মাহদী হাসান রিয়াদ

বৃহস্পতিবার রাত। সেদিন আরবি মাসের চোদ্দ তারিখ। আকাশের বুকে মাথা গুঁজিয়ে চাঁদ হাসছে। মাঝেমধ্যে সে লজ্জাও পাচ্ছে। ফের মেঘ দিয়ে খানিক পরপর মুখ ঢাকছে। হাতে এক কাপ দুধ চা- নিয়ে বারান্দায় বসে চাঁদ আর মেঘের খেলা উপভোগ করছিলাম। বেশ ভালোই লাগছিল। মনে হচ্ছিল স্বর্গে আছি। পাশের রুম থেকে বিকট শব্দ করে বলে ওঠলো— ‘কি গো, চা- শেষ হলো? রুমে আসবা না? নাকি বারান্দায় রাত কাটিয়ে দিবা?
আচমকা রাফিয়ার মায়ের ভাষণ শুনে চমকে ওঠলাম। নড়েচড়ে বসলাম। যেনো স্বর্গ থেকে সোজা দুনিয়ায় এসে আঁচড়ে পড়ার মতো অবস্থা হলো আমার। বিব্রত অবস্থায় কাঁপাকাঁপা আওয়াজে উত্তর দিলাম—’হ্যাঁ, আসছি একটু পর।’

চা- শেষ হলো। কথামতো রুমে চলে আসলাম। টেবিলের উপর হারিকেন জ্বলছিল। রাফিয়ার মা- মশারি টাঙাতে ব্যস্ত। তিন ঘণ্টা আগে থেকেই রাফিয়া দিব্যি ঘুমচ্ছে। মা- মেয়ের স্বভাব একই রকম। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘুমিয়ে যায় ওরা।
আর আমি রাত জেগে স্বপ্ন দেখি। কখনো চেতনে, ফের কখনো অবচেতনে।

প্রতিদিনের ন্যায় আজও রাফিয়ার মা- দশ মিনিটের মাথায় ঘুম। স্রেফ ঘুম বললে ভুল হবে। চাঁদের মতো বুকে মস্তক গুঁজিয়ে বিভোর ঘুমে মগ্ন সে। এদিকে আমি উতলা মন নিয়ে চটপট করছি। খিদা লেগেছে। চোখের খিদা। প্রিয়তমাকে এক নজর দেখার খিদা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, কেরোসিন ফুরিয়ে যাওয়াতে হারিকেনের মৃত্যু হয়েছে। কোনো ভাবেই জ্বলছে না সে। মরণপণ চেষ্টা করা সত্বেও ব্যর্থ হলাম। তবে হতাশ হয়নি। অল্পতে হেরে যাওয়ার লোক আমি নই।

দেয়াল ধরে অন্ধের মতো পায়চারি করতে লাগলাম। প্রয়োজন দুই ফোঁটা কেরোসিন। নাহ, কোথাও পেলাম না। দ্বিতীয় বারের মতো ব্যর্থ হলাম। তবুও হতাশ হলাম না। তখন যদি কেউ বলতো— মাটি খনন করলে দু’ফোঁটা কেরোসিন মিলবে, সম্ভবত কেরোসিনের দেখা না-পাওয়া অবধি মাটি খনন করেই যেতাম। কারণ, খিদা পেয়েছে আমার। প্রচণ্ড খিদা। পেটে খিদা লাগলে শরীর নিস্তেজ হয়ে যায়। তবে, মনে খিদা লাগলে শরীর সতেজ হয়ে ওঠে। মনের ক্ষুধা নিবারণ করার জন্য সে যা-ইচ্ছে তাই করতে পারে। মোটেও দ্বিধাবোধ করে না। একটু চিন্তাও করে না, অগ্র-পশ্চাৎ তার কী হবে। তদ্রূপ আমার ক্ষেত্রেও এমনটা হয়েছে।

কোনো উপায় খোঁজে পাচ্ছিলাম না। নিরুপায় হয়ে শুয়ে পড়লাম। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে।
শান্তিপুর গ্রামে তখনও বিদ্যুৎ আসেনি। বিদ্যুৎ কি জিনিস অধিকাংশ লোকজন তা- চিনতও না।
বারান্দায় যে বাতি জ্বলবে, সেকথা কল্পনা করাটাও মুশকিল। মনে পড়লো— এ তো চাঁদের আলো। আরবি মাসের চোদ্দ তারিখ। আজতো চাঁদের বিয়ে।

তড়িঘড়ি করে ওঠে বসলাম। এতক্ষণ বাদে অন্তত স্বস্তি ফিরে আসলো মনে। জানালা খুললাম। অমনি এক ফালি চাঁদের আলো এসে পড়লো রাফিয়ার মায়ের কঞ্চি বাঁশের মতো সেই নাকের ডগায়। কমলার কোয়ার মতো ঠোঁটগুলো গাড়ির সিঙ্গেল লাইটের ন্যায় জ্বলছিল। কপোলের কথা কি আর বলবো! মনে হচ্ছিল দুইপাশে দুইটা হাই ভোল্টেজ লাইট লাগানো হয়েছে। স্রষ্টার সৃষ্টি দেখে বিস্মিত হচ্ছি রীতিমতো৷ থ- হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিই আর দেখছি; দেখেই যাচ্ছি। সেসাথে ভাবছিলাম হাজারটা ভাবনা। করছিলাম কতশত কল্পনা-জল্পনা। ইচ্ছে করছিল রাতটা এভাবেই শেষ করে দিতে৷ কিন্তু না! এমনটা করলে রাফিয়ার মায়ের প্রতি অবিচার হবে৷ অন্যায় হবে; চরম অন্যায়৷ বরঞ্চ দুজনেই মিলেমিশে উপভোগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

রাফিয়ার মায়ের কপালে হাত বুলাতে লাগলাম। ঘুম ভাঙাতে হবে। খানিক পর ঘুম ভাঙলো। রাগান্বিত চেহারা। বিষণ্ণ চাহনি। এসব দেখে বিব্রত হলাম। বরাবরই তার রক্ত চক্ষুর তীক্ষ্ণ চাহনিতে বিব্রত হই আমি৷ আজও ব্যতিক্রম হলো না৷ ভেজা বিড়ালের মতো মিইয়ে গিয়ে ছলনা শুরু করলাম। রাগ কমাতে হবে৷ নয়লে গরম তেলে পেঁয়াজ পড়লে যে অবস্থা হয়, একটু পর হয়তো তেমনটা হবে।

দু’জনে বারান্দায় গিয়ে বসলাম। ভ্রাম্যমাণ ক্যানভাসারদের মতো অনর্গল বলেই যাচ্ছি আমি।
কথা শেষ না হলেও রাত ঠিকই শেষ হচ্ছে। মনে হচ্ছে আজকের রাতটা অন্য রাতের চেয়েও ছোট।
কুকুরু-কুক বলে মুরগ ডাক দিলো৷ অতঃপর বুঝতে পারলাম— রাত ফুরাতে আর বেশিক্ষণ নেই। নৈশভোজের আলাপন শেষ না হওয়া সত্বেও শেষ করতে বাধ্য হলাম। বাড়ির পুকুর থেকে অজু করে আসলাম দু’জনে। দাঁড়িয়ে গেলাম মসল্লায়৷ তাহাজ্জুদ শেষে দুহাতকে প্রসারিত করে রবের কাছে চাইলাম; চাইলাম অনেক কিছুই।

ছোট্টিয়া, এই ছোট্টিয়া। ওঠ, আজান হয়ছে। নামাজ পড়তে ওঠ। ধ্যাত্তারি, আম্মা এসে আমার স্বপ্নটার বারোটা বাজিয়ে দিল।