সিবিএন ডেস্ক:
‘একটা কিডনি রেখে দিয়ে করোনার টেস্ট করাই দিয়েন। তিন-চার মাস ধরে কামাই বন্ধ’- এমন মন্তব্য করে সম্প্রতি সংবাদের শিরোনাম হন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাঈম হাসান নীল নামে এক তরুণ। বেসরকারি ব্রাহ্মণবাড়ি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে করোনার পরীক্ষা করতে গেলে সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি টাকা নেয়ার অভিযোগ এনে তিনি এমন মন্তব্য করেন। এ ঘটনা থেকে বোঝা যেতে পারে, করোনার প্রভাবে বিধ্বস্ত দরিদ্র মানুষের কাছে পরীক্ষার ফি দেয়া কতটা কষ্টসাধ্য।

এদিকে গত ২৮ জুন দেশের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে করোনা পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সরকারি পর্যায়েও টাকা দিয়ে করোনা পরীক্ষার বিধান চালুর পর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা ও শনাক্তে। ফি চালুর পর কমেছে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার হার, স্বাভাবিকভাবেই কমেছে শনাক্তের হারও।

করোনাভাইরাস পরীক্ষার ফি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত সরকারের কোনো কৌশল হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কোনো কৌশল হিসেবে সরকার যদি এ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তবে এটা হবে আত্মঘাতী। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। কারণ তাদের পক্ষে ২০০ টাকা ফি ও আনুষঙ্গিক খরচ করা কষ্টসাধ্য।

প্রজ্ঞাপন জারির আগের ৭ দিন (২১ থেকে ২৭ জুন) এবং পরের ৭ দিনের (১ থেকে ৭ জুলাই) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ফি চালুর আগের ৭ দিনে সন্দেহভাজন করোনা আক্রান্তের নমুনা সংগ্রহ হয় ১ লাখ ১৭ হাজার ৭২৫টি এবং ফি চালুর পর নমুনা সংগ্রহ করা হয় ১ লাখ ৬ হাজার ১৫৩টি। অর্থাৎ ফি চালুর পর এক সপ্তাহে নমুনা সংগ্রহ কমেছে ১১ হাজার ৫৭২টি। ফি চালুর আগের ৭ দিনে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ১৫৭টি এবং ফি চালুর পরে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৩২০টি। অর্থাৎ ফি চালুর পর পরীক্ষা কমেছে ৮ হাজার ৮৩৭টি। ফি চালুর আগের ৭ দিনে করোনা শনাক্ত হয়েছে ২৫ হাজার ২০৭ জনের এবং ফি চালুর পরে শনাক্ত হয়েছে ২৩ হাজার ১৬২ জনের। অর্থাৎ ফি চালুর পরের ৭ দিনে শনাক্ত কমেছে ২ হাজার ৪৫টি।

এ বিষয়ে কথা বলতে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদকে ফোন দেয়া হলে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে দ্য হাঙ্গার প্রজেক্টের গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা গবেষণার বিষয়। তবে প্রশ্ন জাগে, সরকার এমন কৌশল হাতে নিয়েছে কি না– কম পরীক্ষা, কম শনাক্ত, কম মৃত্যু। তার মানে সমস্যাও নেই। যেটা ট্রাম্প (যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প) সাহেব যুক্তরাষ্ট্রে করার চেষ্টা করছেন। এটা হবে আত্মঘাতী ও বুমেরাং। এর ফল হবে ভয়াবহ। আমাদের আরও পরীক্ষা করা দরকার, শনাক্ত করা দরকার। শনাক্ত হলে তাদের আলাদা করা যাবে, চিকিৎসা দেয়া যাবে, অন্যদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা যাবে।’

বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, ‘এটা স্বাভাবিক যে, নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ২০০ টাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আনুষঙ্গিক খরচ আছে। কাজেই ফি নির্ধারণ করে দেয়া এবং নমুনা কমিয়ে দেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, ফি নির্ধারণের আগে ২১ থেকে ২৭ জুন নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৭২৫টি, পরীক্ষা করা হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ১৫৭টি এবং শনাক্ত হয়েছে ২৫ হাজার ২০৭টি। তার মধ্যে ২১ জুন নমুনা ১৫ হাজার ৭১০টি, পরীক্ষা ১৫ হাজার ৫৮৫টি ও শনাক্ত ৩ হাজার ৫৩১ জন; ২২ জুন নমুনা সংগ্রহ ১৬ হাজার ২৮৭টি, পরীক্ষা ১৫ হাজার ৫৫৫টি ও শনাক্ত ৩ হাজার ৪৮০ জন; ২৩ জুন নমুনা সংগ্রহ ১৭ হাজার ৫৬৩টি, ১৬ হাজার ২৯২টি ও শনাক্ত ৩ হাজার ৪১২ জন; ২৪ জুন নমুনা সংগ্রহ ১৭ হাজার ২৪৫টি, পরীক্ষা ১৬ হাজার ৪৩৩টি ও শনাক্ত ৩ হাজার ৪৬২ জন; ২৫ জুন নমুনা সংগ্রহ ১৭ হাজার ৫৮৬টি, পরীক্ষা ১৭ হাজার ৯৯৯টি, শনাক্ত ৩ হাজার ৯৪৬ জন; ২৬ জুন নমুনা সংগ্রহ ১৮ হাজার ২৭৫টি, পরীক্ষা ১৮ হাজার ৪৯৮টি ও শনাক্ত ৩ হাজার ৮৬৮টি এবং ২৭ জুন নমুনা সংগ্রহ ১৫ হাজার ৫৯টি, পরীক্ষা ১৫ হাজার ১৫৭টি ও শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৫০৪ জন।

ফি নির্ধারণের পরে ১ থেকে ৭ জুলাই সময়ে নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ১৫৩টি, পরীক্ষা হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৩২০টি এবং শনাক্ত হয়েছে ২৩ হাজার ১৬২টি। তার মধ্যে ১ জুলাই নমুনা সংগ্রহ ১৬ হাজার ৮৯৮টি, পরীক্ষা ১৭ হাজার ৮৭৫টি, শনাক্ত ৩ হাজার ৭৭৫ জন; ২ জুলাই নমুনা সংগ্রহ ১৭ হাজার ৯৪৭টি, পরীক্ষা ১৮ হাজার ৩৬২টি ও শনাক্ত ৪ হাজার ১৯ জন; ৩ জুলাই নমুনা সংগ্রহ ১৪ হাজার ৭৮১, পরীক্ষা ১৪ হাজার ৬৫০টি ও শনাক্ত ৩ হাজার ১১৪ জন; ৪ জুলাই নমুনা সংগ্রহ ১৩ হাজার ৮৭১টি, পরীক্ষা ১৪ হাজার ২৭টি ও শনাক্ত ৩ হাজার ২৮৮ জন; ৫ জুলাই নমুনা সংগ্রহ ১৩ হাজার ৯৬৪টি, পরীক্ষা ১৩ হাজার ৯৮৮টি ও শনাক্ত ২ হাজার ৭৩৮ জন; ৬ জুলাই নমুনা সংগ্রহ ১৫ হাজার ২০১টি, পরীক্ষা ১৪ হাজার ২৪৫টি ও শনাক্ত ৩ হাজার ২০১টি এবং ৭ জুলাই নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ১৩ হাজার ৪৯১টি, পরীক্ষা হয়েছে ১৩ হাজার ১৭৩টি ও শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ২৭ জন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •