• শামসুল হক শারেক

১৯৯৭ ইং সালের কথা। তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রথম বারে প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি শাহাব উদ্দিন আহমদ। দৈনিক হিমছড়ি তখনো খুব জনপ্রিয় দৈনিক ছিল। তখন জেলা প্রশাসক ছিলেন আলী ইমাম মজুমদার। তিনি ছিলেন অনেক দক্ষ একজন রাজ কর্মচারী। পরে মন্ত্রী পরিষদ সচীব হিসেবে তিনি অবসর নিয়েছেন।
‘৯৭ সালে কক্সবাজার এলাকায় সীমিত আকারে ঘুর্ণিঝড় হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের সফর ছিল কক্সবাজারে। দৈনিক হিমছড়ির সম্পাদক হিসেবে রাষ্ট্রপতির অর্ভ্যতনায় আমাকেও বিমান বন্দরে আহবান করা হয়েছিল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
সেদিন মাত্র হাতে গুণা কয়েকজন সাংবাদিককে বিমান বন্দরে রাষ্ট্রপতিকে অর্ভ্যতনা জানাতে এএসএফ অনুমতি কার্ড দিয়েছিল। আমিও সেই সুযোগ পেয়ে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাব উদ্দিনকে কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাব উদ্দিন আহমদ একটি অনন্য নজির। ‘৯০ এর দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তৎকালীন এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশে গনতান্ত্রিক ধারা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রথম কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ওই নির্বাচনে কেয়ার টেকার সরকারের প্রধান ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাব উদ্দিন আহমদ। সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নজিরবিহীন এক নির্বাচন উপহার দিয়ে জাতিকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
ওই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০ আসন পেয়ে সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠনের জন্য তা যথেষ্ঠ ছিল না। একইভাবে আওয়ামী লীগও ৮৮ আসন পেয়ে সরকার গঠনে ছিল বেকায়দায়। জাতীয় পার্টি পেয়েছিল ৩৫ টি আসন।
কিন্তু বড় দুই দলই ছিল সরকার গঠনে তৎপর। ওই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসন পেলেও আওামী লীগ-বিএনপি দু’দলই সরকার গঠনে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন চায়।

এতে করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর বেশ কদর বাড়ে। তাই দুই দলই সরকার গঠনে ধর্ণা দেয় জামায়াতের কাছে। জামায়াতে ইসলামী তাদের নিজস্ব অবস্থান থেকে সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছিল।

জামায়াত ওই সময় বিএনপিকে সমর্থন দেয়ার ব্যাপারে দেশের মানুষের কাছে এবং জামায়াতের অনেক দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে প্রশ্ন থাকলেও এ প্রসঙ্গে জামায়াতের তৎকালীন আমীর ও কেয়ার টেকার সরকারের রূপকার, ভাষা সৈনিক, প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইসলামী ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছিলেন ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তখন কোন দল সরকার গঠনে ব্যার্থ হলে দেশে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশংকা ছিল। অথবা ব্যয় বহুল আরো একটি নির্বাচন করার দরকার পড়ত।

এই বিবেচনায় যে কোন একদলকে সমর্থন দিতে হয়। তবে ‘জামায়াত মজলিসে শুরার মতামতের ভিত্তিতে বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে দেশও জাতিকে সম্ভাব্য সংকট উত্তরণে এগিয়ে আসে’ বলে তিনি জানান।

বিনিময়ে জামায়াত সংসদে দু’টি মহিলা আসন লাভ করে। নজিরবিহীন ওই নির্বাচন ও বিএনপি সরকার গঠনের পর কেয়ার টেকার সরকার প্রধান শাহাব উদ্দিন আহমদ তাঁর স্বপদে প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে গিয়ে ঐতিহাসিক এক নজির স্থাপন করেন।

১৯৯৬ ইং সালে দেশে কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে ২য় বার জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান ছিলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান। ওই নির্বাচনে সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। তখন অবসরে থাকা বিচারপতি শাহাব উদ্দিন আহমদকে তাঁর সততা, ন্যায়-নিষ্ঠতা ও দেশ প্রেম তথা যোগ্যতার মূল্যায়ন করে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপ্রতি পদে অধিষ্ঠিত করে।

এ প্রসঙ্গে আরো দু’চারটি কথা না বললে হয়না। রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ কক্সবাজার আসবেন এনিয়ে ঔৎসুক্যের অন্ত ছিলনা আমাদের।
সেদিন রাষ্ট্রপতিকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে অর্ভ্যতনা জানাতে অনেক রেষ্টিকশনের পরেও এসএসএফ এর অনমুতিপত্র বা পাশ জেলা প্রশাসন স্ব-উদ্যোগে সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন বা ডেকেই দিয়েছিলেন।
তখন দৈনিক হিমছড়ির অফিস ছিল রুমালিয়ারছরা বাবুল ম্যানশনে। ৪তলা বিশিষ্ট বাবুল ম্যানশনের মালিক ছিলেন আমার আত্মীয় আলহাজ্ব মিয়া হোসেন (তিনি এখন ইন্তেকাল করেছেন) এই সুবাদে সেখানে হিমছড়ির অফিস নেয়া।
অবশ্য আরো আগে থেকে আমি সেই বিল্ডিং এ ভাড়া থাকতাম। বাসা অফিস একই ফ্লোরে হওয়ায় একটি ল্যান্ড ফোনই ব্যবহার করা হত। সেদিন সকাল ৮টার দিকে ডিসি অফিস থেকে ফোন দিয়ে আমাকে খোঁজা হয়। তখন আমি ছিলাম অফিস থেকে দুরে প্রধান সড়কে প্রেসে। আমার বউ আয়েশা বেগম ফোন রিসিভ করে অমাকে খবর দেয়।

২০/২৫ মিনিট পরে আমি গিয়ে ফোনে এটেন্ড করি। ওপ্রান্তে পাওয়াগেল তৎকালীন (অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট) এডিএমকে। ফোন রিসিভ করতেই তিনি বললেন আজ রাষ্ট্রপতি কক্সবাজার আসছেন। ১২টা কি ১টায় (তখনকার বিমান সিডিউলটা মনে নেই) রাষ্ট্রপতি বিমান বন্দরে অবতরণ করবেন। রাষ্ট্রপতির অভ্যর্তনায় আপনাকেও বিমানবন্দরে থাকতে হবে। আপনার কার্ডখানা আমার কাছে আছে। প্রস্তুত হয়ে থাকেন আমি গাড়ি পাঠাব। আমি বললাম যথা সময়ে আমি বিমানবন্দরে থাকব।

যথা সময়ে বিমান বন্দরে গিয়ে দেখি প্রবেশ গেইটের বাইরে এডিএম সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। রাষ্ট্রপতির অভ্যর্তনায় যাদের ডাকা হয়েছে তাদেরকে কার্ড দেয়া হচ্ছে। আমাকেও কার্ডখানা পকেটে লাগিয়ে দিয়ে বললেন, রাষ্ট্রপতির কর্মসূচীতে যতক্ষন থাকি এই কার্ড যেন সংরক্ষণ করি। ভিভিআইপিদের কর্মসূচীতে এসএসএফ এর কার্ড বা পাশের কি মর্যাদা আগে না বুঝলেও একটু পরেই বুঝতে পারলাম।

রাষ্ট্রপতির অভ্যর্তনায় জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কয়েকজন সাংবাদিক ছাড়া সরকারী দলের মাত্র ৩/৪ জনকে কার্ড দেয়া হয়েছিল। এদের মধ্যে ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মরহুম এ একে এম মোজাম্মেল হক, এমপি মোস্তাক অহমদ চৌধুরী, অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী এমপি ও এমপি এথিন রাখাইন।

বিমানবন্দরে ঢুকেই দেখি সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবী ও চোখে কালো সানগ্লাস পরে দাঁরিয়ে আছেন মোজাম্মেল সাহেব। আমাকে দেখেই কাছে ডেকে নিলেন তিনি। আমি তাঁর ডান পাশে গিয়ে দাড়াঁই। একটু এগিয়ে যেতেই বাধা দিল এসএসএফ এর এক সদস্য।

এর আগে আমার জানা ছিলনা ভিভিআইপিদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এসএসএফ বা ‘ষ্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স’ এর ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে। তখনো রাষ্ট্রপতিকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ষ্পেশাল ফ্লাইটটি টার্মাকে প্রবেশ করেনি। আমরা ছিলাম টার্মাকের প্রবেশ দ্বারে দাড়াঁনো। ছোট্ট লোহার গ্রীলে টার্মাকের প্রবেশ পথ বন্ধ ছিল। বিশ পচিঁশ গজ দুরে শান্ত-শিষ্টভাবে একজন নিরাপত্তা কর্মী দাঁড়িয়েছিলেন।

দেখতে তাকে শান্ত শিষ্ট মনে হলেও তার চাহনি এবং দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত ক্ষিপ্র। ওই লোহার গ্রীল ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে মোজাম্মের সাহেব তাঁর স্বভাব শুলভ দরাজ কণ্ঠে বললেন ‘কার্ড না পেয়ে আমার অনেক নেতা-কর্মী রাষ্ট্রপতির অভ্যর্তনায় আসতে পারেনি’।

হঠাৎ ওই নিরাপত্তা (এসএসএফ সদস্য) কর্মী অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে এসে ‘মোজাম্মেল সাহেবকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে পেছনে সরিয়ে দিলেন এবং বললেন আর এক পাও আগাবেন না। বাড়াবড়ির কারণে আমরা অনেক মূল্যবান সম্পদ হারিয়েছি। আর নয়’। আমি খুব ঘাবড়ে গিয়ে পেছনে সরে গেলাম। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতিকে বহনকারী বিমান টার্মাকে প্রবেশ করে। নিরাপত্তা কর্মীদের ইঙ্গিত পেয়ে আমরা টার্মাকে প্রবেশ করলাম।

বিমান থেকে নামার সময় টার্মাকে ঢুকে আমরা রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানালাম। নিরাপত্তা রক্ষীদের পারমিশন পেয়ে আমি একটা ইয়াশিকা
ক্যামরা দিয়ে রাষ্ট্রপতির খুব কাছে থেকে ছবি তুললাম ঠিকই। কিন্তু সেই ছবি যথাযথ হয়নি অনবিজ্ঞতার কারণে।

পরে হিলটপ সার্কিট হাউজে মত বিনিময় সভার ছবিও এইভাবে সংরক্ষণ করতে পারিনি। তখন হ্যান্ড কম্পোজের পত্রিকায় ছবি ছাপানো ছিল খুবই ঝামেলার কাজ। যেসব ছবি ঠিকমত উঠেছিল তাও পত্রিকায় প্রকাশ করা যায়নি।
অনেক আলোচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাব উদ্দিন আহমদের সান্নিধ্য পেতে আমার আকাঙ্খা ছিল অনেক। তবে হঠাৎ এভাবে তাঁকে কাছে পাব এটা কল্পনায়ও ছিল না।
এখন সংবাদ মাধ্যম যেমন বেড়েছে সংবাদ কর্মীও বেড়েছে অনেক। তাই জেলা প্রশাসনের ও সাংবাদিকদের কোথাও গাইড করে নিয়ে যাওয়ার তেমন গরজ থাকেনা। দেখাযায় সাংবাদিকেরাই এখন অনুষ্ঠানের কার্ড পেতে অযাচিতভাবে লাইন ধরে।
আবার ক্ষেত্র বিশেষে মান মর্যাদা এবং সাংবাদিকতার চেয়েও বেশী মূল্যায়ন করা হয় দলীয় সাইন বোর্ডকে। এতে করে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সাংবাদিকতা, তেমনি অনেক সিনিয়ার সাংবাদিক এখন জেলা প্রশাসনের বা ভিভিআইপ প্রটৌকল প্রোগ্রামে যেতে চান না।
২৮ জুন ২০২০ ইং।


বিশেষ সংবাদদাতা ও কক্সবাজার ব্যুরো প্রধান, দৈনিক ইনকিলাব।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •