• রহিম আব্দুর রহিম

২৫ জুন জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকার ৪ এর পাতার একটি সংবাদ শিরোনাম, ‘কাঁঠাল চুরি করায় পিঁটিয়ে হত্যা করা হয় সলমানকে।’ সংবাদ বডির সারাংশ, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের সলমান (১৫)। সলমানের বাবার নাম মো. শাহাদ মিয়া। গত ১৭ জুন, এই শিশুকে তার মা রান্নার জন্য শুকনো খড়কুটো আনার জন্য বাড়ির পেছনে পাঠায়। এরপর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ১৮ জুন এই শিশুর মৃত দেহ পাওয়া যায় পাশের গ্রামের তোয়াব খান (৫০) এর কাঁঠাল বাগান টিলায়। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার সিংহবাদ গ্রামের বাসিন্দা মৃত সুজন খানের ছেলে এই তোয়াব খান। বাগানের মালিক তোয়াব খান শিশুটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে এটা নিশ্চিত করেছেন কুলাউড়া থানা পুলিশ। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট থানা অফিসার ইনচার্জ মো. ইয়ারদোস হাসান জানান, ‘নিহত শিশুটির মা ১৮ জুন অজ্ঞাত আসামী করে একটি খুনের মামলা থানায় দায়ের করেন। পুলিশ ক্লু-বিহীন খুনের রহস্য উদঘাটনে নামেন। তারা নিশ্চিত হন, শিশুটি তোয়াব খানের গাছের কাঁঠাল পাড়ার অপরাধে খুন হয়েছে।’ দীর্ঘ ৬ দিন পর পুলিশ খুনিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। খুনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী না থাকায়, গ্রেফতারকৃত তোয়াব আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানা পুলিশ আদালতে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছেন।

দুরন্তবেলার শিশুরা মৌসুমী ফলমুল, প্রতিবেশীর বাগ-বাগিচা থেকে পেড়ে খায়নি, এমন নজির কেউ দেখাতে পারবে না। গাঁও-গ্রামের ৯৫% মানুষজন এখনও শিশুদের কৌতুহলী এমন কর্মকান্ডের প্রতিবাদ তো দূরের কথা অনেকেই এ ব্যাপারে আনন্দ পান। কৌতুহলী শিশুদের আনন্দের এই কাজকে চুরি হিসেবে বলাও একটা অমানবিক কাজ। সেই ক্ষেত্রে ৫০ বছর বয়স্ক সভ্য সমাজের একজন ব্যক্তি শিশুটিকে পিটিয়ে মেরে ফেললো! ধিক্ মানবতা। পুলিশ যেহেতু অপরাধীকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে পেরেছেন, এই খুনের অপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা হোক এটাই সভ্য বিবেক কামনা করছেন।

বেশ কয়েক বছর আগে সিলেটের কুমারগাঁও বাস স্টেশনের একটি দোকানের বারান্দার খুঁটিতে বেধে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, শেখ সামিউল আলম রাজন নামের ১৩ বছর বয়সের এক শিশুকে। এ ঘটনায় ওই খুনিকে পুলিশ বিমান বন্দর থেকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বিচারক খুনিকে ফাঁসির কাষ্টে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড নিশ্চিত করার রায় দিয়েছিলেন। একই সময়ে অন্য আরও একজন শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার মজুমদারখালি শান্তি নিকেতনে। পিকন দে নামের ৮ বছর বয়সের এই শিশুকে পিটিয়ে হত্যা করেছিল, তারই মামা সুজন দে। ওই সময় নোয়াখালীর ছাগলনাইয়া কলেজ রোডে, ১১ বছর বয়সের এক শিশুকে খুঁটিতে বেধে নির্মম নির্যাতনের ভিডিও চিত্র প্রকাশ হয়েছিল। এধরনের হত্যাকান্ড এবং নির্মমতার কি বিচার হয়েছে তা এখনও সাংবাদিক বন্ধুরা জানাননি।

গত ২০১৮খ্রিস্টাব্দের ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা উল্লেখ করছি। ঠাকুরগাঁও জেলা সদরের নিশ্চিন্তপুর ফয়েজে আম কওমি মাদ্রাসার বাথরুম থেকে মো: আবু বকর (১৬) নামে এক ছাত্রের পোড়া লাশ পুলিশ উদ্ধার করেছিল। এব্যাপারে আমার একটি লেখা ওই সময়, ‘মাদ্রাসায় পোড়ালাশ’ শিরোনামে বিভিন্ন উপসম্পাদকীয় প্রকাশ হয়। আবু বকরের মৃত্যু রহস্যজনক। তবে বিচার কি হয়েছে, তা জানা নেই। ২০১৮ সালের ৯ মার্চ একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ শিরোনাম ছিলো, ‘শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেফতার’। শিরোনামের সারসংক্ষেপ, ঢাকার কদমতলী থানাধীন জামিয়া ইসলামিয়া দারুল এহসান মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মুফতি আলাউদ্দিন, ২০১৮ এর ১ মার্চ তার প্রতিষ্ঠানের ৯ বছরের এক এতিম শিশুকে ওই মাদ্রাসার তৃতীয় তলায় অধ্যক্ষের আবাসিক কক্ষে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। ঘটনাটি এলাকায় জানা-জানি হলে মুফতিকে জনতা আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। ২০১৮ সালের ৮ মার্চ অন্য একটি জাতীয় পত্রিকার শিরোনাম ছিলো, ‘মসজিদের ভেতর শিশুকে শিকলে বেঁধে ৩ ঘন্টা মারধর।’ শিরোনামের সারসংক্ষেপ, ঢাকা শহরের ধামরাই পৌরসভার কাগুজিয়াপাড়া মসজিদের ইমাম মো: সাইফুল ইসলাম, ওই পাড়ার ৯ বছর বয়স্ক শিশু সিয়াম মাহমুদকে মসজিদের ভেতর ঢুকিয়ে তিন ঘন্টা মারধর করেছে। শিশুটি অজ্ঞান হওয়ার পর ইমাম শিশুটির মৃত্যু হয়েছে ভেবে এলাকা ছেড়েছে। মুমূর্ষ অবস্থায় সিয়ামকে ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। সিয়ামের অপরাধ সে বোতলে প্রস্বাব ভরে বন্ধুদের সাথে খেলছিলো। এই প্রস্বাব নাকি ছিঁটিয়ে ইমামের গায়ে পড়েছে। শিশু সিয়াম শিশুর কাজ করেছে। কিন্তু মসজিদের ইমাম একি করলো ! ২০১৮ এর ৬ মার্চ জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকার সংবাদ শিরোনাম ছিলো, ‘বাঁচল না মাদ্রাসার শিক্ষকের নির্যাতনের শিকার শিশুটি।’ শিরোনামের সারসংক্ষেপ, ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া মাদ্রাসায়ে ওমর (রা) হাফিজিয়া এন্ড ইসলামী কিন্ডার গার্টেন। এই প্রতিষ্ঠানের হেফজ শাখার ছাত্র তাওহিদুল ইসলাম, যার বয়স মাত্র ১০ বছর। যে ছাত্রটি বিগত ৪ বছর ধরে এই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। শিশুটি পড়া মুখস্ত করতে পারেনি বলে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক আমিনুল ইসলাম ছেলেটিকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে এমন মার মেরেছে যে শিশুটির পাঁজর ও পায়ের হাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়েছে। শরীরের নানা জায়গায় এলোপাথারি আঘাত করায়, সারা শরীর জখম হয়েছে। মুমূর্ষ শিশুটিকে ঢাকার বক্ষব্যাধি হাসপাতালে আনার পর সে মারা গেছে। মৃত তাওহীদের বাবা কয়েশ মিয়া জানান, ‘গত ২০১৮খ্রি. ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মাদ্রাসার শিক্ষক আমিনুল ইসলামের নির্যাতনে তাওহিদ গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যায়।

গত ২০১৮খ্রি. ১৩মার্চ একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ১ম পাতায় দুটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে তার একটি শিরোনাম ছিলো, ‘এক বছরে ১৫১১ শিশুর মৃত্যু’ শিরোনামের সংবাদটিতে ‘মানুষের জন্য’ ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হয়েছিল। ওই বছর ১২ মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাবে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আয়োজিত, ‘শিশু পরিস্থিতি ২০১৭ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৩৭৫ জন, অন্যান্য দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৬৭৯জন, অপহরণের পর খুন হয়েছে ১০ জন বাল্যবিবাহের কারনে ১জন, নির্যাতনের কারনে ৭ জন এবং আত্মহত্যা করে ২০৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ২০১৭ সালে ধর্ষনের শিকার শিশুর সংখ্যা অনেক । তবে শিশু ধর্ষনের মোট ৪৫৬টি সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত, যৌন নিপীড়নের শিকার ১০১ জন। সেই হিসাব অনুযায়ী গত ২০১৭, ২০১৮ এবং ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিন বছরে শিশু খুন, ধর্ষণ শেষে হত্যার মত ঘটনা ৪৫৩৭ জন। এ কি অবস্থা!

শিশুরা অবুঝ! তারা নিরাপদ আশ্রয়, আনন্দঘন পরিবেশ চায়। কিন্তু আমরা কি তা দিতে পারছি? আমাদের সমাজে শিশুদের অবস্থান কোথায়? প্রায় সময়েই শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ সংবাদ আমাদের শুনতে হচ্ছে। শিশু খুন, নির্যাতন ও ধর্ষণ অহরহ ঘটেই চলছে। চুরির অপরাধে সলমান আহমদকে পিঁটিয়ে হত্যা করা হল। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং অনলাইনের সংবাদ শিরোনামে প্রতিদিনই আমাদের দেখতে হচ্ছে, জানতে হচ্ছে লোমহর্ষক ঘটনার মানবিক বিপর্যয়ের তথ্যচিত্র। সলমানকে তোয়াব খান লাঠি দিয়ে মাথায় ও নাকে একাধিক আঘাত করেছে। আমরা আর সলমানদের হত্যাকান্ড দেখতে চাই না। আর এজন্য চাই অপরাধী যেই হোক, তার উপযুক্ত সাজা।

২৫-০৬-২০২০

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •