মোহাম্মদ তালুত


জনগণের সত্যিকারের সেবা করতে চাইলে মনে থাকা চাই সমানুভূতি বা empathy অর্থাৎ আরেকজনের অবস্থানে দাঁড়িয়ে তার সমস্যাটা নিজের সমস্যা মনে করে অনুধাবন করা এবং তা সমাধানে সচেষ্ট হওয়া। এই ব্যাপারটা ষোলআনা আছে আমার ব্যাচমেইট শামীম আরা নিপার মাঝে। দারুন বুদ্ধিমান এবং হৃদয়বান মানুষটা সারাক্ষণই চিন্তা করে কিভাবে মানুষকে আরও ভালভাবে সেবা দেওয়া যায়। এখন পোস্টেড আছে টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে। নিভৃতে থাকা পছন্দ করলেও ও ইতোমধ্যেই বেশ কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে দেশজুড়ে সুনাম কুড়িয়েছে। ও কয়েক দিন আগে জানাল, হাসাপাতালের পৃথক করোনা ইউনিটগুলোতে রোগী ও ডাক্তার উভয়ই এখন বেশ ক্রিটিক্যাল সময় পার করছে। রোগীদের অভিযোগ ডাক্তাররা নিয়মিত রাউন্ডে আসেন না আসলেও খুব কম সময়ের জন্য দূর থেকে কথা বলে চলে যায়, আবার একইভাবে ডাক্তারদের মধ্যেও পিপিই এর মান নিয়ে শঙ্কা রয়েছে কারণ জীবাণু থেকে নিরাপত্তা বিধান বেশ কঠিন,আবার লম্বা সময় পিপিই পরে থাকাও বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার।কিন্তু রোগীদের এসময় ডাক্তারদের সাহচর্য খুব দরকার। তাঁদের উপস্থিতি রোগীর মনে সাহস যোগায়। সাহসের উপর ভর দিয়েও অনেক রোগী দ্রুত আরোগ্য লাভ করতে পারেন। একটি ব্যয়বহুল পিপিই একদিনের বেশি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। প্রকোপ কমে গেলেও করোনা খুব দ্রুত নির্মূল হবার লক্ষণ নেই। পরেও আসতে পারে আরও নতুন ছোঁয়াচে মহামারী। আলোচনার এক ফাঁকে ও বলল, করোনা ইউনিটে ঘনঘন ডাক্তার যেন প্রবেশ করে রোগীদের খবরাখবর নিতে পারেন সেজন্য স্যাম্পল কালেকশন কিওস্কের এর আদলে একটি ছোট মোবাইল কার্ট/ভেহিকল এর ডিজাইন স্কেচ করে হেল্প করতে পারব কিনা? আমি একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলাম। ছোটখাটো গাড়ি অনেক আছে কিন্তু এমন কোন গাড়ি ডেডিকেটেড হাসপাতালের জন্য কোথাও পেলাম না। এইটা নিয়ে একটু ভাবছিলাম। অনেকটা শপরাইডার বা ইলেক্ট্রিক মোবিলিটির মত কোন কার্টের জানালার গ্লাস কেটে দুইটা গ্লাভস (কিওস্কে যেমন থাকে) আটকে দিয়ে এটা নিয়ে করোনা ইউনিটে মুভ করলে কেমন হতে পারে? স্টেথেস্কোপের জন্য একটা ছিদ্র থাকতে পারে গ্লাসে। ছিদ্রগুলো রাবার সিল করে দেওয়া হবে। রোগী দেখে কার্টটি করোনা ইউনিট থেকে বের হলেই ব্লিচিং সলিউশনে শাওয়ার দেওয়া হবে। আরও ব্রেইনস্টর্মিং করে একটা ছোট কার্টের কথা ভাবলাম যেটা দরজা দিয়ে ঢুকবে, শব্দহীন অর্থাৎ ব্যাটারিচালিত হবে, আর উপরের কেবিনটি হবে যতটা সম্ভব এয়ারটাইট যেন জীবাণু ঢুকতে না পারে। কিছু স্কেচ করে ওকে আইডিয়াটা বুঝিয়ে দিলাম। তাজ্জব ব্যাপার! মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ও চমৎকার একটা গাড়ি তৈরি করিয়ে ফেলল টাঙ্গাইলের মো: আল-আমিন নামের এক উদ্যমী তরুণ ও তার টিমের সহায়তায়। টাঙ্গাইলের ওয়ার্কশপে এই কার্টটি এত চমৎকারভাবে তৈরি করা এক বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে, এই কাজে আল আমীনের আন্তরিক ভূমিকা আসলেই প্রশংসার দাবিদার। মূল ডিজাইন থেকে কিছু পরিবর্তন আছে তবে পরবর্তী ভার্শনগুলোতে মডিফিকেশন করা হবে। পরের গাড়িগুলোতে দুইপাশেই স্বচ্ছ পিভিসি শীট লাগানো হবে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত। আমি এখন ইংল্যান্ডে। এতদূর থেকে ভালভাবে পরামর্শ দেওয়া মুশকিল। তবুও যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছি। ব্যাটারিচালিত গাড়িটির দরজা এয়ারটাইট এবং ব্রেকের ব্যবস্থা আছে। ডিজাইনের সময় ভাবলাম, কেবিনটা ভালোভাবে সীল করাই (Sealing) সবচেয়ে বড় কনসার্ন। পিপিইর বদলে এইটা ইউজ করা মানে হল এইটাকে পিপিইর সমান সেইফটি ডেলিভারি দিতে হবে। তাই রাবার সীলের সাথে বিশ্বখ্যাত Buna N Gasket Material ইউজ করে দরজা সীল করে কেবিন এয়ার টাইট করা হয়েছে। মেঝে থেকে ছাদ সর্বত্র ছিদ্র বন্ধ করা হয়েছে। এতকিছুর পরও কিছু লিক থাকতে পারে, তবে সেটা মাস্ক, কিওস্ক, পিপিইসহ প্রায় সব প্রতিরোধী ব্যবস্থাতেই আছে। সংক্রমণের সম্ভবনা ন্যূনতমে নামিয়ে আনাই আসল লক্ষ্য। ভিতরে আরও আছে বরফ কুল্ড এয়ার কুলার আর একটা ছোট অক্সিজেন ক্যানিস্টার; যদিও আধা ঘণ্টায় কোন সাফোকেশনের লক্ষণ মেলেনি। আইডিয়েশনের উদ্ভব হয়েছিল আগে। এখন ব্যবহার করা হচ্ছে টাঙ্গাইলের একটি উপজেলার হাসপাতালে। ডাক্তাররা রীতিমত ইম্প্রেসড। অবশ্য আইডিয়েশনের সময় থেকেইনিপার স্পাউজ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা: মো: শাহ আলম ভাই ও তার সাথে বেশকিছু শ্রদ্ধেয় ডাক্তার মিলে মেডিকেল ও ডাক্তারদের নিরাপত্তার পারস্পেক্টিভ গুলো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছেন। তেমন কোন অভিযোগ মেলেনি এখনও। করোনা ইউনিটে পারতঃপক্ষে কেউ যেতেই চাইতেন না। এখন যাচ্ছেন। গ্লাভসে হাত বের করে কাজও করা যাচ্ছে। আকারে সরু হওয়ায় সব জায়গায় চলাচল করতে পারছে অনায়াসে। খরচ পড়ল প্রায় দেড় লাখ টাকা। সম্পূর্ণ দেশে তৈরি, এই গাড়ি সব জেলা শহরের ওয়ার্কশপগুলোতেই নির্মাণ সম্ভব। মুগদা হাসপাতালে ডেমো হবে ঈদের পর। যেকোন আকারের সবরকমের মানুষই অনায়াসে এঁটে যাচ্ছেন। স্কেল আপও শুরু হচ্ছে শিগগিরই। এর পর থেকে আরও উন্নত, আরও নিরাপদ, আরও ইউজার ফ্রেন্ডলি করা হবে ডিজাইনটি। এই অনন্যসাধারণ উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের জন্য নিপাকে প্রাণঢালা অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা। আমি দেখেছি কোন উদ্ভাবনী আইডিয়া চিন্তা করার চেয়ে তা বাস্তবায়ন শতগুণ বেশি কঠিন। আমাদের নিপা সেটা করে দেখিয়েছে। ওর মহানুভবতা ও প্রচেষ্টা অনুকরণীয়। প্রশাসন সার্ভিসে থেকেও যে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার কথা ও এভাবে ভেবেছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। মানুষটা অনেক দূর যাবে আমি নিশ্চিত, তার এই যাত্রা যতটা সম্ভব নির্বিঘ্ন হোক, এই কামনা করি। স্বদেশ থেকে এত দূরে থেকে করোনাময় এই ক্রান্তিকালে দেশের জন্য কিছু করার জন্য মনটা আনচান করত। হঠাৎ সেই সুযোগ করে দিয়েছে সে। দেশের এই ক্রান্তিকালে এত দূরে থেকে নিপার এই দারুন উদ্ভাবনী আইডিয়া বাস্তবায়নে আমার সামান্য অবদানও যদি থেকে থাকে, আমি ভীষণ আনন্দিত।


লেখক : বাংলাদেশ সরকারের একজন সিনিয়র সেক্রেটারি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •