মোহাম্মদ তালুত

২০৫০ সালের বাংলাদেশ। কেমন হতে পারে? কেমন হবে? কেমন হওয়া উচিত? মাঝে মাঝেই এসব ভাবনা মনে হানা দেয়। শৈশব থেকেই ভাবতে বেশ ভাল লাগে। কল্পরাজ্য তোলপাড় করে ভাবনার বুদবুদগুলো প্রসারিত হতে হতে একসময় বিস্ফোরিত হয়, ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করতে অদম্য স্পৃহার স্ফুরণের অনুভূতিটা অসাধারণ। আসলে মানুষের ব্রেইনের আসল কাজ হল চিন্তা করা, এইটা না করলে খোদাপ্রদত্ত এই অতুলনীয় হাই-টেক মেশিনের নির্ঘাত অবমাননা হয়। আমি মনে হয়, মানুষের মনে কোন ভাবনা আসলে সেটা শেয়ার করাও প্রয়োজন। সব চিন্তাকে বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা চিন্তাকারী মানুষের নাও থাকতে পারে, হয়ত সেটা অন্য কেউ রাখেন। কার্ল মার্ক্সের মাথা থেকে কমিউনিজম এলেও বাস্তবায়ন হয়েছে লেনিন ত্রতোস্কির হাতে। তখন মার্ক্স বেঁচেও ছিলেন না।
প্রথমেই আসি কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে। ২০৫০ সালে আমাদের জনসংখ্যা হবে কমবেশি ত্রিশ কোটি, যদিও অপ্টিমিস্টরা বলেন এত বাড়বে না, হবে ২০ কোটি, কিন্তু আমি ধরে নিলাম সম্ভাব্য ওর্স্ট কেইসটাই। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্থনীতিতে আমাদের প্রবেশের সুযোগ সীমিত। কেননা জমির অভাব। একটা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা গাড়ির কারখানা করতে হলে হাজার হাজার একর জমি দরকার। ভারতের চণ্ডীগড়ে স্বরাজ মাজদার গাড়ির কারখানার দৈর্ঘ্যই আট কিলোমিটার। সেটা করতে কাউকে উচ্ছেদও করতে হয়নি বললেই চলে। ভারতে এতই ফাঁকা জমি, আছে লাখো একরের মরুভূমিই ফাঁকা পড়ে আছে, সেখানে অনায়াসেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভারি শিল্পকারখানা স্থাপন করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের এত জমি নেই। আরও বড় কথা হল, ভারি শিল্পগুলোতে ব্যাপকভাবে অটোমেশন হয়ে পড়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের চাকুরি আসলে হচ্ছে না। অর্থাৎ কয়েক হাজার একর জমির উপর স্থাপিত একটা ভারী শিল্পকারখানায় আসলে চাকুরি হবে মাত্র হাজারখানেক মানুষের যেখানে আমাদের দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারেই থাকে দেড় হাজার মানুষ। এভাবে ভারি ভারি শিল্প গড়ে কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান আসলে এদেশে অসম্ভব। আবার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও রেইট অফ রিটার্ন কম, অর্থাৎ সেটা নিয়ে পড়ে থাকলে আমাদের মাথাপিছু আয় এক জায়গায় উঠে থমকে যাবে, মিডল ইনকাম ট্র্যাপে পড়বে দেশ। মাথাপিছু আয় ক্রমাগত উপরে উঠাতে হলে অন্য কাজ যেসবে সময়ানুপাতে আয়ের পরিমাণ বেশি সেসবে ঝুঁকতে হবে।
তাহলে কি করা যাবে? সামান্য ভূখণ্ডে এই তিরিশ কোটি মানুষকেই আমাদের সম্পদে পরিণত করতে হবে। আমাদের সত্যিকারের একমাত্র সম্পদ আসলে মানুষ। বিশ্বায়নের যুগে এই সম্পদ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে, যোগান দেবে বিভিন্ন খাতের উপযুক্ত জনবল। অর্থাৎ আমাদের জব মার্কেট হবে সারা পৃথিবীই। আমাদের এখন থেকেই দেখতে হবে পরে কিসের কিসের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। সরকারের এখন থেকেই দরকার মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। সামনে আসছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। সব কাজে চলে আসছে বিভিন্ন অটোম্যাটিক সিস্টেম, মানুষ হারাচ্ছে চাকুরি। এই বছরেই ইংল্যান্ডে চালকহীন গাড়ি নেমে যাবার কথা। সুতরাং গাড়ি চালনা জাতীয় চাকুরি সামনে আর নাও থাকতে পারে, কিন্তু গাড়ি মেরামতের কাজের চাহিদা থাকবে। তবে গাড়ির প্রযুক্তি কিন্তু চেঞ্জ হয়ে যাবে। তেলচালিত ইঞ্জিনের বদলে ব্যাটারিচালিত ইলেক্ট্রিক মোটরগাড়ি চলে আসবে সবখানে। সবাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবে না; বিজ্ঞান, অঙ্কে সবার আগ্রহ বা দক্ষতা থাকবে না, কারও কারও থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। পিওর প্রকৌশলবিদ্যা অনেক ব্যয়বহুল আর সময়সাপেক্ষ। এখনই আমরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এসব বিদ্যার বাজারে তেমন বড়সড় দখল নিতে পারব না। গড়ে ১০% মানুষকে হয়ত ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তার ইকনোমিস্ট বানানো সম্ভব, বাকি ৯০% কি করবেন? আমাদের মানুষ অনেক। এমন সেক্টর বাছতে হবে, যার চাহিদা আছে, যেখানে প্রবেশ করতে কম খরচ আর কম সময় লাগবে, আপামর তরুণরা খুব দ্রুত কাজ পেয়ে যাবে, কেউ বেকার থাকবেন না। নার্সিং নিয়ে এর আগে লিখেছিলাম। দুনিয়া জুড়েই প্রচুর নার্স লাগবে সামনে, বেতনও আকর্ষণীয়, সম্মানজনক কাজও বটে। এখনই প্রতিটা উপজেলায় নার্সিং কলেজ করা দরকার, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের নার্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ইংরেজি শিক্ষাটা শুরু থেকেই একেবারে ইফেক্টিভ করে ফেলা দরকার। ভাষাসংক্রান্ত আবেগ অবশ্যই ধারণ করব, কিন্তু ইংরেজিটাকে শিখতে হবে একটা স্কিল হিসেবে, যা জীবিকা যোগাবে। প্রতিটা ট্রেনিং ইন্সটিটিউটকে আনতে হবে প্যাকেজ প্রোগ্রামের আওতায় যেখানে প্রশিক্ষণ শেষে জবের ব্যবস্থা করতে হবে সেই ইন্সটিটিউটকেই। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা দরকার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন দরকার। চাকরীর বাজার ধরার জন্য দরকার আন্তরিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।
আর কি কি বাজার সৃষ্টি হতে পারে সামনে? জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ জগতে সামনে বিশাল পরিবর্তন আসছে। গাড়ীগুলো ব্যাপক হারে বৈদ্যুতিক ব্যাটারি চালিত হয়ে যাবে ২০৩০ সালের মধ্যেই। এই গাড়ি মেরামতির টেকনিক্যাল স্কিলের চাহিদা বাড়বে বিশ্বব্যাপী। এই জাতীয় গাড়ি মেরামতি হবে পূর্বের অন্তর্দহন ইঞ্জিনের গাড়ির চেয়ে অপেক্ষাকৃত সোজা। কিন্তু মেরামতিও এখন অনেকটা ডিজিটাল হয়ে গেছে। অর্থাৎ গাড়ির ইঞ্জিন বা মোটরের সাথে একটা ডিভাইস লাগিয়ে দিলেই সে জানিয়ে দিচ্ছে কোথায় সমস্যা। এইসব ডিভাইস চালানো শিখতে হবে আমাদের তরুণ মেকানিকদের। শুধু গাড়ি নয়, অন্যান্য সমস্ত ক্ষেত্রেও এ জাতীয় স্কিল দরকার হবে ব্যাপকভাবে। সেদিন আমার বাসায় একটা ইন্টারনেট রাউটার লাগাতে এলেন এক ষাটোর্ধ একজন টেকনিশিয়ান, জাতে স্কটিশ। দেখলাম, তার সিস্কো নেটওয়ার্কিং সম্পর্কে বেশ গভীর কারিগরি নলেজ আছে অথচ তার পড়াশোনা ছয় মাসের ডিপ্লোমা কোর্স টাইপের বেশি নয়। দশ মিনিটে রাউটার লাগিয়ে সেটা কনফিগার করে, কানেকশন দিয়ে, লাইন আপ করে চলে গেলেন। উন্নত দেশগুলোতে এ ধরণের কাজে পারিশ্রমিকও প্রচুর। এ কাজগুলোতে এখন প্রচুর বিদেশি আসতে শুরু করেছে।
আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। আমাদের সবধরণের কাজেই দক্ষতার একটা ডিজিটাল মডিফিকেশন দরকার। যেমন ধরেন, কাঠের কাজ। এইটা আমাদের ছুতারগণ খুব সুন্দর করতে পারেন; ছেনি বাটালি দিয়েই কি সুন্দর উড কার্ভিং করে থাকেন। এই কাজটাই বিদেশে করা হয় সিএনসি computer numerical control (CNC) উড মিলার দিয়ে, অর্থাৎ কম্পিউটারে কাঠের ওপর যে কারুকাজ করা হবে সেটা প্রথমে একটা ড্রয়িং সফটওয়্যার ইউজ করে আঁকা হয়। তারপর একটা কাঠের পাটাতন মেশিনের বেডে রেখে মেশিন চালিয়ে দেওয়া হয়। এখন একটা ড্রিলের মত অংশ ড্রয়িং মোতাবেক কাঠের ওপর ঘুরে ঘুরে নকশা খোদাই করে দেবে। আমাদের এখন যেটা দরকার সেটা হল ড্রয়িংটা করতে শেখা আর সিএনসি মেশিন চালিয়ে কাঠে নকশা করতে পারা। এটা ইতোমধ্যেই অটবী বাংলাদেশে করছে। এইভাবে প্রায় প্রতিটা কারিগরি কাজেই স্কিলের যুগোপযোগী আপডেট দরকার আমাদের।
নবায়নযোগ্য জ্বালানীর একটা বড়সড় জোয়ার আসছে সামনে। এই প্রযুক্তিতেও আমাদের দক্ষতা অর্জন জরুরী। এটা তুলনামূলক সোজাও। আমার বিশ্বাস, আমাদের তরুণরা যথেষ্ট মেধাবী এবং তারা খুব ভালভাবে এই প্রযুক্তির প্রায়োগিক খুঁটিনাটি যেমন ইন্সটলেশন এবং মেন্টেনেন্স করা শিখে নিতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারও ধরতে পারবে। দরকার শুধু একটু সুযোগ। এইটা সরকারকে করে নিতে হবে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের দেশের নিজস্ব কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড সামনে ক্রমশঃ কমতে থাকবে। ম্যানুয়াল কৃষিযন্ত্রগুলো অটোম্যাটেড হয়ে যাবে এবং সেসবের সাহায্যে বিশাল এলাকার কৃষিকাজ খুব কম মানুষই করে ফেলতে পারবে। এটাই স্বাভাবিক ট্রেন্ড। ধীরে ধীরে সার্ভিস ইকোনমি বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমির দিকে যাব আমরা এবং সেখানে মানুষের কর্মে আগ্রহ বাড়বে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আরও অনেক দেশে কৃষিকাজ সামনেও জারী থাকবে। তাই, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিতে আমাদের দক্ষতা গড়ে তোলা দরকার। যেমন বাঙালি তরুণরা কেনিয়া বা চিলিতে গিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন মেশিন ইউজ করে কৃষিকাজ করবেন, কেননা সেসব এলাকায় এই ধরণের আপডেটেড দক্ষতাসম্পন্ন উপযুক্ত জনবলের চাহিদা থাকবে। এই পদ্ধতিগুলো আমাদের আয়ত্তে আনতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে হবে।
আশার কথা হল, সদাশয় সরকার ইতোমধ্যেই এগুলো সম্পর্কে ভাবতে শুরু করেছে এবং অচিরেই এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কিশোর, তরুণদের নিজস্ব দায়িত্বও কিন্তু কম নয়। তাদের এখন থেকেই দেশকে এগিয়ে নেবার কথা মাথায় রেখে আত্মউন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে। হিসেব নিকেশ করতে হবে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলো! ইন্টারনেটে শুধু ফেসবুকিং আর ইউটিউবিং না করে কিছু স্কিল অর্জনেও আগ্রহী হতে হবে, যা আগামীতে তাদের সম্মানজনক জীবিকা অর্জনের পথে পাথেয় হতে পারে। নয়ত টিকে থাকাই মুশকিল হবে।
২০৫০ সালে চাকুরিতে থাকব কি না জানি না। জানি না এজন্যই বললাম যে তখন হয়ত অবসরের বয়স আরও বেড়ে যাবে। এই চাকুরিতে এসে আমি এতটুকু অনুভব করি, উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়ন পাবলিক সার্ভেন্টদের কর্মদক্ষতা এবং আন্তরিকতার উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। শুধু রুটিনওয়ার্কই নয়, বরং আমাদের ফোকাস করা দরকার সত্যিকারের পরিবর্তন নিয়ে ভাবা এবং তা বাস্তবায়নের ওপরেও।

লেখক: বাংলাদেশ সরকারের একজন সিনিয়র সচিব।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •