সদ্য প্রয়াত হয়েছেন কক্সবাজারে কৃর্তিমান ব্যক্তি, সাবেক সংসদ সদস্য, হাইকোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবি, জাদরেল রাজনীতিবিদ ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এড. জহিরুল ইসলাম। পেশার কাতিরে একসময় তিনি একাই ঢাকা থাকতেন। তার স্ত্রী-সন্তানেরা থাকতেন কক্সবাজারে। তার মেঝো ছেলে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও দৈনন্দিন পত্রিকার সম্পাদক তখন বিএ পড়ছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন পড়ালেখায় বেশ অমনোযোগী। পড়ায় মনোযোগ ও জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করাসহ জীবনের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে এড. জহিরুল ইসলাম ছেলে রাশেদুল ইসলামকে লিখেছিলেন একটি অসাধারণ চিঠি। যাতে জীবন গঠনের শিক্ষণীয় অনেক কথা বলা আছে। এটি পড়লে সব তরুণ ও -যুবক জীবনের সুন্দর একটি শিক্ষা পাবেন। তাই এড. জহিরুল ইসলামের সেই চিঠিটি কক্সবাজার নিউজ-সিবিএন’র পাঠকদের জন্য হুবুহ তুলে ধরা হলো।

স্নেহের রাশেদ
সেগুন বাগিচা, ঢাকা
১১ জুন ১৯৯৩

আমার প্রাণঢালা স্নেহ ও শুভেচ্ছা নিও। কক্সবাজার হতে ঢাাকায় আসার পর হতেই তোমাকে চিঠি লেখার কথা ভাবছিলাম।এখন রাত সাড়ে বারোটা। শুয়ে পড়েছিলাম ঘুমানোর জন্য। উঠে আসলাম তোমাকে লিখব বলে। গত ২ জুন তোমার জন্ম দিবস ঈদের দিনেই পার হল। ৭২ হকে ৯৩ এর মাঝে ২১ টি বছর কেটে গেছে। আমি কিন্তু তোমার এই বয়সেই বিয়ে পাশ করে একটি ধ্বংসোন্মুখ পরিবারের হাল ধরেছিলাম।আমিও আমার পিতার মেঝ সন্তান ছিলাম। আমার বাবা ছিলেন অত্যন্ত উদার হৃদয়ের একজন বেহিসেবি মানুষ, একজন দরিদ্র উকিল মোহরার। আমি কিন্তু আমার বাবাকে বিএ পাশের পর একদিনও তার পেশায় কাজ করতে দেইনি। তোমরা সৌভাগ্যবান। তোমাদের পিতা দেশের হাইকোর্টের আইনজীবী, আইনজীবী সম্প্রদায়ের নেতা, বার কাউন্সিলের সদস্য। তোমাদের পিতা মোটামোটি ভাবে সারাদেশে পরিচিত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দারিদ্র্য কী তোমরা দেখনি। সে কারণে দরিদ্র মানুষের প্রতি যদি তোমাদের কোন মায়া না থাকে তাহলে আমি বিস্মিত হব না। তোমাদের তিন বোন। আমাদের ছয় বোন। অসংখ্য গরিব আত্মিয় স্বজন। এতসব কথা তোমাকে বলছি একারণে যে আমার স্থীর বিশ্বাস মানুষ নিজেই তার ভাগ্য-নির্মাতা। ১২/১৪ বছর থেকে ২৫/২৭ বছর বয়স পর্যন্ত মানুষ যেভাবে নিজেকে গড়ে তুলে সেভাবে সে তারই ফল পায়। না হয় পরিবর্তী জীবন তার কাছ হতে প্রতিশোধ নেয়। ২৫/২৭ বছর পার হলে শত চেষ্টা করলেও জীবনের মৌলিক পরিবর্তন সাধন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

“ অদৃষ্ট রে শুধালেম চীরদিন পিছে
অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কি মোরে ঠেলিছে?
সে কহিল,ফিরে দেখ, দেখিলাম থামি,
সম্মুখে ঠেলিছে মোরে, প্রশ্চাাতের আমি।’

স্কুলে থাকতে ভাবসম্প্রসারণ বিষয়ে উপরোক্ত চরণ কয়টি পড়েছিলাম এবং সত্য বলে জেনেছিলাম এবং আজো তা জানি। অদৃষ্ট বলে কোন কিছু নেই। যদি কিছু থেকেও থাকে তার শতকরা নব্বই ভাগ নির্ভর করে মানুষের ঐকান্তিক ইচ্ছা সাধনা ও শ্রমের উপর। তকদির সব সময় তদবিরের উপর ভর করে চলে। আমার ছেলে লেখাপড়া করে মানুষের মত মানুষ হবে,সুবুদ্ধি, স্বচ্ছ চিন্তা, উদার হৃদয়ের অধিকারী হয়ে দেশ সমাজ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করবে পিতা হিসেবে এই স্বপ্ন আমার ছিল এবং এখনো আছে। মানুষের মেধা প্রতিভার বিকাশ এবং সার্থক উন্নয়নের একমাত্র চাবিকাঠি শিক্ষা। শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। আগেই বলেছি শিক্ষার একটা বয়স আছে। সে বয়স তোমার পার হয়ে যায়নি। এখনও তোমার হাতে পাঁচ ছয় বছর সময় আছে। এই সময় কিন্তু অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পার হয়ে যাবে। এটাকে কাজে লাগাতে হলে এখনি স্থির সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ইস্পাত দৃঢ় অঙ্গিকার করতে হবে।

কলেজে থাকতে “ অগ্নি- সম্ভবা” নামের একটি বাংলা ছবি দেখেছিলাম। ঐ ছবির মূল কথা ছিল, সব মানুষই কিছু প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। সবার মাঝেই আগুন থাকে। সে আগুন, সে মেধার বিকাশ নির্ভর করে পরিবেশ ও সাধনার উপর। তোমার মাঝেও প্রতিভা আছে, অবশ্যই আগুন আছে। সে আগুনে নিজেকে এবং দুনিয়াকে সাধ্যমত আলোকিত করবে কিনা;না সে আগুন ছাই হয়ে নিভে যাবে- তা একান্ত রূপে নির্ভর করছে তোমার সিদ্ধান্তের উপর-তোমার কার্যকর পদক্ষেপের উপর।

তুমি জান আমি শারীরিক ভাবে অসুস্থ মানুষ। বয়সও এখন ৫৪ চলছে। তবুও আমার মনে বল আছে- অফুরন্ত বল। যে মনোবল নিয়ে আমি সংগ্রাম করে চলেছি জনগণের জন্য এবং নিজের জন্যও। এ বয়সেও বই খাতা নিয়ে ক্লাসে গিয়ে পড়তে আমার একটুও লজ্জা হবেনা একথা আমি হলফ করে বলতে পারি। মাঝেমাঝে আমারও ইচ্ছা করে কোথাও গিয়ে কিছুদিন ইংরেজি ক্লাস করতে।

লেখাপড়া না জানার গ্লানি সচেতন মানুষের জন্য কত নির্মম তা এখনো বুঝতে পারছ না। আর তারা মানুষই নয় যাদের কোন অনুভূতি নেই- তাদের কথা না বলাই ভালো। কতবড় মানুষ হলে, মানুষের কতটা কল্যাণে এলে এইসব কথা বাদ দিয়েও নিজের নূন্যতম কল্যাণেও নিজকে আসতে হলে অন্তত মৌলিক ডিগ্রীটির প্রয়োজন- বিএ ডিগ্রী। এটা নাহলে জীবনে পরিচয়ের সংকটে পড়তে হবে। যদিও বিএ ডিগ্রীটাও আজকের সমাজে কিছুই না। তবুও এই দিয়ে অন্তত লজ্জা ঢাকা যায়। আমি অনেক দিন ধরে লক্ষ করে আসছি যে বই পুস্তকের সাথে সত্যিকারার্থে তোমার কোন সম্পর্ক নাই। যদিও কলেজের খাতায় তোমার নাম আছে, যদিও তৃতীয় বর্ষ হতে চতুর্থ বর্ষে তুমি পাড়ি দিচ্ছ, তথাপি আসলে একটি ছাত্রের লেখাপড়া,ক্লাস-কলেজ,বইপত্রের সাথে যে প্রাত্যাহিক সম্পর্ক থাকার কথা,এসবের কিছুই তোমার ক্ষেত্রে নেই। তোমরা বড় হয়েছ। জানতে বুঝতে শিখেছ। তাই আমার ভূমিকা গৌণ হওয়াই স্বাভাবিক। ২১/২২ বছরের ছেলেকে কোন বাবা মা জোর করে লেখাপড়া করাতে পারে না- যদি সে নিজ হতে উদ্যোগী হয়ে লেখাপড়া না করে।

কক্সবাজার বিমানবন্দরে তোমাকে বলেছিলাম বইপত্র নিয়ে ঢাকায় চলে আসার জন্য। আগামী বছর মে- জুন মাসে তোমার বিএ পরীক্ষা হবে। ঢাকার বাসায় আমি একা থাকি। জাবেদ- শাবানার এস এস সি পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত তোমার মার ঢাকায় আসা উচিত হবেনা। অর্থাৎ আরো প্রায় পুরা একটা বছর আমার নির্বাসিত জীবনের মেয়াদ। তুমি ঢাকায় থেকে প্রত্যেক বিষয়ে আলাদা আলাদা শিক্ষক বা ভার্সিটির ভালো ছাত্রের নিকট হতে প্রাইভেট পড়ে বিএ পরীক্ষার জন্য ভালো ভাবে প্রস্তুতি নিতে পার। হাতে যে সময় আছে একাগ্রতা নিয়ে অধ্যয়ন করলে এই সময়ে শুধু পাশ কেন ভালো ডিভিশন পাওয়ার প্রস্তুতি নেয়া চলে। একই সাথে আমার দুঃসহ একাকীত্বেরও কিছুটা লাঘব হয়।

অনেক কথা লিখলাম। আমার কথা গুলো হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করলে- বিবেচনা করলে আমি খুশি হব। শুধু আমার একাকীত্বের কথা বিবেচনা করে তোমার ঢাকায় আসার কোন প্রয়োজন নাই। ঢাকায় আসার প্রথম শর্ত তোমার লেখাপড়া। দ্বিতীয় শর্ত আমার একাকীত্ব দূর করার চেষ্টা। প্রথম শর্ত পূরণ করতে না পারলে দ্বিতীয় শর্ত অপূর্ণই থাক। আমি সারাজীবন পরিশ্রম করে এসেছি- কষ্ট আমার গা সওয়া হয়ে গেছে। কাজেই এইটুকু কষ্টও আমি অবলীলায় সয়ে যেতে পারব। যদি তুমি মনে কর কক্সবাজারেই তুমি বিএ পরীক্ষার ভাল প্রস্তুতি নিতে পারবে, তবে তাই কর। আমি চাই তুমি মনোযোগ সহকারে লেখাপড়া কর।

তোমাদের সকলের কল্যাণ কামনা করছি।
ইতি:-
জ, ইসলাম।

এই চিঠিতি ফেসবুকে পোস্ট করে রাশেদুল ইসলাম লিখেছেন-
২৭ বছর আগে লেখাপড়ায় অমনোযোগী এক পুত্রের প্রতি পিতার অসামান্য চিঠি। জানি আপনার স্বপ্নের সমান হতে পারিনি। পারিনি আপনার মেধা ও প্রজ্ঞাকে ধারণ করতে। তবুও রক্তের ধারায় প্রবাহিত সততা ও সাহসকে সম্বল করে চেষ্টা করে চলেছি দেশ ও মানুষের পাশে থাকতে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •