মুহাম্মদ সেলিম হক


দেশের স্বনামখ্যাত এস আলম গ্রুপের পরিচালক মোরশেদুল আলমের করুণ মৃত্যুতে সবদিকে চলছে হাহাকার। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন কী কঠিন মহামারী করোনা; এস আলম গ্রুপের পরিচালকের জীবন কেড়ে নিলেন। চিকিৎসা নিয়েও নানা জল্পনা।ওদের মতো দেশসেরা শিল্পপতিরাও অসহায় করোনা থাবায়! সেখানে সাধারণ মানুষ তো মামুলি ব্যাপার।

এমনকি দেশের এই সেরা শিল্পজাত গ্রুপে পরিবারের সদস্যরা এরকম চিকিৎসার কবলে পড়বে কেউ ভাবতে ও পারেনি। কি করুণ দৃশ্য! ছোট ভাই জায়গা ছেড়ে দিলো বড় ভাইকে। বাঁচানোর আকুতি! কি শিক্ষনীয় আর কঠোর বাস্তবতা। আইসিইউতে জায়গা নেই। টাকার কমতি নেই, কিন্তু বেঁচে থাকার একটু শ্বাসের দরকার। দেশের সব বিমান ভাড়া করে আমেরিকা যাওয়ার ক্ষমতা ছিলো। নিয়তির করুণ ফয়সালা কিন্তু সব পথ অবরুদ্ধ।

তাঁহার মৃত্যুতে একেবারে হৃদয় নাড়া দিল। সাথে মানবতার একটা নজিরও রাখলো, তাদের যে ক্ষমতা ছিলো, ইচ্ছা করলে অন্য রোগীকে আইসিইউ থেকে সরিয়ে দিতে পারতো। সেটা করেন নি। অন্যের জীবনকে তুচ্ছ করেননি । এটা মানবতার বড় বিজয়। যেখানে করোনার হার। সেখানে মানবতার নজির সৃষ্টি করে গেছেন। আল্লাহ যেনো বেহেশত নসিব করেন। এস আলম সব সময় পরিবার মানবিক পরিবার। মানুষের পাশেই তাদের যত অবদান। নিজেদের জীবনের শেষ কঠিন মূহূর্তেও দৃঢ়তায় মানুষের প্রতি ছিলো অগাধ ভালোবাসা।

সর্বশেষ খবর পাওয়া যায়, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মা চেমন আরা বেগম এবং ছেলে ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসানুল আলম মারুফ কে রিপোর্ট আসার আগেই শনিবার (২৩ মে) দুপুরেই আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, ঢাকার গুলশানে সাইফুল আলম মাসুদের নিজস্ব বাসভবনে তাঁরা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অবস্থান করছেন বর্তমানে। এদিকে, করোনায় আক্রান্ত হওয়া এস আলম পরিবারের অন্য চার সদস্যকেও ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। রোববার তাদেরও ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে।

বলতেছিলাম, ২০১৬ সালে ভারত থেকে আমার মাকে নিয়ে চিকিৎসা করার পর দেশে এসে একটা পোস্ট করলাম, মাসুদ সাহেবকে কেন্দ্র করে। সেটা ছিলো হুবহু এ রকম।“এস আলম গ্রুপের উচিত একটা আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল গড়া।’ পোস্টটি করার সপ্তাহখানিক পর এস আলম ভবনে যাই একটা কাজে। মাসুদ সাহেবকে বললাম, ভাই আপনি একটা হাসপাতাল করেন ভারতের চেন্নাই এ্যাপোলোর মতো। তাঁরা আমাদের থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। তাঁহাকে পোস্টটা দেখলাম। কত লোক এটাতে লাইক দিলো। তখন তিনি বলেছিলেন, আমি ভাবছি একটা করবো পটিয়ার দিকে। জায়গা খুজঁছি। এটা কেবল ব্যবসা হবে না, সেবাও হবে। আপনি বটগাছ। এটা আপনি ছাড়া কেউ পারবে না। আপনার তকদিরে অনেক কিছু ফেভার করে। তিনি হালকা হাসি দিয়ে কথা শুনলেন। করার ইচ্ছাটা পুনরায় জানিয়েছিলেন।

ভারতের চেন্নাই আর বেঙ্গলুরে দু’টা হাসপাতাল কিন্তু শহরের অখ্যাত জায়গায়। ভালো চিকিৎসার কারণে মানুষ ছুটছে। আজ আফসোস লাগছে, যদি এদের নিজস্ব বিশ্বমানের হাসপাতাল থাকতো তাহলে মোরশেদুল আলম আইসিইউ এর অভাবে মারা যেতো? হয়তো যেতো হায়াত না থাকলে। একটা শান্তনা তো পেত পরিবার। চিকিৎসার ঘাটতি ছিলো না। পরিবারের প্রথম মৃত্যু। আর বাকিরাও আজ করোনায় লড়াইছে। কি কঠিন সময় এদের।

হয়তো একজন সাধারণ মানুষ পড়লে এত হইচই হতো না। অনেক সময় ভালো মানুষের মৃত্যু দিয়ে অনেক মানুষকে বাঁচিয়ে দেয়। সবাই নড়েচড়ে বসে । ভাবতে শুরু করে। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, আমরা কতটা অবহেলা করেছি দেশে চিকিৎসাকে। যেমন-একটা উদাহরণ টানতে পারি, হয়তো বেমানান হবে। উদাহরণটা কেউ ভিন্ন ভাবে নিবেন না।

বিশ্বকাপ ফুটবলে পৃথিবী জুড়ে মানুষের আবেগ থাকে। অনেক সময় ছোট দল কোন কারণে রেফারির ভুলে গোল হজম করে বিদায় নিলেও ফুটবল সংস্থা ফিফা তেমন আমলে নেয় না, অভিযোগও নেয় না।

২০০৬ সালে বিশ্বকাপে কোয়াটার ফাইনাল জার্মান ও ইংল্যান্ডের খেলায় ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড এর একটি শর্ট গোল পোস্টের মধ্যবারে লেগে ফেরত আসে। রিপ্লে পরিষ্কার দেখা গেল গোল লাইন অতিক্রম করেছে বলছি। ছিলো গোল। রেফারি দেইনি। এ খেলায় ইংল্যান্ড হারল। যেহেতু ইংলিশ মিডিয়া শক্তিশালি ছিলো সেহেতু পরের দিন হইচই পুরো পৃথিবীতে ফিফাকে নাস্তাবুদ করলো। সবাই ভাবলো ফিফা এবার নড়বে। শেষমেষ ফুটবলের নতুন আইন হলো ক্রিকেট এর মতো রিপ্লে থায়ার্ড রেফারি থাকলো। বড় দলের বিপদে পড়াতে বাঁচালো ছোটরা।

করোনাকাল আবারো সে ঘটনা মনে করিয়ে দিল। আবারো অনুরোধ উদাহরণটি কেউ সিরিয়াসলি নেবেন না।

বলতে পারি পরিচালক মোরশেদুল আলম একজন অমায়িক মানুষ ছিলো। এ পরিবারটা এ রকম। এদের সাথে কথা বলেও বুঝা যায় না, হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। হৃদয় বড়। ব্যবহারে অন্যান্য উচ্চতায় মুগ্ধতা করেছে এরা সবাইকে। দানে তাদের খ্যাতির সীমানা নেই। ব্যাপকতায় ভরপুর। সরবের চেয়ে নীরবে দান করা মাসুদ সাহেব বেশি পছন্দ করেন। হয়তো আল্লাহ এদের পরীক্ষা করছে ধৈর্যের। এত বড় বিপর্যয়ে এরা কখনও পড়েনি।

এদের থেকে অন্যান্য ধনীদেরও ভাবা উচিত। টাকা থাকলেও হবে না। দেশে কিছু করতে হবে। আর বিদেশ চিকিৎসা জন্য নয়। বিদেশের হাসপাতাল দেশে গড়তে হবে। রোগ শোক সব তো আল্লাহর পরীক্ষা। রোগে ধনি গরিবের ব্যবধান থাকে না। আজ বিশ্বময় করোনা থাবায় গরিবেরাও অসহায়, তারচেয়েও বড় অসহায় ধনীরা। টাকা আছে, চাইলে সিঙ্গাপুর আর আমেরিকা যাওয়ারও সুযোগ নেই। যেখানে আমেরিকা নয়, বিশ্বের ২০৭টি দেশ করোনায় তুনোধুনো। অবাক বিশ্ব। এখনো সময় আছে, সবাই মিলে উদ্যোগ নিই, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আগামীর জন্য কি করবেন। একটু চিন্তা করা যায় কিনা। যে মানব সমাজে বসবাস করি। সে সমাজের মানুষের জন্য কিছু করা উচিত কিনা।

প্রসঙ্গত, যারা সরকারের সমালোচনা করেছেন কিছুদিন আগে ভিআইপিদের জন্য আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থা করেছে সেটা কোথায়? যদি এ রকম থেকে থাকে, তাহলে মোরশেদুল আলম এর করুণ মৃত্যু কেন? চিলে কান নিয়ে গেছে আর এ কথা শুনে সমানে সমালোচনায় সরকারকে ডুবাতে চেষ্টা ছাড়া আর কিছু ছিল না তাহলে। সেটা স্পষ্ট আজ।
বিবেকবান হোন, মানবিক হোন, মানুষ বসবাসের পৃথিবীতে এটাই কাম্য।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট, চট্টগ্রাম।

নোট: মতামতের জন্য লেখক দায়ি, সম্পাদক নয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •