শাহেদ মিজান, সিবিএন:

করোনার কারণে বড় ধরণের আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে পান চাষীরা। এই বিশাল ক্ষতির কারণে দেশের বৃহৎ পান উৎপাদনকারী উপজেলা মহেশখালীতে ঘরে ঘরে হাহাকার চলছে। চলছে মানুষের নীরব কান্না।কেননা মহেশখালীর অন্তত ৬০ ভাগ মানুষ পান চাষের জড়িত এবং মোট অর্থের অর্ধেকের বেশি পান থেকে আসে। শুধু করোনা নয়; পানের চরম দরপতনে দালাল সিন্ডিকেটও দায়ী। মহেশখালীর পানচাষীরা এই অভিযোগ করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহেশখালীর উৎপাদিত মিষ্টিপান দেশের পানের বৃহৎ চাহিদা মিটিয়ে আসছে দীর্ঘদিন। এমনকি মহেশখালী বিদেশে রপ্তানিও হয়। তাই পানই মহেশখালীর প্রধান অর্থকরী উপাদান। উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ পান চাষের সাথে জড়িত। পানের কদর বাড়ায় চলতি মৌসুমে অতীতের চেয়ে বেশি পান চাষ হয়েছে। কিন্তু পান উৎপাদনের ভর মৌসুম মার্চ থেকে করোনার হানা শুরু হলে পানের উপর বিরাট ধাক্কা পড়ে। প্রচুর পান উৎপাদন হলেও লকডাউনের কারষে মুখ থুবড়ে পড়ে পানের দর। শুরুর দিকে করোনা সংক্রমণ রোধ এবং লকডাউনে সরবরাহ সমস্যার কারণে এক লাফে সর্বনিম্ন স্তরের নেমে যায় পানের দাম। কিন্তু এপ্রিল থেকে প্রশাসন বিশেষ ব্যবস্থায় পান সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করলেও আর বাড়েনি পানের দাম। বরং আরো কমেছে।

সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও কেন আর বাড়েনি পানের দাম? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যায় ‘নির্মম’ তথ্য। জানা গেছে, সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও হতভাগা পানচাষীদের ঘাড়ে চেপে বসে পান ক্রয়কারী দালাল সিন্ডিকেট। করোনার অজুহাত দেখিয়ে দালালরা সিন্ডিকেট করে আর বাড়তে দেয়নি পানের দাম- এমন অভিযোগ চাষীদের।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, মহেশখালীতে ছোট-বড় মিলে অন্তত ২০টির বেশি পানবাজার বসে। এসব বাজারে নিয়মিত পান ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবাহ করে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাই। এসব বাজার কেন্দ্রিক এসব ব্যবসায়ীদের রয়েছে সমিতি। আগেও সিন্ডিকেট করে পানের দাম চেপে রাখার অভিযোগ ছিলো। কিন্তু এখন করোনাকে পুঁজি করে আরো বেশি সক্রিয় রয়েছে এসব পানের দালাল (ব্যবসায়ী) সিন্ডিকেট। করোনার দোহাই দিয়ে এইসব সিন্ডিকেটগুলো পান চাষীদের জিম্মি করে রেখেছে।

মহেশখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুর রোকন জানান, তার এলাকার নতুনবাজার হচ্ছে উপজেলার সবচেয়ে বড় পানের বাজার। কিন্তু এই পান বাজারটি নিয়ে চরম নৈরাজ্য চালাচ্ছে দালাল সিন্ডিকেট। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পানের মোটামুটি দর থাকলেও দালালরা হাটের আগের রাতে যোগসাজস করে চেপে রাখছে পানের দর। মহেশখালীর সব বাজার কেন্দ্রিক দালালদের এই ভয়াবহ নৈরাজ্য চলছে বলে জানান মাহবুব রোকন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মহেশখালীতে পানের দাম এখন স্মরণকালের সবচেয়ে তলানীতে রয়েছে। লকডাউনের আগে যে পান ৩৫০-৪০০ টাকায় বিক্রি হতো সে পান এখন বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্ছ ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। ছোট আকারের পানগুলো বিক্রিই হচ্ছে না। সেগুলো ফেলে দিচ্ছে চাষীরা। এতে পান ছিঁড়া এবং গোছানোর জন্য দেয়া শ্রমিকের টাকার অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না।

স্থানীয় সংবাদকর্মী এস.এম রুবেল তার ফেসবুকে স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘আমার বাবা ভোরে এই পানবাজারে স্বাস্থ্য বিধি মেনে পান বিক্রি করতে গিয়েছিলেন। সব পান ১৫০ টাকায় বিক্রি করলেন। তারমধ্যে গাড়ি ভাড়া দিলেন ১০০ টাকা। ইজারাদার আর সকালের নাস্তা ৫০টাকায় হয়নি। পানের শ্রমিকের ৭৫০ টাকা মজুরী কিভাবে পরিশোধ করবে? পানের টাকা কই? এরা করোনায় মরবেনা এটা সবাই নিশ্চিত থাকুন। অক্সিজেনের অভাবে মরবে গরীব পানচাষী গুলো। অথবা নিশ্চিত আত্মহত্যায়।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পান উৎপাদনে এখন বিশাল অংকের টাকা খরচ হয়। ২০ শতক জমিতে পানচাষে ৩ লাখ টাকার বেশি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু পান বিক্রি করে এক লাখ টাকাও পাওয়া যায়নি। এই হিসেবে লাভতো দূরের কথা উৎপাদন খরচে অর্ধেকও পায়নি চাষীরা।

এদিকে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় এরই মধ্যে বিলের বরজগুলোতে মড়ক শুরু হয়েছে। আর কয়েকদিনের মধ্যে সবগুলো বিলের বজর বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু চাষীদের ঘাড়ে থাকবে বিশাল লোকসানের বোঝা! চাষীদের মাঝে হাহাকার বিরাজ করছে। পান বিক্রি করে টাকা না পাওয়ায় অধিকাংশ চাষী পরিবার এখন বেশ আর্থিক সংকটে রয়েছে।

করোনার কারণে দাম কমলেও এত কমেনি। দালাল সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে এভাবে দাম আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ চাষীদের। সে ক্ষেত্রে সব বাজার একই দিনে বসাতে দালাল সিন্ডিকেট সুবিধা পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চাষীরা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •