-তানভিরুল মিরাজ রিপন

পৃথিবীর সব কিছু রাজনৈতিক। ‘আমি বাবু ছা-পোষা মধ্যবিত্ত সমাজে বসবাস করি। আমি, আমার সন্তানের রাজনীতির কি পেয়েছে! রাজনীতি করবে ওরা, বড় লোকেরা। যারা কাম কাজ না করলেও বছরকে বছর চলতে পারবে’ কথা গুলো বলেন আমাদের অর্থৈনিতিক নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত জনমানুষেরা।জনমানুষ বলার কারন আমাদের অর্থনৈতিক জীবন যাপনে বেশিরভাগ মানুষ মধ্যবিত্ত। ধনী বৃদ্ধির হার বেশি হলেও, ধনি মানুষের সংখ্যা পাক শাসনামলের ২২ পরিবারের মতো।রাজনৈতিক অনীহা নিয়ে বলার পেছনে কারন আছে।রাজনীতি করে যখন যে ধনি সে ধনি হচ্ছে তো হচ্ছে৷নিম্নবিত্তরা চামচামি আর গুন্ডামি না করলে রাজনীতিতে টিকে থাকা মুশকিল। যেহেতু সাধারন মানুষ রাজীতি করে খুব একটা নিজের অর্থনৈতিক উন্নতি করতে পারে না সেহেতু রাজনীতি এখন পুরোটা ধনবানদের ক্যাসিনো।আর মাঝেমধ্যে দু চারজন ছা-পোষা মানুষের সন্তান খুন হয়, হাত পা হারায়। এদের যদিও দু্র্দিনে প্রহরী বললেও কারোরই ঠিক অবস্থান পরিবর্ধন হয় না৷ দেশের রাজনৈতিক সংকট সমাধানে প্রত্যেকের একটা দ্বায়িত্ব আছে। সে দ্বায়িত্ব সম্পূর্ণ পালন না করলে সঙ্কট সৃষ্টি হবে’ই। এ সঙ্কট প্রথমে আপনার অর্থনৈতিক দৈনতা বাড়াবে, এরপর নৈতিক স্খলন বাড়াবে, চূড়ান্ত পর্যায়ে অপরাধী করে ফেলবে।

দেশের অপরাধের ধাঁচ ধরনগুলো একটু পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যাবে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান আমাদের মানসিকভাবে সমৃদ্ধ করতে পারেনি,উন্নত করতে পারেনি।এ প্রবৃদ্ধির উচ্চবিলাসি সময়ের রাজনীতি আমাদের সামষ্টিক জীবন যাপনকে উন্নীত করেছে নাকি বিকলাঙ্গ করছে সেটিই স্পষ্ট সকলের কাছে। যাপনের সমস্ত সকল কিছুর প্রতি ব্যয় বাড়ছে। মানুষ আদতেই মানুষ, কোনো যুক্তিতে ভোগ্য পণ্য হয়না তা আমাদের প্রযুক্তির স্পর্শ মোড়ানো শিক্ষানীতি আজও স্পষ্ট হয়নি। দেশে বেড়েছে ধর্ষন (Rape)। ২০১৯ সালে ধর্ষন ২০১৮ এর তুলনায় দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছিলো ১ হাজার ৪১৩ জন, ২০১৮ সালে যা ছিলো ৭৩২ জন। ২০১৭ এর তুলনায় ২০১৮ কম ধর্ষনের ঘটনা ঘটে, যদিও লজ্জা ও সামাজিক মানহানির কারণে অনেকে মুখ খোলেন না,খুন গুম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। যেমন ২০১৯ সালে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪ জন নারীসহ ১৭ জন খুন হয়েছে ৷ ২০১৭ সালে ধর্ষন হয় ৮১৮ জন নারী। ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬জনকে৷ আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০জন নারী৷ বাড়ছে যৌন হয়রানি (Sexual Harassment) ২০১৯ সালে যৌন হয়ানারীর শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন নারী৷ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ১৭০ জন৷২০১৯ যৌন হয়রানীর শিকার ১৮ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন৷ ঘটনাগুলোর প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪৪ জন পুরুষরা নির্যাতনের শিকার হয়েছে।ঘরোয়া সহিংসতা (Domestic Violence) যৌতুকের কারনে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৬৭ জন, এতে নিহত হয় ৯৬ জন, আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় ৩ জন নারী।পারিবারিক কারনে ৪২৩ জন নির্যাতনের শিকার হয়।২০০ জন নারী স্বামীর হাতে খুনের শিকার হয়। ফতুয়া বা মোড়লের বিচারে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩ জন, তন্মধ্যে একজন আত্মহত্যা করেছেন। হিসাব গুলো আইন সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর। মা বাবার প্রতি সন্তানের নির্যাতন,বাড়ছে বৃদ্ধাশ্রমও। বাংলাদেশে ২০জন প্রবীণ হয় একা থাকে নয়তো স্বামী-স্ত্রী একসাথে থাকেন। দরিদ্র প্রবীণ ৩৭ জন। একারণে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যাও তুলনামূলক ভাবে বাড়ছে৷এছাড়া একাকী এবং বৃদ্ধাশ্রমে যাঁরা থাকেন, তাঁদের ৭০ ভাগই নারী, এবং তাঁদের বেশিরভাগই কারো না কারুর মা৷

শিশু ধর্ষন চলছে তো চলছে , ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষনের শিকার হয় ৩৫৬ জন, যার মধ্যে মারা গেছে ২২ জন এবং আহত হয়েছে ৩৩৪ জন। এর মধ্যে উত্যক্তকারী দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১০ জন আর প্রতিবেশী দ্বারা ১০২ জন। গণধর্ষণের শিকার ৩৭ জন, শিক্ষক দ্বারা ১৭ জন।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে মোট ২৭৬টি শিশু হত্যা ও হত্যা চেষ্টার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ২২৭ জন। এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি খবর ছিলো ঢাকা জেলার। এ জেলায় ৩৭ জন আক্রান্ত হয়েছে আর দ্বিতীয় অবস্থানে গাজীপুর জেলা। এ সব ঘটনার কারণ হিসেবে যেগুলো উঠে এসেছে তার মধ্যে আছে- পারিবারিক কলহ, সম্পদের জন্য, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে, চাঁদা না দেয়া, মেয়ে হয়ে জন্মানোসহ বিভিন্ন কারণ। এ ছাড়া দেশে ১৭৭টি বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে।

২০১৮ সালে শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৪৬ জন। মূলত প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, স্কুলে না যাওয়া, চোর সন্দেহে, আত্মীয়, সৎ মা, সহকর্মীর হাতে তারা নানা কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ১৯৭টি এবং এতে প্রাণ হারিয়েছে ১৫২ জন। ৬ জন এসিড নিক্ষেপের শিকার হয়েছে,পাচার হয়েছে ৩৮ জন।এমনই তথ্য ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ‘৷

শিশুশ্রম তো আগে থেকে বলবৎ আছেই।বাংলাদেশে পরিচালিত জাতীয় শিশু শ্রম জরিপের তথ্য মোতাবেক বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৩৪ লাখ শিশু নানা ধরনের শ্রমের সাথে জড়িত। এর মধ্যে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুই ঝুঁকি পূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত।

এ অপরাধ গুলো হওয়ার পেছনে বেশিরভাগ কাজ করে রাজনৈতিক সঙ্কট, বিচার ব্যাবস্থা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও দলীয়করণ করে ফেলা ও অর্থনৈতিক দৈনতার ফলে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে৷এটির শেষ টানতে হলে দরকার রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান,বিচারিক আদালতের হয়রানি, পুলিশি হয়রানি,ক্রসফায়ারের নামে সমস্যা জিইয়ে রাখলে সমস্যার শেকড় ঠিক থেকে যাবে, তাই দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব কমিয়ে আনা যাবে। অর্থনৈতিক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি,মুদ্রাস্ফীতি কমানো, নিত্য ও মৌলিক আধিকারের সাথে সম্পৃক্ত সকল পণ্যের দাম কমানোর মাধ্যমে এসকল অপরাধ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুতর ভূমিকা রাখতে পারে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •