খোরশেদ আলম


“ডোলা ” অর্থ বাজারের থলে। এটা বাঁশ আর বেত দিয়ে বানানো হয়। অনেক বছর পর এই লকডাউনের বন্দী সময়ে “ডোলা” র কথা মনে পড়ে গেল। সচারাচর শহরে কিংবা গ্রামে তেমন একটা আর দেখা যায় না। মাঝে মধ্যে দু’একটা চোখে পড়ে এবং গ্রাম – গন্জে কিছু কিছু দেখা যায় তাদের হাতে যারা বাপ – দাদার প্রাচীন এই অভ্যাসটা আদৌ ছাড়তে পারেনি। তখন মা-খালারা, দাদী-নানীরা তাদের স্বামীদেরকে সকালের নাওয়াখাওয়া সারিয়ে যারপরনাই ব্যস্ত হয়ে পড়তো কখন “ডোলা” হাতে তুলে দিয়ে বাজারে পাঠাবে। তখন”ডোলা ” হাতে আয়েশ করে রিক্সায় চড়ে বাজারে যাওয়া নিত্য দিনের দাদাগিরি অভ্যেস। করোনা নামের মৃত্যুর দূত আজরাইল সম্মুখে দাড়িয়ে কিন্তু হুমড়ি খেয়ে পড়ে ধাক্কা ধাক্কি করে হলেও বাজার করতে হবে, বাজারকরা চাই, চাই।

প্রসংগএ্মে প্রাসংগিক বিধায় “ডোলা” র সাথে সম্পর্কিত “আইল্যার” কথা মনে পড়ে যায়। “আইল্যা”/ “গ”ওর ” লকডাউনের এই কঠিন পরিস্থিতিতে বাজারের কথা ভাবতেই তাদের কথা মনে আসে আইল্যা” অর্থ কাজের ছেলে যাকে মাসিক বেতনে বাড়িতে কাজকর্ম করার জন্য রাখা হয় আর “গ’ওর” হলো মাঝে মধ্যে বাড়িতে ঝলি-বেড়া বানানো, ঘরের চালে(ঘরের উপরের অংশ) ও মাটি কাটা
ইত্যাদি কাজ করার দৈনিক বেতনভোগী লোক।
ঝলি-বেড়া হ’লো বাঁশ দিয়ে করা সীমানা প্রাচীর। বিওবানরা, হাজীসাব কিংবা অমুক মিয়া বাজারের থলে অর্থাৎ “ডোলা” নিজ হাতে নিয়ে বাজার করবে এটা সম্মানহানির বিষয়। তাই “ডোলা” হাতে ‘আইল্যা’দের সাথে রাখতো। মাঝে মধ্যে আইল্যার অন্য কাজ থাকলে ” গ’ওর” নিয়ে বাজারে যেত এবং বিয়ে শাদীর বড় আয়োজনে ‘গ’ওর’ ছিল প্রয়োজনীয় লোক। রেডজোনের বদৌলতে কক্সবাজারে যে লকডাউন
চলছে তাতে সপ্তাহে দুই দিন রবিবার ও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত খোলা রাখা হয়েছে।মানুষ এর মধ্যে বাজার করে আসবে। এই জায়গায় আমার গত লেখায় আবেদন ছিল ‘ বাজার সপ্তাহে দুই দিন খোলা রাখায় মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়বে।
ঠিকই দেখা গেল রোববার বাজার করতে গিয়ে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, যেহেতু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম তাই জিনিসের দাম অত্যদিক বেড়ে গেছে ও অদেখা করোনা নিয়ে বাসায় ফিরেছে যার ফলাফল পাবে সাত-আট দিন পর জ্বর,কাশি, গলা – ব্যথা ও শ্বাস-কষ্টের মাধ্যমে। এবার দেখা যাবে আগামী বৃহস্পতিবারেও অনুরুপ ঘটনার পূণরাবৃওি ঘটাবে। চৌদ্দ দিনে চারবার বাজার করার ফলে
বাকী মাসগুলোতে করোনার দূর্যোগ কতটা ভয়াবহ হবে ভেবে দেখুন? যেখানে সরকার এবং পুলিশ বাহিনী নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনাদের নিবৃত্ত রাখার চেষ্টা করছে। তাই অনুরোধ ঘরে থাকুন, বাজার যতদূর পারেন আর ১০/১২ দিন ডাল, ডিম, আলু ইত্যাদি দিয়ে চলুন। অনুগ্রহ করে বাজারে যাবেন না, ঘরে থাকুন।

আপনারা হয়ত বলতে পারেন সরকারতো সপ্তাহে দুই দিন খোলা দিয়েছে? ঠিক কিন্তু করোনা বাজারে আসতে পারবে না তারতো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি তবে নিশ্চয়তা এতটুকু বাকী দিনগুলো নিজে এবং পরিবারকে বাঁচার জন্য ঘরে এবং ঘরেই থাকুন।

নিজের এলাকা ককসবাজার এবং দেশের অপরাপর জেলাগুলো যেখানে রেডজোন ও ইয়োলো জোন ঘোষণা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যেখানে তাদের প্রতি, সেখানকার জনপ্রতিনিধি, কমিশনার, চেয়ারম্যান ও সরকারি কর্মকর্তাদের দৃস্টি আকর্ষণ করে বলছি ঃ- ১। ১৪ দিনের মধ্যে চারবার বাজারে যেতে হলে ঘরে থাকলাম আর কোথায় ? আগের দিনে গ্রামে সাপ্তাহিক হাট বসতো অর্থাৎ সপ্তাহে একদিন। সপ্তাহে একদিন
ফলে চৌদ্দ দিনে দুইবার, আমার মতে এই নিয়ম অনেকটা যথাযথ। ২। বাজার ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। এক্ষেত্রে ওয়ার্ড কমিশনারগণ যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারবে। তারা নিজ ওয়ার্ডকে ৪/৫ ভাগে ভাগ করে প্রতি অংশে একজন করে লোক নিয়োগ দিবে যে তার অংশে হ্যান্ড মাইক নিয়ে হেঁটে হেঁটে ঘরে থাকার ঘোষণা দিবে এবং বাজার যা লাগবে মোবাইলে তাকে বলা হবে সেই পৌঁছে দিবে। ওয়ার্ড কমিশনার মনিটর
করবে। প্রয়োজনে এলাকার লোকজনের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ রাখবে ও ঘরে থাকার কথা
বলবে ।
৩। বাজার প্রতিদিনও খোলা রাখতে পারবে। তবে ওয়ার্ডভিওিক আংশিক। ফলে সুবিধা হবে কৃষি পন্যের, ডিম ও মুরগী খামারীদের বাজারজাতকরণ। আজকের ক্ষেতের ফসল আজকেই তুলতে,খামারীর মুরগী, ডিম, দূধ দিনেরটা দিনের মধ্যেই বাজারে নিতে হয। মানুষকে এসব পৌঁছে দিতে হবে।
৪। প্রতিটি ওয়ার্ডে ভেন্গাড়ীর মাধ্যমে যেমন তরকারির দুইটি গাড়ী, মূরগী,ডিম,দুধের দুইটি গাড়ী বিক্রেতাকে যতাযত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বিক্রির সুযোগ দিলে সমস্যার সমাধান অনেকটা সম্ভব। শ্নেহের অতি প্রিয় বাজারকে তাদের দোরগোড়ায় পাবে। ফলে সমস্যার অনেক সমাধান হবে, মানুষ ঘরে থাকবে ।
৫। লকডাউনের পরবর্তী ১৪ দিনও উপরোক্ত ব্যবস্থা বাজার করার ক্ষেএে বজায় রাখতে হবে এবং এভাবে সফলতা আশা করা যায়।


লেখক : খোরশেদ আলম বিশিষ্ট ব্যাংকার ও উপদেষ্টা টেকপাড়া সোসাইটি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •