শ্যামল রুদ্র :

খাগড়াছড়ি জেলায় উৎপাদিত আম,কাঁঠাল,কলাসহ বিভিন্ন মৌসুমী ফলফলারি অন্যত্র পরিবহনে জেলা পরিষদ,পৌরসভা ও বাজার ফান্ডের ধার্য্য মূল্যের অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এবং এ সব অবৈধ টোল আদায়কারী শক্তিশালী সিন্ডিকেটভুক্ত দালাল চক্রের হাতে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিয়ত নানা হয়রানি ও অশোভন আচরণের মুখোমুখি হতে হয় বলে জানিয়েছেন, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।

গত ১০জুন বুধবার খাগড়াছড়ি প্রেস ক্লাবে বাগান মালিক সমবায় সমিতি ও মারমা ফলদ বাগান মালিক সমিতির যৌথ উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলনে এ অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ জানানো হয়। এ সময় বাগান মালিক নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে অবৈধ সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের সত্যিকারের সহযোগিতা চেয়েছেন। মালিক সমবায় সমিতির উপদেষ্টা ও সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য অনিমেষ চাকমা রিংকু ক্ষোভ জানিয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন,“জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান,জেলা প্রশাসক ও পৌরমেয়রসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে ইতোপূর্বে একাধিকবার অনিয়ম-দুর্নীতির কথা জানিয়েছি। কিন্তু অদ্যাবধি কোন সুফল পাওয়া যায়নি। একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়েই যেন তাঁদের দায়িত্ব শেষ!” জানতে চাইলে জেলা পরিষদের নিবার্হী কর্মকর্তা টিটন খীসা এই প্রতিবেদককে বলেন, “প্রতিবছরই টোল কেন্দ্রগুলো ইজারা দিই, এখানে সরকার নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত আদায় করার সুযোগ নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে”।

ফলদ বাগান মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি দিবাকর চাকমা প্রসঙ্গক্রমে জানান, “কৃষি মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ, খাগড়াছড়ি ও গুইমারা সেনা রিজিয়ন কমান্ডার বরাবর লিখিতভাবে ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখলে নিশ্চিতভাবেই অনিয়ম-দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া যাবে। গুইমারা সেনা রিজিয়ন বিএম সিনিয়র মেজর ইমরান লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি এই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করে বলেন,এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বাগান মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক জগৎ জীবন চাকমার উত্থাপিত লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, খাগড়াছড়ি,মাটিরাঙ্গা ও রামগড় ৩ টি পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও বাজার ফা-ের টোলআদায় কেন্দ্র গুলোতে আম,কাঁঠাল,কলাসহ ফলদ পণ্য পরিবহনে সরকার নির্ধারিত টোলের অতিরিক্ত দুই থেকে তিন’শ গুণ আদায় করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে টোল পয়েন্টগুলো সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি থাকায় বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সরকারি কোষাগারে ছিটেফোঁটা জমা দিয়ে আদায়করা অর্থের সিংহভাগই ভাগবাটোয়ারা করে খাচ্ছেন সিন্ডিকেটভুক্ত দুষ্ট চক্রগুলো। ফি বছর ধরে এ অপতৎপরতা চললেও দেখা বা বলার যেন কেউ নেই! ইতোমধ্যে অনেকেই গাড়ি-বাড়িসহ বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন কালো টাকার দৌরাতেœ্য। এই অনিয়মের প্রতিবাদ করলে অশ্রাব্য-অশ্রীল গালমন্দ ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। মালামাল নষ্ট করে ফেলার হুমকী দেওয়া হয় ব্যবসায়ীদের। স্থানীয় প্রশাসনের ঢিলেঢালা মনোভাবের কারণে লোকাল ও বাইরের ব্যবসায়ীরা নিগৃহীত হচ্ছেন সবসময়। ফলে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন বাগান ও হাট-বাজার থেকে ফল-ফলারিসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছেন বাইরের ব্যবসায়ীরা। এ অশুভ তৎপরতা অব্যাহত থাকলে জেলার বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার কথা জানান সংবাদ সম্মেলনে। এখানে উপস্থিত মারমা ফলদ বাগান মালিক সমিতির অর্থ সম্পাদক মংসিং মারমা বলেন,“খাগড়াছড়ি পৌরসভার টোল আদায় হার নিজেদের বানানো মনগড়া, দেশের কোন পৌরসভার সঙ্গে মিল নেই। ইচ্ছেমাফিক টোল আদায় করা হয়।” এতে বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পাশাপাশি ফসল উৎপাদনে নিরুৎসাহী হচ্ছেন।

অন্যদিকে,খাগড়াছড়ি জেলাপরিষদের অধীন আরেক রক্তচোষা সংস্থা “বাজার ফান্ড”, যেটি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করছে অতিরিক্ত চাঁদা। ব্যবসায়ী নেতা অনিমেষ চাকমার ভাষ্যমতে, “বাজার ফান্ড, জেলা পরিষদ ও পৌরসভার যাতাঁকলে ব্যবসায়ীদের অবস্থা এখন ‘ত্রাহিমধুসূধন’। একই পণ্য থেকে তিন সংস্থার টোল আদায়। এ যেন এক মুরগি তিনবার জবাই করা”।

মারমা ফলদ বাগান মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক বাবুশ্যি চৌধুরী জানান, জেলা পরিষদের অধীন রামগড়ের সোনাইপুল এবং মানিকছড়ির গাড়ি টানা টোল আদায় কেন্দ্রে সরকারি রেইট সিডিউল ২০০-৫০০টাকার স্থলে গাড়ি প্রতি কোন ধরনের রশীদ ছাড়াই ৩০০০-৮০০০ পর্যন্ত আদায় করা হয়। রামগড় পৌর টোল কেন্দ্রেরও একই অবস্থা বলে জানান দিবাকর চাকমাসহ নেতৃবৃন্দ। বৈশ্বিক মহামারি করোনা কালে যখন পণ্যসামগ্রী বিপণনে ব্যবসায়ীরা প্রচন্ড সমস্যায় পড়েছেন তখন অতিরিক্ত টোল আদায় তাঁদের কাছে যেন,“মরার ওপর খাঁড়ার ঘা ”

রামগড়ের বাসিন্দা অধ্যক্ষ ফারুকুর রহমান এই প্রতিনিধিকে বলেন, জেলাপরিষদ ও পৌরসভার টেক্স’র (লাইন খরচ হিসাবে পরিচিত) নিপীড়নে ব্যবসায়ীরা অতীষ্ট হয়ে পড়েছেন। বাইরের ব্যবসায়ীরা এখন পার্বত্য এলাকায় আসতেই চান না। বিভিন্ন সময়ে সিভিল প্রশাসনের সহযোগীতা চেয়েও পাওয়া যায়নি। দেশের বিশেষ অঞ্চল পার্বত্য চট্রগ্রামের এই এলাকার টোল কেন্দ্রগুলোর অনিয়ম-হয়রানি ও দুর্নীতি প্রতিরোধে গুইমারা সেনা রিজিয়ন কমান্ডার ও রামগড় বিজিবি কমান্ডারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এই প্রতিনিধি বিজিবি কমান্ডার লে.কর্নেল তারিকুল হাকিম, পিএসসি’র সঙ্গে কথা বললে ব্যবসায়ীদের সাহার্য্য করার আশ্বাস দেন তিনি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •