সালাহ্ উদ্দিন জাসেদ

করোনার এই অকালের দিনে এবার এসেছে এক ‘নিরানন্দ’ ঈদ। নিরানন্দ ঈদ হলেও সন্ধ্যার আবছায়ায় আকাশে বাঁকা চাঁদ হাসবে ঠিকই, কিন্তু সেই হাসি কি ছড়িয়ে পড়বে ঘরে ঘরে? এবারও রমজানের রোজার শেষে ঈদ আসছে, তবে খুশির ডালা সাজিয়ে নয়, আসছে আনন্দ-আশঙ্কা-অনিশ্চয়তার অবিমিশ্রিত বার্তা নিয়ে।

বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, খরার বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে বাঙালি আরও কত ঈদ কাটিয়েছে! কিন্তু এবারের লড়াইটা অন্যরকম। কঠিন ও অভূতপূর্ব। করোনার আঘাতে কোটি মানুষ কর্মহীন। অগণিত মানুষ লড়ছে দুই বেলার আহার জোগাড়ে। ঈদ নিয়ে ভাবার সুযোগ তাদের কোথায়!

চাঁদের নিয়মে পরশু হবে ঈদের দিন। কিন্তু করোনাকালে ঈদ কতটা উদযাপিত হবে, গত দুই মাস ঘরবন্দি থাকার পর কতজনের সেই সামর্থ্য অবশিষ্ট আছে, তা সম্ভবত অনুমান করাও কঠিন।

১৯৮৮ সালের ভয়াল বন্যায় কাটে পরপর দুটি ঈদ। ১৯৯৮ সালের বানের তাণ্ডবের পরপরই এসেছিল রমজানের ঈদ। জনপদের পর জনপদ ছিল বিধ্বস্ত। তবুও সেবার কমবেশি ঈদ উদযাপিত হয়েছিল। করোনাকালে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাত এবারের ঈদকে আরও ‘দূরের উৎসবে’ পরিণত করেছে। উপকূল এখনও লণ্ডভণ্ড। কৃষকের ক্ষতি বিস্তর।

তারপরও ঈদের অনেক কিছুই চলবে চিরাচরিত ধারা মেনে। মানুষ একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাবেন।

নিরানন্দ ঈদের সবচেয়ে বড় প্রমাণ ফুটপাতের দোকানগুলোতে প্রায় ক্রেতাশূন্যতা। গরিবের মধ্যেও গরিব যে, সেও ঈদে অন্তত একটা জামা কেনে। শর্ত সাপেক্ষে গত ১০ মে থেকে খুলেছে কিছু কিছু শপিংমল ও বিপণিবিতান। বড় শপিংমলে কমবেশি ভিড় থাকলেও নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের কেনাকাটার জায়গা হিসেবে পরিচিত অধিকাংশ মার্কেট খোলেনি। ফুটপাতের দোকান খাঁ খাঁ করছে। বিক্রেতারা বলছেন, কাজ নেই, রোজগার নেই, গরিব কী করে নতুন পোশাক কিনবে?

ঈদের শুরুটা হয় ঈদগাহে সবাই মিলে নামাজ পড়তে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। করোনার কারণে স্মরণকালে এই প্রথম ঈদের জামাত হবে না ঈদগাহে। মসজিদে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জামাত করার পরামর্শ দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।

বাঙালির কাছে ঈদ শুধু আনন্দের নয়, সব ভেদাভেদ ভুলে পরম শত্রুকেও বুকে টেনে নেওয়ার দিন। কিন্তু করোনার সংকটে এখানেও বাধা রয়েছে। ঈদ জামাতের পর কোলাকুলি করা যাবে না, হাত মেলানো যাবে না। ঈদের আগের কয়েকদিনে কোটি মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যান পরিবারের সঙ্গে আনন্দ উদযাপনে। গোটা দুনিয়ায় যা বাংলাদেশের ‘ঈদযাত্রা’ নামে পরিচিত পেয়েছে। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে অপরিসীম দুর্ভোগ সয়ে প্রিয়জনের কাছে ফেরার যে আনন্দ, তা দুনিয়ায় আর কোনো জাতি জানে! কিন্তু এবার ঈদযাত্রার আনন্দময় দুর্ভোগ সহ্য করতে হচ্ছে না। করোনার বিস্তার রোধে গত ২৫ মার্চ থেকে সব গণপরিবহন বন্ধ। নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ঈদযাত্রাও। তবে শেষ পর্যন্ত গতকাল শুক্রবার মধ্যরাত থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে গ্রামে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তারপরও বেশিরভাগ মানুষ যাচ্ছেন না করোনা থেকে রেহাই পেতে। আবার কেউ যাচ্ছেন না বেতন-ভাতা পাননি বলে।

প্রতিবছর ঈদে সরকারি ভবন, সড়ক সাজানো হয় রঙিন বাতি ও পতাকায়। বহু বছর পর এবারই প্রথম নেই কোনো সাজসজ্জা। প্রতিবছর ঈদে নতুন করে সাজে চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক, বিনোদন কেন্দ্র। লাখো মানুষের ভিড় হয়। এবার করোনা ঠেকাতে সব বন্ধ। তবে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র, হাসপাতাল, কারাগারে উন্নতমানের খাবার দেওয়া হবে।

যত কঠিন সময়ই কাটুক, ঈদ বলে কথা। আয়োজন না থাক, মন কিন্তু ঠিক গাইবে ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানি তাগিদ।’ করোনা সংকটে ধুঁকতে থাকা গরিব-দুঃখীর জন্য নিজেকে বিলানোর প্রকৃত সময় এই ঈদ। তবেই সামনের ঈদগুলো সবাই মিলে হবে অনেক অনেক বেশি খুশির।

 

যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •