সিবিএন ডেস্ক:

করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশের অর্থনীতির প্রধান চার খাতই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এর মধ্যে গত এপ্রিল মাসে রাজস্ব খাতে কোনও প্রবৃদ্ধিই হয়নি। একইভাবে কোনও প্রবৃদ্ধি নেই আমদানি ও  রফতানি খাতেও। এছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সেও কোনও প্রবৃদ্ধি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, উল্লিখিত চার খাত শুধু নিম্নমুখীই হয়নি, এই খাতগুলোতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এপ্রিল মাসে সরকারের রাজস্ব খাতে কোনও প্রবৃদ্ধি হয়নি, উল্টো এই খাতে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একইভাবে এপ্রিল মাসে আমদানি খাতে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। একই মাসে রফতানি খাতে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮২ দশমিক ৮৬ শতাংশ।  আর  মে মাসে এই খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে নেগেটিভ ৬১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এছাড়া  মে মাসে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাইনাস ১৪ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, সরকার এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশে  নামিয়ে এনেছে।

অবশ্য বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আড়াই শতাংশের বেশি হবে না।  তার মতে, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে পাঁচটি খাত সরাসরি বড় ধরনের অসুবিধায় পড়েছে। বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং ও কন্সট্রাকশন খাত প্রত্যক্ষভাবে এবং হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও পরিবহন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তবে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বড় আঘাত আসবে তার প্রমাণ মেলে সরকারের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা দেখলেই। সরকার বেসরকারি বিনিয়োগ হারের লক্ষ্যমাত্রা অর্ধেক কমিয়েছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২৪ দশমিক ২। সেখান থেকে কমিয়ে ১২ দশমিক ৭ এ নামিয়ে আনা হয়েছে।

পণ্য রফতানি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এপ্রিল মাসে পণ্য রফতানি হয়েছে ৫২ কোটি ডলারের। আগের বছরের (২০১৯) এপ্রিলে রফতানি হয়েছিল ৩০৩ কোটি ৪২ লাখ ডলার। অর্থাৎ, গত বছরের এপ্রিলের চেয়ে এবছরের এপ্রিলে রফতানি হয়েছে ৮২ দশমিক ৮৬ শতাংশ কম। এছাড়া গত মে মাসে পণ্য রফতানি হয়েছে ১৪৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। আগের বছরের মে মাসে রফতানি হয়েছিল ৩৮১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে নেগেটিভ ৬১ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই- মে) ৩ হাজার ৯৫ কোটি ৯১ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। এই আয়  গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ কম।

আমদানি খাত

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এপ্রিল মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২৮৫ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৫১২ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। এছাড়া, এপ্রিল মাসে ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে ১৬০ কোটি ডলারের। আগের বছরের একই সময়ে ঋণপত্র খোলা হয় ৫২৬ কোটি ডলার।  সেই হিসাবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় গত এপ্রিলে ঋণপত্র খোলা কমেছে ২৬৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঋণপত্র নিষ্পত্তিও কমেছে অনেক। গত এপ্রিলে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ১৯৫ কোটি ডলারের, আগের বছরের এপ্রিলে নিষ্পত্তি হয়েছিল ৫০৮ কোটি ডলার। সে হিসাবে ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে ৬২ শতাংশ।

রাজস্ব খাত

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত এপ্রিল মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর ৮ হাজার ৯৩৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ট্যাক্স রেভিনিউ আদায় করেছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১৯ হাজার ৬১৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ সরকারের রাজস্ব খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৫৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিবছরই রাজস্ব আয়  বাড়ছে। কিন্তু এবারই আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আয়  কমতে যাচ্ছে। এনবিআর চেয়ারম্যান ১৪ মে অর্থসচিবকে চিঠি দিয়ে এ তথ্য জানান।

রেমিট্যান্স

করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে বিশ্বের অনেক দেশেই লকডাউন চলছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে গেছে। ফলে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সও ধীরে ধীরে কমে আসছে। গত এপ্রিল মাসে প্রবাসীরা ১০৮ কোটি ৬৪ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। আগের বছরের একই মাসে এসেছিল ১৪৩ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ রেমিট্যান্স কমেছে ২৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে আগের বছরের মে মাসের তুলনায় রেমিট্যান্স এ প্রবৃদ্ধি কমেছে ১৪ শতাংশ।

গত মে মাসে প্রবাসীরা ১৫০ কোটি ৩৪ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। আগের বছরের একই মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৭৮ কোটি ৮১ লাখ ডলার।

এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে-বাংলাদেশের রফতানি, রেমিট্যান্স ও অভ্যন্তরীণ খাত মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের ‘কান্ট্রি ফোকাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি শুক্রবার(১২ জুন) প্রকাশিত হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে চলতি বছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে আসবে। যদিও করোনা সংকটের আগে সংস্থাটি ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল।

আইএমএফ  বলেছে, কোভিড ১৯-এর প্রভাবে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান দুটি খাত (তৈরি পোশাক রফতানি ও রেমিট্যান্স )মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া করোনার প্রভাবে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও শ্লথ গতি দেখা যাচ্ছে। এতে রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •