সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ
(সিনিয়র লেকচারার, অর্থনীতি- এআইইউবি)

সকল নাগরিকের জন্য শতভাগ ডিজিটাল লেনদেন সম্ভব হলে কেউই আর “ময়লা ধাতব বা কাগজের মুদ্রা” বহন করতে চাইবেনা।

অতিমারী (Pandemic) সর্বদায় মানুষের জীবনাচরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন উস্কে দেয়। বিগত ১০ সপ্তাহ ধরে আমি কোন পয়সা বা ব্যাংকনোট স্পর্শ করেছি বলে মনে পড়ছেনা। বরং বিল পরিশোধের নানান ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম ও ক্রেডিট কার্ডের উপর নির্ভর করতে হয়েছে । এমনকি বিগত দশক জুড়ে ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ করেনি এমন ব্যবসাও এখন ডিজিটাল বিল পরিশোধকে অনুমোদন করছে।

মানবেতিহাসের বিশাল অংশ জুড়ে প্রতিশ্রুতিবহ নোট থেকে মুল্যবান ধাতু হয়ে অধুনা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত কাগজ এবং প্লাস্টিকের নোটের মাধ্যমে ”বস্তুগত অর্থের” বিকাশ লাভ ঘটেছে। নির্ভরযোগ্য যেকোন “বিহিত মুদ্রা”ই অর্থ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

নভেল করোনাভাইরাস আমাদের “বস্তুগত অর্থ” বহনের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে কিনা সে প্রশ্নটি করতে সমাজকে বাধ্য করছে । উন্নত অর্থনীতিতে বিক্রয়ের বিন্দু ব্যবস্থার (পিওএস) লভ্যতা যেমন রয়েছে পাশাপাশি সকল বিল পরিশোধে ডিজিটাল লেনদেন করার মতো উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন বায়োমেট্রিক প্রমাণিকরনের প্রযুক্তিও রয়েছে।
সকল নাগরিকের জন্য ডিজিটাল লেনদেন শতভাগ রূপান্তর সম্ভব হলে কেউই আর ” ময়লা ধাতব বা কাগজের মুদ্রা” বহন করতে চাইবেনা।

চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশটির চারটি রাজ্যে পাইলট স্কীম হিসেবে “ডিজিটাল ইউয়ান” চালু করেছিলো আগেই। এটি হবে বিশ্বের বড় কোন অর্থনীতির “জাতীয় ডিজিটাল মুদ্রা” ( এন ডি সি) ইস্যু করার প্রথম ঘটনা, যেটাকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড “কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা” (সি বি ডি সি) হিসেবে সম্বোধন করেছে।

বিশ্বজুড়ে মানুষ তাদের স্ব স্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক ব্যাংকনোট আকারে ইস্যুকৃত অর্থ হাতে রাখতে পারে, যেখানে ব্যাংক ও ব্যাংক- বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহ “কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইলেকট্রনিক অর্থ” কে ‘রিজার্ভ’ হিসেবে রাখতে পারে।

পরিবার ও ব্যবসাতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ইলেকট্রনিক অর্থ মূল্য পরিশোধ ও সঞ্চয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। সহজ ভাষায় এটি একটি “ডিজিটাল ব্যাংকনোট” যেটি ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে দ্রব্য ও সেবা সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে।

সর্বোপরি, “ডিজিটাল ব্যাংকনোট” নগদ অর্থের মতই রাষ্ট্রীয় দায় হিসেবে থাকবে, যেমনটি ক্রেডিট কার্ড ও মোবাইল লেনদেনের মতো ডিজিটাল নগদ হস্তান্তরের প্রযুক্তি সরবরাহকারী ব্যক্তিমালিকানার কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে হয়না।

এটি মুল্য পরিশোধ শিল্পে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর মুদ্রা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রক্রিয়ায় নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এখনও অনেকে “বন্টনকৃত লেজার প্রযুক্তি” (ডি এল টি) প্রয়োগ করে “ব্লকচেইন” কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। ‘ব্লক’ বলতে সংরক্ষিত ডিজিটাল তথ্য আর ‘চেইন’ বা শৃঙ্খলা বলতে সর্বজনীন ডেইটাবেইজ কে নির্দেশ করে। এই ব্লকচেইন প্রযুক্তি লেনদেন কে গুচ্ছাকারে ব্লকে পরিণত করে যাদের পরস্পরিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয় এবং কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কের সংযুক্তকারি বিন্দুতে (নোড) উপস্থাপন করে।

এই কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কটিই হলো ডিএলটি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিটকয়েন এবং অন্যান্য ক্রিপ্টো-মুদ্রা চালিকশক্তি লাভ করে। ব্লকচেইন এর সাধারণ দিক হলো এই প্রক্রিয়ার ‘বৈধ নোড’ হিসেবে কাজ করা যেকেউ ব্লকচেইনটি ব্যবহার করতে পারবে।

‘নোড’ হিসেবে নিয়োজিত যেকেউ উক্ত ব্লকচেইন এর পরিচালন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কাজ করে। সুতরাং তাত্ত্বিকভাবে ব্লকচেইন বিকেন্দ্রীকৃত হয় এবং কোন একক অংশীদারের অবৈধ নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব এখানে সম্ভব হয়না।

অন্যদিকে বন্টনকৃত লেজারের মাধ্যমে এসব সর্বজনীন বৈশিষ্ট্যের বেশির ভাগই সম্ভব হয় না। বন্টনকৃত লেজার তার ব্যবহারকারীদের উপর নানান বিধিনিষেধ আরোপ করে যার জন্য একে প্রায় সময় “অনুমতি নেটওয়ার্ক” ও বলা হয়। এই ক্ষেত্রে কোন একক কেন্দ্রীয় অংশীদারের উপর নির্ভর করা হয়না এবং কোন ঐক্যমত্য প্রমাণেরও প্রয়োজন পড়েনা।

“অনুমতিবিহীন নেটওয়ার্ক” এ র অস্থিত্ব থাকলেও ব্যাংক, বৃহৎ ব্যবসা ও সরকারের মধ্যকার পারস্পরিক স্বার্থের সংঘাত এখন একদম পরিস্কারভাবে দৃষ্টিগোচর। যদি কোন বিশেষ সরকার “কেন্দ্রীভূত এনডিসি” চাপিয়ে দিতে চায়, তবে বুঝে নিতে হবে যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যাংকের আর কোন প্রয়োজনীয় তা নেই।

বাণিজ্যিক ব্যাংকে কোন সঞ্চয় গচ্ছিত রাখার বাধ্যবাধকতা না থাকায় মানুষ লেনদেনের উদ্যেশ্যে ব্লকচেইন কাজে লাগাবে। এনডিসি দেখভাল করা এবং লেনদেনকে সহজীকরণ করার জন্য কেন্দ্রীয় ইস্যুকারীর কাছেই কেবল যাবতীয় প্রয়োজনীয় তথ্যাদি থাকবে।

এর ফলে একটি বৃহৎ বেসরকারি কর্পোরেশন বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সত্বার জন্ম হতে পারে। ফলে সিবিডিসি জাতীয় আর্থিক সঞ্চালনে বিদ্যমান সকল নগদ প্রতিস্থাপন করে ফেলতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি দেশ কি এই রূপান্তরের জন্য প্রস্তুত?

ডিএলটির কারণে ব্যাংকিং সেক্টরের হাজার হাজার মানুষের চাকরি হারানোর ক্ষতি ছাড়াও বাংলাদেশের জন্য নগদবিহীন হয়ে যাওয়ার আর বড় সমস্যা আছেঃ জনসংখ্যার বৃহত্তর অংশ এখনও কোন ধরনের ব্যাংকিং সেবার সাথে সংযুক্ত নয়।

২০১৩ সালে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ কয়েকধরনের ব্যাংকিং সেবায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো, এবং ২০১৯ সালে ৬৫ শতাংশ মানুষ মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার আওতায় এসেছিলো। অন্যদিকে চীনের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ স্মার্টফোনের মালিক যার মাধ্যমে তারা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে দ্রব্য ও সেবার দাম পরিশোধ করে।

যদিও আর্থিক পরিসেবার আওতায় আসা মানুষের সংখ্যায় একটি উল্লম্ফন ঘটেছে তথাপি আমাদের মতো একটি বৃহৎ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে পরিবহনের মতো মৌলিক সেবাগুলোর জন্য সিবিডিসি’র মাধ্যমে মুল্য পরিশোধ করা বেশ কঠিন হবে।

পশ্চিমা বিশ্বের মতো আমাদের রিকশাচালক-ট্যাক্সিচালকরা ইলেকট্রনিক পেমেন্টের জন্য ‘পিওএম’ টারমিনাল বহন করেনা। অনেক মানুষের এখনও কোন মৌলিক ব্যাংক একাউন্ট নেই। কঠোর কেওয়াইসি নিয়মাবলীর কারণে অধিকাংশ মানুষ নিজের এলাকায় অবস্থিত ব্যাংকে প্রবেশ করতেই উৎসাহ পায়না।
এসব মানুষের চাহিদা পূরণে ব্যাংকের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তাদের প্রয়োজনের প্রতিফলন ঘটে এরূপ আর্থিক প্যাকেজ চালুর মাধ্যমে। লেনদেন খরচও কমাতে হবে। সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট অনুযায়ী মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতি এক হাজার টাকা উত্তলনে খরচ হয় ১৮.৫০ টাকা। এরূপ স্কীমের কারণে দারিদ্রসীমার প্রান্তের মানুষদের ব্যাংকিংয়ে আরও নিরুৎসাহিত করবে।

উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো মধ্যম আয়ের ফাঁদ যেখানে ক্রোনি পুঁজিপতিরা শাসকগোষ্ঠীর সহায়তায় প্রবৃদ্ধির গতিকে দমিয়ে রাখে। সুতরাং মধ্যসত্ত্বভোগীর আরোপিত যেকোন প্রকার গোপন চার্জ দুর করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে অপরিহার্য সরকারি সেবাসমুহের উন্নয়নের একটি মূল ধাপ অর্জিত হয়।
এনডিসি বাস্তবায়নের ফলে মাত্রাতিরিক্ত সংখ্যক এটিএম ও ব্যাংক শাখার সংশ্লিষ্ট খরচ কমে যাবে, এবং পরিশেষে সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়বে। ব্যক্তির আয় সরাসরি তার মানিব্যাগে জমা হবে এবং ইচ্ছামত খরচও করা যাবে।

এতে ক্ষুদ্রঋণের বাড়তি সুদের ঝামেলাও দুর হবে যেহেতু ঋণপরিশোধের সময়-ব্যবধান কম থাকে এবং সুদের পরিমাণও কম থাকে। প্রত্যেক ব্যবসাতে নগদ প্রবাহ ও বিক্রয়ের ডিজিটাল লেজার রাখা যায়, যার ফলে ক্রেতারা সরাসরি বিক্রেতার মানিব্যাগে টাকা পরিশোধ করায় কর্মী বা মধ্যসত্ত্বভোগীর নগদ আত্মসাৎ কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক উদ্যোক্তা তাদের বিক্রয় ও আয় কর পরিশোধের ব্যাপারে আরও এগিয়ে আসবে।
যেখানে চীনের মতো দেশসমূহ ইতিমধ্যে ”কাগজ থেকে বাইট” এ পদার্পণ করে ফেলেছে, বাংলাদেশ এখনও তার ব্যাংকের শাখা বৃদ্ধিতে ফোকাস করছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এখনও কাগুজে মুদ্রায় বিশ্বাস করে। দেশের সিংহভাগ অঞ্চলে মোবাইল বা বিদ্যুৎতের সুবিধা বিহীন মানুষ আছে এখনও।
ব্যাংক তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে আগ্রহী নয় এবং সরকারও বিপুল সংখ্যক মানুষের চাকরি খোয়ানো এবং উক্ত ব্যংক সমূহ থেকে প্রাপ্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর কমার ঝুঁকিও নিশ্চিত ভাবে নিবেনা। মানুষ নিজেদের তথ্য প্রকাশ করার ধারণার সাথে পুরোপুরি সহজাত নয় এবং আর্থিক অপরাধ মোকাবিলা করা জন্য অধিকাংশ আইটি অবকাঠামোকে নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়না।
নিয়মনীতিকে একপাশে সরিয়ে ডিজিটাল ওয়ালেটের উদ্ভবের ফলে ব্যাংকের ঋণ-স্থিতি ও ঋণ -পরিসেবার জন্য প্রয়োজনীয় আমানত সংগ্রহ হুমকির মুখে পড়তে পারে। সুতরাং ধারণাটি চালু হলেও এর বাস্তবায়ন কঠিন হবে। বর্তমান অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিতে বৈষম্যমূলক প্রবেশগম্যতার কারণে সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হবে।

ভাষান্তরঃ রুবেল কুমার শীল,প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
সহযোগিতায়ঃ রাশেদ রাহগীর, ইমরুল শাহেদ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •