধরণের ভূমিকা রাখছে।

হোপ ডেলিভারী সেন্টারের মিডওয়াইফরা হোপ হসপিটালের গাইনী বিশেষজ্ঞদের সাথে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে পরামর্শ করে জটিল ডেলিভারীও সম্পন্ন করে থাকে। করোনার কারণে সেবাপ্রার্থীরা সেন্টারগুলোতে আসতে না পারলে তাদেরকে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। অন্যদিকে স্বাভাবিক প্রসবে বাধাগ্রস্থ হলে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হোপ হসিপটালের নিজস্ব এ্যাম্বুলেন্সের রোগীকে তাৎক্ষনিক হোপ হাসপাতালে কিংবা নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অথবা কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়ে থাকে।

গর্জনিয়া বার্থ সেন্টার/ডেলিভারী সেন্টারের সেবাপ্রদান প্রসঙ্গে গর্জনিয়া বার্থ সেন্টারের মিডওয়াইফ ঝিলকি শর্মা বলেন ‘তিন বছর হোপ ফাউন্ডেশনের মিডওয়াইফারি কোর্স সম্পন্ন করে সরকারীভাবে লাইসেন্স গ্রহণ করেই গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসব পরবর্তী সেবা প্রদান করছি। আমি মনে করি, মিডওয়াইফরাই পারে মায়ের যথাযথ সেবা দিয়ে নরমাল ডেলিভারী সম্পন্ন করতে।

ঈদগাহ বার্থ সেন্টারের মিডওয়াইফ হাফসা খানম বলেন, ‘গর্ভবতী মায়ের জীবন সবচেয়ে বেশি দামী। কারণ তার পেটে একটি বাচ্চাও আছে। তাই করোনাকালীন সময়েও আমরা মায়েদের পাশে আছি এবং থাকবো’

ভারুয়াখালী বার্থ সেন্টারের সেবাপ্রদানকারী প্যারামেডিক সাবিনা আক্তার বলেন, ‘প্রায় চার বছর ধরে অত্র এলাকায় মায়েদের সেবা প্রদান করে যাচ্ছি। দিনে-রাতে যখন প্রয়োজন তখনই গর্ভবতী মায়েরা সেবা নিতে আসে, তাই আমি মনে করি এটা শুধু চাকুরী নয় বরং মানব সেবা করার একটি বড় প্রতিষ্ঠানও বটে।’

হোপ ফাউন্ডেশনের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর আজমুল হুদা জানান, এই করোনাকালীন সময়ে ৭টি হোপ বার্থ সেন্টার দিন রাত ২৪ ঘন্টা মায়েদের সেবা দিচ্ছে। আমরা নিরবিচ্ছিন্নভাবে ওইসব মিডওয়াইফদের প্রয়োজনীয় ঔষধ ও সরঞ্জমাদি জীবনের ঝুঁকি নিয়েও পৌঁছে দিচ্ছি। কোন গর্ভবতী মা যেন সেবা থেকে বঞ্চিত না হয় আর এই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।

তিনি আরো জানান, হোপ বার্থ/ডেলিভারী সেন্টারের অন্যান্য সেবাসমুহ হচ্ছে, প্রেগন্যান্সী পরীক্ষা, গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রসব পরবর্তী সেবা, নবজাতকের সেবা, পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক পরামর্শ ও সেবা, ডায়োবেটিস পরীক্ষা, রক্ত ও প্রস্্রাব পরীক্ষা, নেবুলাইজেশন, বøাড প্রেসার চেক, ভেকসিন বা টিকা প্রদান ইত্যাদি। উক্ত বার্থ সেন্টারসমূহ ২৪/৭ খোলা থাকে। এছাড়াও, হোপ ডেলিভারী সেন্টারে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প এর আয়োজন করা হয়, যেখানে হোপ হাসপাতালের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ফ্রি রোগী দেখেন এবং রোগীদের ফ্রি ঔষধ প্রদান করা হয়।

হোপ ফাউন্ডেশন এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর কেএম জাহিদুজ্জামান বলেন, `মানুষের সেবায় হোপ ফাউন্ডেশন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে হোপ ফাউন্ডেশনের এই সকল বার্থ/ডেলিভারী সেন্টার যথেষ্ট ভুমিকা রাখছে বলে মনে করি। যে সকল এলাকা এখনও সেবা বঞ্চিত পর্যায়ক্রমে সেখানেও খুব শিগ্রই হোপ বার্থ/ডেলিভারী সেন্টার স্থাপন করা হবে।’

রামু উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নোবেল কুমার বড়ুয়া বলেন, `২০১৮ সাল থেকে হোপ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে গর্জনিয়া স্বাস্থ্য উপকেন্দ্রে ডেলিভারী শুরু হয়। করোনাকালীন সময়েও গর্জনিয়া স্বাস্থ্য উপকেন্দ্রের মিডওয়াইফরা অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কোন জটিল ডেলিভারী হলে তারা রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-এ পাঠিয়ে দেয়। হোপ ফাউন্ডেশনের এই চিকিৎসা সেবা এই করোনাকালে স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরণের ভূমিকা রাখছে। তাদের এই সেবা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা রইল।’

প্রসঙ্গত, কক্সবাজারের কৃতি সন্তান আমেরিকা প্রবাসী ডা. ইফতিখার মাহমুদ মিনার এর অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধার মাধ্যমে ১৯৯৯ সাল থেকে কক্সবাজার জেলায় হোপ হসপিটালের মাধ্যমে মাতৃমৃত্যু, শিশু মৃত্যুর হার কমানো এবং ফিস্টুলা মুক্ত করার জন্যই বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রমসমুহ পরিচালনা করছে। বর্তমানে হোপ ফাউন্ডেশন ২৩টি হাসপাতাল, মাতৃ ক্লিনিক ও মেডিক্যাল সেন্টারের মাধ্যমে কক্সবাজার জেলায় স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •