উর্দু অনুবাদক জাফর আলম আর নেই

একটি যুগের সমাপ্তি

প্রকাশ: ২১ জুন, ২০২০ ০৪:০৭ , আপডেট: ২১ জুন, ২০২০ ০৪:০৯

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


(মরহুম জাফর আলম । কক্সবাজার শহরের বাহারছড়ার সন্তান)

জাভেদ হুসেন


জাফর আলম গত হয়েছেন। গতকাল ১৯ জুন ২০২০ ঢাকায়। করোনা নয়, বার্ধক্যে ভুগে। সঙ্গে একটা যুগ গত হয়েছে। দরদ দিয়ে মানুষের কথা ভাবার, নিজে ক্লেশ-কষ্ট সহ্য করে নিজেকেই আড়ালে রেখে নিজের কাজটুকু করে যাওয়ার ঐতিহ্যের একটা মহিরুহের পতন ঘটল। এখন যে বলে দিতে হবে তিনি কে—এটা সেই যুগ শেষ হওয়ার একটা লক্ষণ।

বাংলা ভাষায় উর্দু সাহিত্যের মূল্যবান সব লেখা জাফর আলমের হাত দিয়ে বাংলাভাষীদের হাতে এসেছে। তিনি অনুবাদ করেছেন মূল উৎসভাষা থেকে। মুনশি প্রেমচন্দ, কিষণ চন্দর, সাদাত হাসান মান্টো, খাজা আহমদ আব্বাস, ইসমত চুগতাই, কুদরতুল্লাহ শাহাব, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ—এই তালিকা অনেক বড়। তাঁর পছন্দের এই নামগুলো নিজেই তাঁকে চিনিয়ে দেয়। তিনি অদ্ভুত সারল্যভরা হাসিতে বলতেন, ‘আমরা তো প্রগতিশীল!’ জাফর আলমের মুখের এই কথা বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে।

১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব বাংলায় কক্সবাজারে জন্ম নেওয়া একজনের উচ্চারিত এই বাক্য দুঃসাহসের পরিচয় দেয়। শুধু কলকাতার বাবুদের বাবুয়ানির রসদ জোগান দেওয়া জনগোষ্ঠীর এক বালক শিক্ষাজীবনের প্রথমকাল মাদ্রাসায় পড়ালেখা করার সুবাদে ভারতবর্ষের এক অমূল্য খনির খোঁজ পেয়েছিলেন। যাঁরা ভারতবর্ষে প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটিয়েছেন, মানবমুক্তির রাজনীতিতে অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে জাফর আলমের যোগসূত্র ঘটেছিল উর্দু জানার সূত্রে। সাজ্জাদ জহির, যিনি দেশভাগের পর পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সাধারণ সম্পাদক, তাঁর হাতে তৈরি হওয়া সর্বভারতীয় প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের অসংখ্য উর্দু ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক, কবি; এই বঙ্গে থেকে তাঁদের প্রতি দায় অনুভব করেছিলেন জাফর আলম। সেই দায় কেবল শিল্পের জন্য শিল্পের দায় নয়, এই দায় মানুষের প্রতি এক দরদি দায়।

জাফর আলম অনূদিত মান্টোর প্রবন্ধসংকলন

জাফর আলমের অনূদিত রচনায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ঘুরেফিরে আসে। আসে প্রবল অমানবিক সময়ে মানুষের মানবিক হওয়ার প্রয়োজনের কথা। শরণার্থীদের বেদনা তিনি মান্টো, কিষণ চন্দর পড়ে জানতেন এবং বুঝতেন। ১৯৭৮ সালে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রবেশ করে বাংলাদেশে। সামরিক শাসনের সেই কালে পত্রপত্রিকায় তা প্রকাশ করা যাচ্ছিল না। কক্সবাজারে গঠিত হয় কমিউনিটি ইন এইড অব ফর রোহিঙ্গা। এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল এই সমস্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সেই কমিটির লোকজন ঢাকায় এলে সহযোগিতা করেন জাফর আলম।

প্রথম যুগে সাংবাদিকতা দিয়েই পেশাজীবন শুরু হয় তাঁর। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে যোগ দেন ১৯৭৫ সালে। ২০০১ সালে জ্যেষ্ঠ উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা হিসেবে পেশাজীবন থেকে অবসরে যান। অনুবাদ সাহিত্যে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার।


বাংলা ভাষায় উর্দু সাহিত্যের মূল্যবান সব লেখা জাফর আলমের হাত দিয়ে বাংলাভাষীদের হাতে এসেছে। তিনি অনুবাদ করেছেন মূল উৎসভাষা থেকে। মুনশি প্রেমচন্দ, কিষণ চন্দর, সাদাত হাসান মান্টো, খাজা আহমদ আব্বাস, ইসমত চুগতাই, কুদরতুল্লাহ শাহাব, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ—এই তালিকা অনেক বড়। তাঁর পছন্দের এই নামগুলো নিজেই তাঁকে চিনিয়ে দেয়।


স্পেনীয় বা পর্তুগিজ উপনিবেশ তাদের শাসিত জনগোষ্ঠীর ভাষা বদলে দিয়েছে, মাথা বদলাতে পারেনি। ইংরেজ উপনিবেশ-শাসিত মানুষের নিজের ভাষা বদলে তাদের মাথা, চিন্তার ছাঁচ বদলে দিয়েছে। ফলে সে গভীরতর ভাবনায় নিজেকে অতীত শাসকের সঙ্গে সম্পর্কিত ভেবে গর্ব বোধ করে। নিজেদের বহাল সংস্কৃতিতে এর ছাপ প্রবল। ফলে অন্তত বাংলায় ইংরেজি ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষা ও সাহিত্যচর্চার খুব কদর। উপমহাদেশীয় কোনো ভাষা ও সাহিত্যচর্চা এখানে কাজের কথা বলে বিবেচিত হয় না। অনুবাদ সাহিত্য বলে যা এখানে চর্চিত হয়, সেই কাতারে তাই ইউরোপীয় ভাষার সাহিত্যের বাইরের কিছু তালিকায় বা আলোচনায় আসে না। জাফর আলম সেই আধিপত্যের বাইরে ছিলেন সজ্ঞানে। তাঁর কাজের ক্ষেত্র ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসের অমীমাংসিত এক অধ্যায়।

জাফর আলম অনূদিত ‘উপমহাদেশের দাঙ্গার গল্প’

এই মানুষটির সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। তাঁর সাহিত্যকর্মের কাছাকাছি আমি ঘুরেফিরে বেড়াই। নিজেই তিনি আমাকে খুঁজে নিয়েছিলেন। অনুরোধ করেছিলাম মির্জা গালিবের ১৮৬৭ সালের ডায়েরি বাংলায় অনুবাদ করতে। সাগ্রহে সেই অনুরোধ মেনে নিয়েছিলেন। একদিন দুপুরবেলা তিনি আমার ডেরায় হাজির। ঢাকা শহরে আমার ডেরার সেই বিপজ্জনক খাড়া সিঁড়ি বেয়ে সত্তরের কাছাকাছি বয়সের মানুষটা ছয়তলায় উঠলেন। কারণ? গালিবের ডায়েরিতে তাঁর জন্মতিথি প্রসঙ্গে দুটো নক্ষত্রের নাম উল্লেখ আছে। ফারসিতে দেওয়া সেই নামের হাল-হকিকত নিয়ে আলোচনা করতে তিনি হাজির হয়েছেন দুর্বল শরীর নিয়ে। শেষ দিকে পিঠ আর কাঁধের ব্যথায় খুব ভুগতেন। কিন্তু লেখা থামাননি। বসে লিখতে পারেন না বলে দাঁড়িয়ে লেখার ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ লিখে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতেন।

দেখাসাক্ষাৎ হতো। এক ঈদে তাঁর জন্য পাঞ্জাবি কিনেছিলাম। এরপর তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ফলে সেই পাঞ্জাবি আমার কাছেই রয়ে যায় পৌঁছে না দেওয়া উপহার হিসেবে। তাঁর স্মৃতিচিহ্ন। তাঁর না পাওয়া আরও বড় প্রাপ্য আছে। এর সঙ্গে এটাও যোগ হলো। উর্দু কবিতায় আমার আগ্রহ দেখে তিনি মনে করতেন আমি সেই ভাষায় কবিতাচর্চা করি। ধারণাটা ভুল। একজন বড় মানুষের স্নেহের চোখে দেখা ভুল। সে-ও অনেক বড়। তাঁকে সেই ভুল আমি ভাঙাইনি কোনো দিন।

(প্রথম আলো থেকে সংগৃহীত)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •