এ্যাম্বুলেন্স চালানোর পেশাটিতে মানবিকতার ঘাটতি পড়েছে

মৃত্যুর সাথে লড়াই -০২

প্রকাশ: ১ জুলাই, ২০২০ ০৩:৪০ , আপডেট: ১ জুলাই, ২০২০ ০৩:৪৬

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


জাহাঙ্গীর আলমঃ

এ্যাম্বুলেন্স এর সাইরেন বাজিয়ে যাওয়ার শব্দটি সবসময় বেদনাদায়ক এবং কষ্টের। এ্যাম্বুলেন্স চালানো পেশাটি মানবিক একটি পেশা। কিন্তু পেশাটিতে কিছুটা মানবিকতার ঘাটতি চোখে পড়েছে। প্রতিটি এ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেন চালানোর মত একজন দক্ষ লোক থাকা দরকার। ড্রাইভারই গাড়ি চালাচ্ছে পাশাপাশি সে অক্সিজেন ও নিয়ন্ত্রন করছে। দ্রুত গতিতে গন্তব্যে পৌঁছানোই যেন তার একমাত্র উদ্দেশ্যে। বারবার বলছিলাম ‘ভাই আমি পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাচ্ছিনা।’ যতবারই বলেছি ততবারই রীতিমত ড্রাইভার ধমকের সুরে জবাব দিচ্ছিল, ‘আমি দেখছি আপনি অক্সিজেন পাচ্ছেন।’ পরে এক প্রকার বাধ্য হয়ে রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করালাম বললাম ভাই অক্সিজেন পাচ্ছিনা ততক্ষণে সে স্বীকার করল অক্সিজেন সমাস্যা করছে। যাইহোক অবশেষে ২.৪০ মিনিটে গিয়ে পৌছলাম চট্রগ্রামের সার্জিস্কোপ হপপিটালে ততক্ষনে সন্ধ্যা ৬.০০টার কিছুটা বেশী সময়। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা আগে থেকে অবগত ছিল বলে কিছুটা সুবিধা হয়েছে। সময় নষ্ট হয়নি। গাড়ি থেকে নামতেই অনেক সহকর্মীকে চেখে পড়ল যারা দীর্ঘক্ষণ আমার যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। তাদের চোখে মুখে সহকর্মী হারানোর এক ভয় আমি দেখেছি। কৃতজ্ঞ তাদের কাছে যারা আমার অপেক্ষায় ছিলেন এবং সারাদিন চট্রগ্রামে ঘুরে ঘুরে আইসিইউ এর খবরা খবর নিয়েছেন।
এই প্রথম আইসিউতে আমি। অজানা ভয় কাজ করছে মনে। চারপাশে সব মৃত্যুপথযাত্রী রোগী। সবাই যুদ্ধ করছে বাঁচার জন্য। ডাক্তার নার্স কথা বলার ফুসরত নেই। জীবন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে সবাই। খোলা চোখে সব দেখতে পাচ্ছিলাম। পুরোদমে অক্সিজেন চলছিল। অন্তত একটা ভরসা কাজ করছিল অক্সিজেনের অভাব হবেনা। হাসপাতালে মাথার কাছাকাছি অক্সিজেন ওঠানামার যন্ত্রটি দেখেছিলাম প্রায় সারাক্ষণই। কখনও বেড়ে যাচ্ছিল আবার কখনও কমে যাচ্ছিল। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় অক্সিজেন কমে যেত তাই ভয়ে রাতে ঘুমাতামনা। হঠাৎ উঠে বসে যেতাম।
আইসিউতে আমার পাশের সিটের একজনের হঠাৎ শ্বাস কষ্ট বেড়ে গেছে তীব্র আকারে সে চিৎকার করছিল বারবার বাঁচার জন্য। ততক্ষণে আমার চোখে কিছুটা ঘুম চলে আসছিল। ঘুম ভাঙ্গতেই দেখি আমার পাশের সিটের ভাইটি আর নেই। সিট খালী। ততক্ষনে রাত বাজে ৩.১৫মিনিট। ২০ মিনিট যেতে না যেতে আমার ঠিক সামনাসামনি আর এক মুরব্বি ও মারা গেল। এক রাতে চোখের সামনে হারালাম দুইজনকে। মনটা বেশ ভারী হয়ে ওঠছিল। বারবার ভাবছিলাম প্রিয় শহরে ফিরে যেতে পারবতো? ভাবছিলাম প্রিয় কর্মস্থলে কি আবার ফিরতে পারব? মৃত্যুর ভয় যে এতটা কঠিন তা আগে কখনও ভাবিনি। আর ডাক্তাররা সরাসরি রোগীকে বলছেন, ‘আপনার অবস্থা ভালনা।’
এই কথা শোনার পরে রোগীর মনের অবস্থা কেমন হতে পারে, একবার ভেবে দেখুন। লাশ প্যাকেট করছে একদল লোক। শব্দ শোনা আসছিল স্পষ্ট। বলতেছিল, এই প্যাকেটেই দাফন করতে পারবেন। আপনাদের আর কিছু করা লাগবে না।
সাতদিনে আইসিউতে চোখের সামনে হারিয়েছি ছয় জনকে। আল্লাহ তাদেরকে বেহেশত নসীব করুন। পরিবারকে ধৈর্য্য ধারন করার ক্ষমতা দিন।
বিশেষ করে রাতে আমার পাশে ছিলেন আমার প্রিয় ভাই মুক্তার আহামদ লাভু (স্ত্রীর ইমিডিয়েট বড় ভাই)। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন আমার জন্য। আমার পাশে বসে হাতের এবং পাঁয়ের নখ কেটে দিয়েছেন। হাতে তোলে খাইয়ে দিয়েছেন। আমি বরাবরই ওনার প্রতি সারাজীবনই দূর্বল ছিলাম। মনের ভিতরে তাঁর প্রতি ভালবাসা ছিল সমবসময়। অনেক রাগারাগী ও করেছি হাসপাতালে তাঁর সাথে। নীরবে সহ্য করেছেন। আল্লাহ তাঁর মঙ্গল করুক।
সহকর্মী শাহজাহান জীবন ঝুঁকি নিয়েছেন। সারাদিন পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন। আমাকে মনোবল দিয়েছেন। আমি কৃতজ্ঞ তার প্রতি। সহকর্মী নুরুল আলম মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। কৃতজ্ঞ তার প্রতি।
আমার আপন সহোদর ফয়সাল সারাক্ষন পাশে ছিলেন। কাপড় পরিষ্কার হতে শুরু করে সবকিছু নিজ হাতে করেছেন। যত খাবার আর ওষধ খুশি মনে নিয়ে এসেছেন আমার জন্য। বিরক্ততা দেখিনি ভাই এর চোখে। শুধু অভয় দিয়েছেন তোমার সব খরচ অফিস বহন করছে এর বাইরে যতটাকা লাগে তুমি চিন্তা করনা। ক্যাশ টাকা প্রস্তুত আছে। তুমি একদম চিন্তা করনা। আর এক সহোদর ভাই আমার সাইফুল ইসলাম বর্তমানে রাইট যশোরে কাজ করছে তার আন্তুরিকতা আমার অবর্তমানে পরিবারের দায়িত্ব গ্রহন সবকিছু যেন গোছালো ছিল।
আমার ভাই এডভোকেট নিয়াজ মোর্শেদ (সুপ্রিম কোর্ট) একটি ভরসার নাম। আমাদের পরিবারে সে অন্যদের থেকে আলাদা। সে সারাক্ষণ খবরাখবর রেখেছেন। টাকা পয়সার কথা ভাবতে বারবার নিষেধ করেছেন। সারাক্ষনই আমার জেঠা জনাব, মাষ্টার নুরুল ইসলাম আমার চিন্তায় উদ্বিগ্ন ছিলেন। আমাদের পরিবারের মুরব্বী শুধু আমাদের পরিবারের নয় টেকনাফ উপজেলার মুরব্বি প্রবীন আইনজীবী আমার জেঠা এডভোকেট আমির হোসেন সারাক্ষন দোয়াতে মগ্ন ছিলেন। খবরাখবর রেখেছেন। আল্লাহ ওনাকে দীর্ঘ হায়াত দান করুন।
কর্মজীবনে কখনও হবেনা,পারবনা, অসম্ভব এই কথা গুলো কম বলার চেষ্টা করে চলছি। অফিস যে কত বড় বন্ধু হতে পারে সেই অনুভবটা করতে না পারলেই জীবনটাই ব্যর্থ। অফিস আমার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেছে কিন্তু আমাকে বোঝতে দেয়নি।
সবাই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে মাস শেষে বেতন নেয়। মানবিতা দেখায় কর্মীর প্রতি। কিন্তু এই ক্ষেত্রে কোস্ট ট্রাস্ট অনন্য। কর্মীদের প্রতি সবসময় মানবিক এবং সংবেদনশীল। কর্মীর নিরাপত্তা সবার আগে। কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধিতে রাতদিন সংস্থা কাজ করে চলছে।
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আগাগোড়া একজন মানবিক ব্যক্তি। তিনি সবার জন্য সমান। সবার জন্য মানবিক আচরন করেন। কখন ও পিতার ভূমিকা কখন ও বড় ভাই এর ভূমিকা কখন ও অভিবাবকের ভূমিকায় আবার কখন ও শক্ত হাতে শাসন সব কিছুই তিনিই করে থাকেন আমাদের সংশোধনীর জন্য। আল্লাহ তাঁর দীর্ঘ হায়াত দান করুন।
কক্সবাজারের মিডিয়ার বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞ যারা সব সময় আমার খবরাখবর নিয়েছেন। পাশে ছিলেন। বারেক ভাই এর প্রতি কৃতজ্ঞ যিনি সবসময় আমার খবরাখবর নিয়েছেন।
জীবনের বড় শিক্ষা সুস্থতার কোন বিকল্প নেই। সুস্থ থাকাটা সবচেয়ে জরুরি। বিশ্বস্ত মানুষ তৈরী আর ভাল কাজের কোন বিকল্প নেই। ভাল মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাটা জরুরি। বিশ্বস্ত মানুষের পাশে থেকে যেন আমার মরণ হয় এইটায় শেষ চাওয়া।

জাহাঙ্গীর আলম
সহকারী পরিচালক, কোস্ট ট্রাস্ট।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •