এম.জিয়াবুল হক, চকরিয়া
চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে জেঁকে বসেছে শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট চক্র। বিশেষ করে নতুন মিটার সংযোগ নেয়ার ক্ষেত্রে ডুলাহাজারা ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের রিংভং এলাকার অন্তত তিন থেকে চার শতাধিক পরিবার স্থানীয় একটি দাপুটে সিন্ডিকেট চক্রের হাতে জিন্মি হয়ে পড়েছেন বছরের পর বছর ধরে। অভিযোগ উঠেছে, ডুলাহাজারা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সংশ্লিষ্টদের আস্কারায় স্থানীয় সাবেক মেম্বার আবদুর রহমান এবং আবদুর রশিদ নামের দুই ব্যক্তি রিংভংসহ আশপাশ এলাকায় বিদ্যুত সংযোগ দেয়ার নানা অজুহাতে বিগত ৭-৮বছর ধরে গ্রাহকদের জিন্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই দুইজনের মাধ্যমে ছাড়া ডুলাহাজারা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি থেকে কোন গ্রাহক সহজে সংযোগ নিতে পারছেনা। এই অবস্থাটি অব্যাহত রয়েছে প্রায় আটবছর ধরে।

অভিযোগে ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের রিংভং হাসিনা পাড়া গ্রামের লোকজন দাবি করেছেন, ৭বছর আগে বিদ্যুত সংযোগ দেয়ার নামে নতুন মিটার নিতে প্রতি পরিবার থেকে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা দাবি করেন স্থানীয় সাবেক মেম্বার আবদুর রহমান। সাতবছর আগে ২০১৩ সালে ওই এলাকার ৬৫টি পরিবার টাকা তুলে আবদুর রহমানকে ২৫ হাজার টাকা দেন বিদ্যুত সংযোগ পেতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনে।

ভুক্তভোগী বেশিরভাগ পরিবার সদস্যরা অভিযোগ তুলেছেন, পল্লী বিদ্যুত সমিতির কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভালো সর্ম্পক আছে। সেই সুযোগে এলাকার অনেক পরিবারকে বিদ্যুত সংযোগ পাইয়ে দিয়েছে আবদুর রহমান। সবার দেখাদেখিতে টাকা দিয়েছে ৬৫টি পরিবার। তারপর সময় গড়িয়েছে, ডুলাহাজারা অফিসে অনেক কর্মকর্তা বদল হয়েছে, ততদিনে বিদ্যুত ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। কিন্তু এতদিনেও বিদ্যুত সংযোগের দেখা পাননি হাসিনাপাড়া গ্রামের ভুক্তভোগী ৬৫টি পরিবার। তদন্ত করলে ঘটনাটির সত্যতা পাওয়া যাবে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং ভুক্তভোগী পরিবার গুলো।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডুলাহাজারা ইউনিয়নের হাসিনাপাড়া গ্রামের বাস্তবতার সঙ্গে মিল আছে ১ নং ওয়ার্ডের রিংভং উত্তর পাহাড়, দক্ষিন পাহাড়, মাঝেরপাহাড়, ছিরাপাহাড়, নতুন মসজিদ, বাগিচাপাহাড়, দরগা পাহাড়, আফেন্দিঘোনা ও মগ্যারমারছড়া এলাকার তিন থেকে চারশতাধিক পরিবারের ক্ষেত্রে। প্রতিটি পরিবার নতুন মিটার সংযোগ নেয়ার ক্ষেত্রে দাপুটে সিন্ডিকেট চক্রের হাতে জিন্মি হয়ে পড়েছেন বছরের পর বছর ধরে। উল্লেখিত এসব এলাকাকে দুইভাবে বিভক্ত করে নিয়েছেন পল্লী বিদ্যুত সমিতির সুবিধাভোগী ‘ লোক’ হিসেবে পরিচিতি মেম্বার আবদুর রহমান এবং আবদুর রশিদ। অভিযুক্ত আবদুর রহমানের বাড়ি রিংভং এলাকায়। অপরদিকে আবদুর রশিদের বাড়ি একই ওয়ার্ডের মগ্যারমারছড়া এলাকায়।

স্থানীয় লোকজন দাবি করেছেন, পল্লী বিদ্যুত সমিতির সুবিধাভোগী ‘ লোক’ হিসেবে পরিচিতি আবদুর রহমান এবং আবদুর রশিদকে ডিঙ্গিয়ে কেউ সরাসরি অফিসে গিয়ে বিদ্যুত সংযোগ নিতে পারেনা। কেউ যদিও বা অফিসে গিয়ে সংযোগ নিতে চেষ্ঠা করেন তাকে নানাভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অফিসের লোকজন সহজে ভুক্তভোগী গ্রাহকদেরকে সংযোগ দিচ্ছেনা নানা অজুহাতে।

অভিযোগ উঠেছে, আবদুর রহমান ও আবদুর রশিদ পল্লী বিদ্যুত সমিতি ডুলাহাজারা অফিসের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগসাজসে গ্রাহকদের জিন্মি করে রেখেছে। তাদের কথা মতো প্রতিটি মিটারে ৩ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা দিতে হচ্ছে গ্রাহকদেরকে। ক্ষেত্র-বিশেষে গুনতে হচ্ছে ৫ হাজার থেকে আট হাজার টাকা। যদিও বিদ্যুতের সংযোগ নিতে সরকারি আদেশে বলা আছে, সংযোগ নিতে গ্রাহককে ফি হিসেবে দিতে হবে ৪০০ টাকা, সদস্য ফি হিসেবে ৫০ টাকা, আবেদন ফি গুনতে হবে ১২৫ টাকা।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, সরকারি নীতিমালার আলোকে পল্লী বিদ্যুত সমিতির ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ কর্মসুচিতে বলা হচ্ছে, বিদ্যুত সংযোগ বা মিটার নিতে প্রতিজন গ্রাহককে ৫৭৫ টাকা পরিশোধ করলে সংযোগ মিলবে। কিন্তু এই বাস্তবতা রিংভংবাসির ক্ষেত্রে সোনার হরিণ হয়ে দেখা দিয়েছে। অফিসের লোকজনের সঙ্গে দালাল চক্রের যোগসাজস থাকায় ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুত’ কার্যক্রমের সুফল থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।

রিংভং এলাকার এক নারী গ্রাহক দাবি করেন, দুইবছর আগে তাঁর বাড়িতে বিদ্যুত সংযোগ নিতে আগ্রহী হন। অন্যের দেখা দেখিতে সাবেক মেম্বার আবদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। বিদ্যুত লাইন আনতে খুটি স্থাপন করতে হবে। এই অজুহাতে প্রথমে ১৫০০ টাকা নেন আবদুর রহমান। পরবর্তীতে মিটারসহ বিদ্যুত সংযোগ দিতে আরো ২০০০ টাকা নেন একই ব্যক্তি। কিন্তু এই দুইবছরে বাড়ির কাছে খুঁিট আসলেও এখনো মিটার কিংবা বিদ্যুত সংযোগ নাগালে পাননি ওই নারী গ্রাহক।

তিনি বলেন, আমার মতো এলাকার আরো ৩৫টি পরিবার একইভাবে বিদ্যুত সংযোগ নিতে আবদুর রহমানের সঙ্গে লেনদেন করেছেন। এখনো কারো বাড়িতে বিদ্যুত আসেনি। শুনেছি রহমানের বাড়িতে ৩৫টি মিটার আটকাবস্থায় রয়েছে। সকল গ্রাহকের টাকা হাতে পেলে মিটার গুলো ছাড়বে। এক্ষেত্রে অফিসের লোকজন কোন ধরণের প্রতিকার করছেনা।

ভুক্তভোগী নারী গ্রাহক আপেক্ষ করে বলেন, অতিরিক্ত টাকা দিয়েও বিদ্যুত পাচ্ছিনা। তাই বাড়িতে অসুস্থ রোগী থাকায় বিগত ৭-৮মাস ধরে অপর একটি পরিবার থেকে সাইট লাইন নিয়ে কোনমতে তিনটি লাইট, দুইটি ফ্যান চালিয়ে সমস্যা মিটাচ্ছি। তারজন্য প্রতিমাসে আমাকে দিতে হচ্ছে চারশত থেকে পাঁচশত টাকা।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার (১১জুন) রাতে অভিযুক্ত আবদুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, হাসিনাপাড়া গ্রামের ৬৫টি পরিবার পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ পেতে আবেদন বাবত আমাকে ২২শত টাকা দিয়েছিলো। ২৫ হাজার টাকা দেয়ার কথাটি অবান্তর। আমি ওইসময় পরিবার গুলোর জন্য কাজও করেছি। জায়গাটি বনবিভাগের হওয়ায় সংযোগ পেতে সেসময় বিড়ম্বনা দেখা দেয়। তবু বনবিভাগ থেকে একটি সার্ভে রির্পোটও নিয়েছিলাম পরিবার গুলোর জন্য। কাজ করেছি বলেই দোষারুফ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এলাকার মানুষের অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়ে বিদ্যুতের সংযোগ পেতে সহযোগিতা করি। নীতিমালার বাইরে কারো কাছ থেকে অতিরিক্ত কোন টাকা অদ্যবদি নিইনি। আগে সংযোগ পেতে অনেক ধরণের সমস্যা থাকলেও বর্তমানে পল্লী বিদ্যুত সমিতিতে কোন ধরণের অনিয়ম নেই। আশাকরি সহসা হাসিনাপাড়ার পরিবার গুলো সংযোগ পেয়ে যাবে। কাজটি সমাপ্তির পথে আছে।

অপরদিকে ডুলাহাজারা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে দালাল সিন্ডিকেট নেই বলে দাবি করেছেন পল্লী বিদ্যুতের চকরিয়া উপ-বিভাগের অধীন ডুলাহাজারা অঞ্চলের পরিদর্শক গোপাল দাশ। তিনি বলেন, সাতবছর আগে কী ঘটেছে সেগুলো আমাদের জানার কথা না। এখন বলেন, কোন জায়গায় সংযোগ নিতে নীতিমালার বাইরে টাকা দিতে হচ্ছে বা গ্রাহককে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, পল্লী বিদ্যুত সমিতির সংযোগ লাইন ও মিটার নিতে প্রতিজন গ্রাহককে সদস্য ফি বাবত ৫০ টাকা, আবেদন ফি বাবত ১২৫ টাকা এবং সংযোগ ফি বাবত ৪০০ টাকা দিতে হচ্ছে। এর বাইরে অতিরিক্ত কোন টাকা নেয়ার সুযোগ নেই। নীতিমালার আলোকে সকল ফি জমা দেয়ার পর ওই গ্রাহককে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংযোগ দেয়া হচ্ছে।

গ্রাহকদের অভিযোগ সমুহ অবহিত করা হলে পল্লী বিদ্যুত সমিতি কক্সবাজার জেলা ও বান্দরবান জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক মো.হায়দার আলী বলেন, এখন পল্লী বিদ্যুত সমিতিতে চলছে ‘ আলোর ফেরিওয়ালা’ কর্মসুচি। এই কার্যক্রম নীতিমালা মেনে ৫৭৫ টাকা পরিশোধ করা মাত্র পাঁচ মিনিটে গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁেছ যাচ্ছে বিদ্যুত সুবিধা। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুত’ এই কর্মসুচি আমরা শতভাগ সফল করতে চাই। এখানে কোন ধরণের অনিয়ম বা হয়রাণির সুযোগ নেই। তারপরও ডুলাহাজারা অফিসের অধীনে কোন ধরণের অনিয়ম বা অচ্ছ্বতার ঘটনা ঘটলে তা তদন্তের মাধ্যমে বিহীত করা হবে। এতে গ্রাহক হয়রানি বন্ধে ও দোষীদের ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •