সিবিএন ডেস্ক:
কর্মীদের মধ্যে করোনা আতঙ্কের মধ্যেই আগামীকাল রবিবার (৩১ মে) থেকে পুরোদমে চালু হচ্ছে ব্যাংকিং কার্যক্রম। তবে গ্রাহকরা শাখাগুলো থেকে আগের মতো সেবা পাবেন না। কারণ, ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার জন্য আগের চেয়ে অর্ধেক কর্মীকে দেখা যাবে। বাকি অর্ধেক কর্মী বাসায় থেকে অফিস করবেন। সেভাবেই ব্যাংকগুলোকে প্রস্তুত করা হয়েছে। ব্যাংকের এমডিরা বলছেন, আগে ব্যাংকের কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যেক কর্মীর মধ্যে সামাজিক দূরত্ব মানার বিষয়টি বড় করে দেখা হচ্ছে। এ কারণে আগের চেয়ে অর্ধেক কর্মীর বসার স্থান ঠিক করে সেভাবেই প্রস্তত করা হচ্ছে প্রধান কার্যালয়সহ সব শাখা।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের (এমডি) সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, করোনার এই পরিস্থিতিতে প্রত্যেক কর্মীর মধ্যে সামাজিক দূরত্ব মানার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। এছাড়া অসুস্থরাও ব্যাংকে আসবেন না, বয়স্করা ও সন্তান সম্ভাবা নারীরাও আসবেন না। ফলে আগে যেখানে ১০০ জন কর্মী সরাসরি কাজ করতো, এখন সেখানে ৫০ জন কাজ করতে পারবে। বাকি ৫০ জনকে বাসায় থেকেই কাজ করতে হবে। ফলে আগের মতো গ্রাহকদেরকে সেবা দেওয়াও সম্ভব হবে না।

তিনি উল্লেখ করেন, লেনদেনের ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা হলেও গ্রাহকরা বিষয়টি বুঝবেন আশা করছি।

তিনি বলেন, ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে কে কে কোন সপ্তাহে বাসায় থেকে কাজ করবে, আর কে কে সরাসরি অফিসে গিয়ে কাজ করবে প্রত্যেক ব্যাংক তার কর্মীদের তালিকা করে (এ টিম, বি টিম, সি টিম নামে) একটি রোস্টার করে কর্মীদের দায়িত্ব বণ্টন করে দিচ্ছে। এছাড়া অনেক কাজ আছে, যেগুলো করার জন্য এখন অফিসে আসার দরকার হবে না। তারা বাসায় বসেই সেই কাজ করবেন। তাদের অফিসে আসার দরকার নেই।

সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে থার্মাল স্ক্যানারের সাহায্যে একজন কর্মীর তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে। সাম্প্রতিক ছবি। (ছবি: ফোকাস বাংলা)

নাম প্রকাশ না করে একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) বলেন, পুরোদমে চালু হতে আমাদের আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পুরোপুরো ব্যাংকিং করা সম্ভব নয়। অফিসের ডেকোরেশন বদলাতে হবে। এখন ভাগ করে কর্মীদেরকে অফিসে আসতে হবে। তবে গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার জন্য সব ব্যাংকই নানা ধরনের নতুন নতুন প্রোডাক্ট চালু করবে। গ্রাহকরা যাতে বাসা থেকে সেবা পেতে পারেন, সেই ধরনের নতুন নতুন সেবা যুক্ত হবে।

এদিকে নিয়মিত অফিসে আসতে হবে এমন ব্যাংক কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করে উদ্বিগ্ন হয়ে বলেছেন, করোনার প্রকোপ বাড়ার মধ্যে তাদেরকে অফিসে আসতে হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে খোদ ব্যাংকিং খাত। এরইমধ্যে সারাদেশে শতাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আর অন্তত ৬ জন ব্যাংক কর্মকর্তা এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামীকাল রবিবার থেকে সব ব্যাংকে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে লেনদেন। তবে করোনাভাইরাসের কারণে মাঝারি ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লেনদেন হবে সকাল ১০টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত। ব্যাংকের সব শাখা খোলা হবে এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে গত বৃহস্পতিবার একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে দুই মাস পর পূর্ণাঙ্গরূপে ফিরতে যাচ্ছে দেশের ব্যাংক খাত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, গণপরিবহন চলাচল সীমিত থাকায় প্রয়োজনে ব্যাংকগুলোকে কর্মীদের যাতায়াতে পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। আর ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি, কর্মকর্তা, সন্তানসম্ভবা গ্রাহক ও কর্মকর্তাকে ব্যাংকে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও বলেছে, সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দর (পোর্ট ও কাস্টমস) এলাকায় ব্যাংকের শাখা ও বুথ স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখতে হবে।

উল্লেখ্য, সরকারি ছুটি শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সীমিত আকারে ব্যাংক সেবা চালু রাখার নির্দেশ দেয়। তবে তা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। করোনার মধ্যে কর্মকর্তাদের অফিসে যেতে উৎসাহ বাড়াতে চালু করা হয় বিশেষ ভাতা ও বিমা সুবিধা। এখন অবশ্য সেই সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

একটি বেসরকারি ব্যাংকে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে গ্রাহকদের প্রবেশ করানো হচ্ছে। (সাম্প্রতিক ছবি: ফোকাস বাংলা থেকে)

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্যাংক খোলার আগে মহামারি প্রতিরোধকারী সামগ্রী যেমন—মাস্ক, জীবাণুমুক্তকরণ সামগ্রী ইত্যাদি সংগ্রহ করতে হবে। আপৎকালীন পরিকল্পনা তৈরির পাশাপাশি সংক্রমিত বস্তুর ডিসপোজাল এলাকা স্থাপন করতে হবে। সব ইউনিটের জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কর্মীদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিদিন কর্মীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক অবস্থা নথিভুক্ত করে যারা অসুস্থতা অনুভব করবে, তাদের সঠিক সময়ে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া, ব্যাংকের প্রবেশমুখে তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণকারী যন্ত্র স্থাপন করতে হবে বা তাপমাত্রা পরিমাপের ব্যবস্থা রাখতে হবে। শুধুমাত্র স্বাভাবিক তাপমাত্রা সম্পন্ন ব্যক্তিদেরই ঢুকতে দিতে হবে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, বায়ু চলাচল বাড়াতে হবে। সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করার ক্ষেত্রে এয়ার কন্ডিশনারের স্বাভাবিক ক্রিয়াকে নিশ্চিত করতে হবে। বিশুদ্ধ বাতাস বৃদ্ধি করার পাশাপাশি এয়ার সিস্টেমে ফিরে আসা বাতাসকে বন্ধ রাখতে হবে। সর্বসাধারণের ব্যবহার্য সুবিধাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে (যেমন কিউইং মেশিন, কাউন্টার, চিফার মেশিন, রোলার পেন, ক্যাশ কাউন্টার, এটিএম, জনসাধারণের বসার জায়গা ইত্যাদি)।

নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, জনসাধারণের চলাচলের এলাকা যেমন—ব্যাংকের লবি, এলিভেটর এবং তথ্যকেন্দ্র পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং ময়লা সময়মতো পরিষ্কার করতে হবে। এছাড়া, এটিএমে প্রবেশ করার লাইনে দাঁড়ানোর বা ব্যবহারের সময় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য লাইনে এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখার (লাইনে এক মিটার দূরত্ব অন্তর অপেক্ষা করা) ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে।

ব্যবসায়িক কাজে ব্যাংকে আসা মানুষের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রতিদিনের ব্যবসায়িক কাজের জন্য ই-ব্যাংকিং অথবা এটিএম ব্যবহারের পরামর্শ দিতে হবে। কাউন্টারে জীবাণুনাশকের ব্যবস্থার পাশাপাশি সবাইকে হাত পরিষ্কার করার ব্যাপারে সচেতন করতে হবে।

এতে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকের স্টাফদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা জোরদার করতে হবে এবং মাস্ক পরতে হবে। হাতের হাইজিনের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে এবং হাঁচি দেওয়ার সময় মুখ এবং নাক টিস্যু বা কনুই দিয়ে ঢাকতে হবে। ব্যাংকে আগত সবার মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পোস্টার এবং বুলেটিন বোর্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্য জ্ঞান পরিবেশন জোরদার করতে হবে। যদি নিশ্চিত কোভিড-১৯ রোগী থাকে, তবে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসারে জীবাণুমুক্তকরণ করতে হবে এবং একইসঙ্গে এয়ার কন্ডিশনিং ও ভেন্টিলেশন সিস্টেমকে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে। মূল্যায়ন হওয়ার আগে পুনরায় তা চালু করা উচিত হবে না। মাঝারি ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়, ব্যাংকগুলোকে তাদের বিজনেস আওয়ার সংক্ষিপ্ত করতে এবং আগত লোকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •