ছোটন কান্তি নাথ :

করোনাকালে এবার আষাঢ়ের প্রথম একটানা বর্ষণে কক্সবাজারের চকরিয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। এই অবস্থায় গলার কাঁটা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে বাস্তবায়িত দোহাজারি-কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত চকরিয়া অংশের রেল লাইনের উঁচু রাস্তাটি। কারণ এই রাস্তার পূর্বাংশজুড়ে আটকা পড়েছে কয়েকফুট উচ্চতায় বৃষ্টির পানি। পানি নেমে যাওয়ার জন্য এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট কালভার্ট না থাকায় এই পানি ভাটির দিকে নামতে পারছে না। পানিতে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর জমির রোপিত ফসল। এক্ষেত্রে রেল লাইনের উুঁচ রাস্তাকেই প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন ভুক্তভোগী মানুষগুলো। মঙ্গলবার দিবাগত রাত বারোটার পর থেকে লাগাতার এই বর্ষণে পৌরসভা ছাড়াও উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের নিন্মাঞ্চলে পানি টইটম্বুর ।

এদিকে আজ বুধবার বিকেলে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকায় এবং পার্বত্য অববাহিকার মাতামুহুরী নদীতে পাহাড়ি ঢলের পানিও বিপদসীমা অতিক্রম করে নামতে শুরু করেছে। এতে করোনাকালে পুরো চকরিয়া উপজেলাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মাঝে।

সরজমিন দেখা গেছে, বর্ষা মওসুম শুরুর প্রথমেই লাগাতার বর্ষণে চকরিয়াবাসীর জন্য গলার কাটা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে দোহাজারি  কক্সবাজার পর্যন্ত বাস্তবায়ন হতে যাওয়া রেল লাইনের নির্মিতব্য উঁচু রাস্তাটি। প্রায় ১০ ফুট উচ্চতার এই রেল লাইনের রাস্তার পূর্বাংশজুড়ে বর্তমানে আটকা পড়েছে কয়েক ফুট উচ্চতায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি। এই অবস্থায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের হাজারো পরিবারের মানুষ। পানিতে তলিয়ে গেছে দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠও। এতে আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিত হতে চলেছেন এখানকার কৃষকেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার হারবাং, বরইতলী, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, বিএমচর, সাহারবিল, চিরিঙ্গা, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী ইউনিয়নের বেশি সমস্যা করছে রেল লাইনের উঁচু রাস্তাটি। এই রাস্তার কারণেই ইউনিয়নের পর ইউনিয়নে ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তার ওপর ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় তলিয়ে যাচ্ছে ক্ষেতের
ফসলও।

কাকারার মাতামুহুরী তীরের বাসিন্দা চকরিয়ার প্রবীণ সাংবাদিক এম আর মাহমুদ জানান, চারিদিকে বিভিন্ন ধরণের উঁচু রাস্তা ও বাঁধ থাকায় অতি বৃষ্টির পানি ভাটির দিকে নামতে পারছে না। এতে অতি দ্রুতই ডুবে যাচ্ছে লোকালয়। এই অবস্থায় বিপদসীমা অতিক্রম করে উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের পানিও নামতে শুরু করেছে মাতামুহুরী নদীতে। এতে এবার ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখিন হবেন
চকরিয়ার মানুষ।

মাতামুহুরী সাংগঠনিক উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পশ্চিম বড় ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাবলা বলেন,‘অতিবর্ষণের কারণে ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। কারণ দোহাজারি টু কক্সবাজার এবং ফাঁসিয়াখালী টু মাতারবাড়ি কয়লাবিদ্যুত পর্যন্ত রেললাইন সড়কের বিশাল অংশ আমার ইউনিয়নে পড়েছে। এতে বৃষ্টির পানি নামার
ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করছে রেল লাইনের উঁচু রাস্তা। তাই রেল লাইনটি পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগে এলাকাভিত্তিক সমস্যা চিহ্নিত করে পানি যাতে ভাটির দিকে নামতে পারে সেজন্য ছোট ছোট কালভার্ট নির্মাণ করা খুবই জরুরী। এসব বিষয় জেলা এবং উপজেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে অবহিত করা হবে।’

জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তাবরীজ বলেন, ‘ভারি বর্ষণ এবং মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা উজানের পানি যাতে দ্রুত ভাটির দিকে নেমে যেতে পারে সেজন্য উপকূলীয় এলাকার সকল স্লুইস গেট দুই ঘন্টার মধ্যে খুলে দিতে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও রেল লাইনের উঁচু রাস্তার কারণে যেসব এলাকায় পানি
নামতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের সঙ্গে বসে করণীয় নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি চলতি বর্ষা মওসুমেও যাতে কোন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’ এ ব্যাপারে কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য ও চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম বলেন, ‘এবারের বর্ষা মওসুমের শুরুতে টানা
কয়েকঘন্টার ভারি বর্ষণে চারিদিকে পানি জমে যাওয়ার ক্ষেত্রে রেল লাইনের নির্মিতব্য মাটির রাস্তাটিকে দায়ি করছেন মানুষ। এখনো যেহেতু রেল লাইন নির্মাণের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি, সেহেতু কোথায় কী সমস্যা তা চিহ্নিত
করার সুযোগ হয়েছে।’

এমপি জাফর আলম বলেন, ‘ভবিষ্যতে এই সমস্যা সমাধানকল্পে এলাকাভিত্তিক পানি নিষ্কাষনের সুবিধার্থে কালভার্ট নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। অপরদিকে উপকূলীয় এলাকার স্লুইস গেটগুলো খুলে দিতে ইতোমধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •