সিবিএন ডেস্ক:

কিশোর, তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে জঙ্গিবাদবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টির বিষয়টিকে প্রধান টার্গেট করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে জঙ্গিবাদবিরোধী পুলিশের বিশেষায়িত সংস্থা ‘অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট’। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জঙ্গিদের প্রধান টার্গেটই হচ্ছে শিক্ষার্থী, কিশোর ও তরুণরা। তাই কীভাবে তাদের জঙ্গিবাদের থাবা থেকে রক্ষা করা যায়, সেদিকেই খেয়াল রাখছে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট। সেজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম চালানো হচ্ছে পুরোদমে। এছাড়া দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে কীভাবে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কাজগুলো এগিয়ে নেওয়া যায়, সেই কাজ চলছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট সূত্র জানায়, জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমনে আগে বেশি কাজ করতো র‌্যাব। ২০১৩ সালের পর থেকে টার্গেট কিলিং শুরু করে জঙ্গিরা। ২০১৫ সালের দিকে টার্গেট কিলিং বেড়ে গেলে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপর জঙ্গিবাদ দমনে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অধীনে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) নামে একটি নতুন ইউনিট গঠন করা হয়। ডিএমপির ইউনিট হিসেবে তাদের কার্যক্রমের পরিধিও ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে আইজিপির নির্দেশে ঢাকার বাইরেও তাদের অপারেশন চালাতে হয়েছিল। যে কারণে জাতীয়ভাবে কাজ করতে পুলিশের কাঠামোতে ‘অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট’ নামে আরেকটি ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের অনুমোদন দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে এই ইউনিটের গঠন ও এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৫৮১টি পদ সৃষ্টি করা হয়। এরমধ্যে স্থায়ীভাবে ৩১টি ক্যাডার পদ এবং ৫৫০টি পদ অস্থায়ীভাবে সৃষ্টি করা হয়। যানবাহন যুক্ত করা হয় ৪১টি।

পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের কার্যক্রম এখন রাজধানীর বারিধারার বি-ব্লকের ৩৫ নম্বর বাড়ির অস্থায়ী কার্যালয়ে চলছে। স্থায়ীভাবে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের কার্যালয় স্থাপনের জন্য পূর্বাচলের পাশে জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। একই জায়গায় পুলিশ লাইনও স্থাপন করা হবে। ইউনিটের জন্য যানবাহন ছাড়াও টেকনোলজিক্যাল যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে। এছাড়া এই ইউনিটের মধ্যেই এলআইসি (ল’ফুল ইন্টারসেপশন সেল) শাখা হবে। যা এখন পুলিশ সদর দফতর থেকে পরিচালিত হচ্ছে একজন এআইজির তত্ত্বাবধানে।

অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের বর্তমান কার্যক্রম ও সক্ষমতার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন) মো. মনিরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সক্ষমতা বলতে আইনি সক্ষমতা, সরঞ্জামের সক্ষমতা এবং জনবলের সক্ষমতা। জনবলের সক্ষমতার একটা পর্যায়ে আমরা গিয়েছি। আর সরঞ্জামের সক্ষমতার ক্ষেত্রে কিছু এসেছে। কিছু প্রক্রিয়াধীন আছে। ইউনিটের পক্ষ থেকে আমরা একটা চাহিদাও দিয়েছি সরকারকে। এগুলো সরকারের বিবেচনাধীন আছে। তারপর নিজস্ব ভবন, পুলিশ লাইন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার বিষয়গুলো সরকারের বিবেচনাধীন আছে। কিছু হচ্ছে। কিছু পাইপ লাইনে আছে। আর ইতোমধ্যে আমাদের জনবলের একটা অংশ এসেছে। প্রশিক্ষণ চলছে। বিশেষায়িত একটা ইউনিট গড়ে তুলতে তো সময় লাগে। এখানে মূল শক্তিটা হচ্ছে ক্যাপাসিটি। আমরা নানামুখী প্রশিক্ষণের মধ্যে আছি।

অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইউনিটের জন্য একটি ডাটা সেন্টারসহ আরও কিছু জিনিসের কাজ চলছে। যেমন একটা ভবন করলে দেখা যায়, কিন্তু একটা ডাটাবেজ করলে দেখা যায় না। অথচ এ ধরনের সংস্থার জন্য ভবনের চেয়ে ডাটাবেজটা বেশি জরুরি। পর্দার আড়ালে এ ধরনের কিছু কাজ চলছে। আর এ সংস্থার অনেক কাজ হচ্ছে অপ্রকাশ্যে। যেগুলো সঙ্গত কারণেই প্রকাশ করা হয় না। বিধিমালা পাস হওয়ার পর বেশ কিছু অপারেশন হয়েছে। অন্তত ১০টা মামলা আমরা নিজেরা তদন্ত করেছি। নিজেরা বাদী হয়ে কিছু মামলা দায়ের করেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রধান টার্গেট করে মোটিভেশনাল কাজগুলো এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ বছরের শুরুতে নতুন গতিতে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু করোনার কারণে সেটা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অপারেশনাল কার্যক্রমটাও কিছুটা স্তিমিত। তবে অ্যান্টি টেররিজম পুলিশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হবে। সরকারও এটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। গড়ে উঠতে একটু সময় লাগবে। সময় দিতে হবে। আমরা আমাদের কাজের ভিত্তিটা শক্ত করেই গড়ে তুলছি।

করোনায় জঙ্গিরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে কিনা জানতে চাইলে মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এটা আমি সঠিক মনে করি না। করোনা কিংবা দুর্যোগ বিষয় না। জঙ্গিরা তাদের প্রস্তুতি বা কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। আমরাও আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। ২ বছর আগেও জঙ্গিবাদের যে আতঙ্কটা দেশের মানুষের মধ্যে ছিল, সেটা এখন নেই। সরকারের মেকানিজমের সাফল্য হচ্ছে এটাই। সরকার বা আমরা কখনও বলি নাই যে জঙ্গি কিংবা তাদের কার্যক্রম নেই। তারা তাদের কাজ করছে। আমরা আমাদের কাজ করছি। নিবিড় নজরদারিটা তাদের প্রতি আমাদের আছে। আমরা মনে করি না যে তারা নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে।

জঙ্গিদের টার্গেট কিলিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান বলেন, জঙ্গিরা সুযোগ পেলে আবারও এই টার্গেট কিলিং চালাবে। তবে অর্গানাইজড ওয়েতে ওদের সাংগঠনিক ও অপারেশনাল সক্ষমতার বিষয়টি আর নেই। অস্ত্র ও অর্থ এ দুটোর সাপ্লাই চেইনটা নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অসম্ভব না। তারা তাদের চেষ্টা করবে, আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। এর ভেতর দিয়ে মানুষের মধ্যে যতটুকু স্বস্তি দেওয়া যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জঙ্গিদের তৎপরতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটা মানুষের মঙ্গলের জন্যই এসেছে। কিন্তু এটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে। ধর্মের নামে জঙ্গিরা যেসব কার্যক্রম করে সেক্ষেত্রে তাদের টার্গেট থাকে কিশোর ও তরুণরা। কারণ এদের বুদ্ধিটা পরিপক্ব নয়। একটু আবেগি মন থাকে। সেজন্য তাদের ও তাদের অভিভাবকদের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে ইন্টারনেট ব্যবহারে সতর্ক থাকার জন্য। কারণ, সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহারের ট্রেন্ডটা রয়ে গেছে। জঙ্গিবাদ বা ধর্মের নামে মানুষ হত্যা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করা কোনও ধর্মই সমর্থন করে না। এটা পুলিশ বা সরকারের বক্তব্য নয়, যারা আলেম-ওলামা বা ইসলামি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি তাদের বক্তব্য। এসব বিষয়ে পরিবারের পাশাপাশি পাঠ্যবইয়ে এগুলো থাকা দরকার। আমরা বারবার বলেছি ট্রাফিকিং ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটা পাঠ্যবইয়ে থাকা উচিত। সারা দুনিয়ায় এটা আছে। কীভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করবে। এখন যেহেতু ইন্টারনেট আমাদের জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে, সেজন্য এ বিষয়ে ছোটবেলা থেকে শেখানো উচিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক সময় আমাদের সেভাবে সার্ভিলেন্স ছিল না। কিন্তু বর্তমানে আমরা একটা কাউন্টার মেকানিজম তৈরি করেছি। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটই এ কাজটি করে থাকে। সরকারের অন্যান্য সংস্থাও এ ব্যাপারে কাজ করছে। মানুষের মধ্যেও অনেক সচেতনতা এসেছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •