-মোহাম্মদ আকিব

অসময়ে সবাইকে দুঃখে ভারাক্রান্ত করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমানো চাচীর নাম রোকেয়া বেগম। আমার মেঝ মা। দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়নের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারেই ছিল যার জন্ম। ভাগ‍্যের নির্মম পরিহাসের কাছে হেরে গিয়ে আমাদের সবাইকে ছেড়ে চিরতরে পৃথিবীর বুক হতে অদৃশ্য জগতে চলে গেলেন দুই একদিন আগে! বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। অপ্রিয় এবং অবিশ্বাস্য হলে সত্যি এটাই যে, ওনি চলে গেছেন ওনার আসল গন্তব্যে! আর কবুও ফিরে আসবেননা। আসবেননা সুন্দর এই ভুবনে আমাদের সাথে বাচতে।

অনেক বেশি সহজ সরল ছিলেন। ছিলেন মিষ্টভাষী।
সবসময় হাস‍‍্যোজ্জ্বল থাকতেন। সহজেই সবাইকে আপন করে নিতেন। নিতান্তই ধৈর্য্যশীল এবং শান্ত স্বভাবের ছিলেন। কারো প্রতিক্রিয়ায় ক্ষিপ্ত না হয়ে বরং তাকে নরম ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করতেন।

খুব বেশি স্নেহ করতেন আমায়। মেঝ আম্মু বলে ডাকতাম। পারিবারিক সদস্য বৃদ্ধির কারণে ঘর আলাদা হলেও, ছোটবেলায় প্রায় সময় মেঝ আম্মুদের বাড়িতেই থেকে যেতাম। মেঝ মা হলেও আপন মায়ের চাইতে কিছুটা কম বলাটা অকৃতজ্ঞতার পর্যায়ে পড়বে। নিজের সন্তানের মতোই ব‍্যাবহার করতেন। কাটানো বিশ বছরে একটি কটু কথাও বলেননি কখনো। সবসময় মিষ্ট ভাষায় সুন্দর উপদেশ দিতেন। বছর কয়েক ধরে মেঝ আম্মুদের বাড়িতে তেমন থাকা হয়না। তবে নিয়মিত যেতাম মা টার স্নেহের টানে। গেলেই বলতেন,
“আকিব বসো। এরপর ভিতরে ডাক দিয়ে বলতেন- ‘ আকিবের জন‍্য নাস্তা নিয়ে এসো। এরপর পাশে বসে বিভিন্ন আলাপ আলোচনা।”
যতবারই যাইনা কেন, মেঝ আম্মুর আতিথ‍্য আর স্নেহ সমানই থাকত সবসময়।
আমাদের বাড়িতে আসলে; প্রথমে জিজ্ঞেস করতেন, -আকিব কোথায়?

সেই ভালবাসাটা এখন হারিয়ে গেছে অজানা পৃথিবীতে। মেঝ আম্মুদের বাড়ি থাকলেও, নেই মেঝ আম্মু। মেঝ আম্মুদের বাড়িতে গেলেও -কেউ আর হয়তো বসতে বলবেনা, কেউ আর নাস্তা দিবেনা, কেউ আর বসে মেঝ আম্মুর মতো কথা বলবেনা।

মেঝ আম্মুর বাড়ির পাশ দিয়ে কোনো মহিলা হেটে গেলেও, কুশল বিনিময় না করে থাকতে পারতেন না। জিজ্ঞেস করতেন, ” ওগো কেমন আছ? – এদিকে এসোনা।”
মেঝ আম্মুর প্রতি গ্রামের মহিলাদের ভালবাসা কতটুকু, তা বুঝেছি মেঝ আম্মুর মৃত্যুর দিনই। ঝাকঝাক মহিলা আসছে আর কাদছে অঝোরে। তারাও হয়তো তাদের মনের মধ্যে স্থান করে নেওয়া মানুষটি অকাতরে চলে যাওয়ার বেদনায় কাদছে।

একজন মানুষ কতটা ভাল হলে তার মৃত্যুর দিনে নিজের মেয়ের চাইতে ছেলের বউ অধিক শোকাহত হতে পারে! ছেলের বউয়ের চোখের পানিতে যার মৃত্যুশয‍্যা হয় শ‍্যাতসেতে, কতটা মহৎ তিনি;যিনি তার আচার আচরণে তার সন্তানের স্ত্রীকে এভাবে মায়ায় বন্ধী করেছেন। কখনো কারো মনে কষ্ট দেননি। সন্তান, পুত্রবধু কিংবা প্রতিবেশি কাউকেই কখনো কটু কথা বলেননি।

পাচঁ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, কুরআন পড়তেন নিয়মিত, পর্দা করতেন তথা মেনে চলতেন ইসলামের সব বিধিবিধান।

মায়ের চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিনা, খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে। মায়ের প্রতি বুকে জমে থাকা মায়াগুলো ঢুকরে কাদাচ্ছে শুধুই। ইচ্ছে করছে মায়ের কাছে গিয়ে একটু জড়িয়ে ধরে কাদতে, আর জিজ্ঞেস করতে – ‘কেন আমাদের সবার মাঝে এতো মায়ার সঞ্চার করে ; নীরবেই কেন সবাইকে একা করে চলে গেলেন?’

মা’কে যে এতো বেশি ভালবাসতাম, তা পূর্বে উপলব্দি করতে পারিনি। উপলব্দি করতে পারলে হয়তো মায়ের পাশে আরেকটু বেশি বেশি যেতাম। সবাই হারিয়ে ফেলার পরই বুঝে। আমিও হয়তো তার ব‍্যাতীক্রম নই!
আমার দেখা মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মহিলা হচ্ছেন আমার মেঝ আম্মু। যুগে যুগে জন্ম নিক আমার সেই মায়ের মতো হাজারো মা।
ক্ষমা করো মা আমায়। ভাল থেকো পরপরে। দেখা হবে একদিন – জান্নাতের বাগানে।

অবশেষে পাঠকদের নিকট মায়ের জন‍্য ক্ষমা এবং দোয়া কামনা করে এখানেই শেষ করছি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •