মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

উখিয়া UNHCR এর অর্থায়নে নির্মিত ১৪৪ বেডের করোনা আইসোলেশন হাসপাতালটি (সিভিয়ার একিউট রেস্পিরেটরী ইনফেকশন-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার) চলমান করোনা সংকটে অতি প্রয়োজনের সময় নির্মাণ করা হয়েছে। এই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা সেবায় এক মাইলফলক হয়ে থাকবে। যা কক্সবাজারবাসীর জন্য একটা বিশাল সম্পদ।

২১মে বৃহস্পতিবার সকালে এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটির উদ্বোধনকালে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন। জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন দ্রুততম সময়ে আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে UNHCR কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে UNHCR এর সিনিয়র অপারেশন ম্যানেজার হিনাকো টোকি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি নির্মাণে জমি প্রদান এবং সব ধরণের সহযোগিতা করায় দ্রুত এটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। এজন্য তিনি জেলা প্রশাসনের নিকট কৃতজ্ঞতা জানান। হিনাকো টোকি আরো বলেন, আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি নির্মাণের ফলে রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পের ভিতরে-বাইরে থাকা করোনা রোগীদের আইসোলেশন এনে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার সুযোগ হয়েছে। ফলে রোগীর পরিবার ও সংশ্লিষ্ট এলাকা করোনা সংক্রমণ থেকে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিতে থাকবে। এ অর্জন সম্ভব হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার, UNHCR সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত আন্তরিক প্রচেষ্টা কারণে। UNHCR এর সিনিয়র অপারেশন ম্যানেজার হিনাকো টোকি আরো বলেন, UNHCR এর এটি একটি বৃহত্তর মানবিক প্রয়াসের অন্যতম অংশ। যা জনসাধারণের মেডিকেল চাহিদা মেটাতে অসাধারণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ক্যাম্পের অভ্যন্তরে সহ মোট ১২ টি পয়েন্টে ১৯০০ বেডে আধুনিক আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার নির্মাণ করা হবে। যে গুলোর নির্মাণকাজ আগামী একমাসের মধ্যে শতভাগ সম্পন্ন করা হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা শরনার্থীদের জন্য উখিয়াতে এই এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি গড়ে তোলায় জেলার অন্যান্য ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল গুলোর উপর চাপ একটু কমবে। কক্ষে জেলার কোভিড পজেটিভ রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া এখন আরো সহজ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

পরিপূর্ণ এই কোভিড হাসপাতালটি সামাজিক ও শারীরিক দুরত্ব বজায় রেখে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে আরআরআরসি অফিসের প্রতিনিধি মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ (উপসচিব), কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোহা. শাজাহান আলি, উখিয়ার ইউএনও মোঃ নিকারুজ্জামান, উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রঞ্জন বড়ুয়া, UNHCR এর উর্ধ্বতন কর্মকতা ইফতেখার উদ্দিন বায়েজিদ, UNHCR এর স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. তান্দ্রা, উখিয়া ওসি মর্জিনা আক্তার মর্জু, WHO এর প্রতিনিধি, রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল এর প্রতিনিধি, ব্র্যাক এর প্রতিনিধি সহ সংশ্লিষ্ট সকলে উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন সহ অন্যান্য অতিথিরা ফিতা কেটে এই এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটির আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন।

গত ৭এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি নির্মাণ কাজ ৪০ দিনে সম্পন্ন হয়েছে। জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাই কমিশন (UNHCR) এর অর্থায়নে এই বৃহৎ আকারের আধুনিক এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি নির্মিত হয়েছে। মূলতঃ ১৪৪ বেডের এই হাসপাতালে ২শো বেডের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ফ্যাসিলিটি রয়েছে।

হাসপাতাল নির্মাণ কাজের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত UNHCR এর উর্ধ্বতন কর্মকতা ইফতেখার উদ্দিন বায়েজিদ সিবিএন-কে জানিয়েছেন, গত ২০মে ১৫০ জনের মেডিকেল টিম কক্সবাজার এসে পৌঁছেছে। তাদেরকে এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটিতে তারা ২১-২৩ মে টানা তিন দিন রিহার্সাল ব্যবস্থাপনা কাজ করবেন।

এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটির ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল এর একজন প্রতিনিধি জানান, প্রতিদিন ৩শিফটে ৫০ জন করে চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, মিডওয়াইফ, ক্লিনার, আয়া সহ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটিতে ডিউটি করবেন। ১৫০ জনের মেডিকেল টিম ও সংশ্লিষ্ট আরো ১৫জন সহ মোট ১৬৫ জনের থাকার জন্য আবাসিক ব্যবস্থা হিসাবে উখিয়ার ইনানীতে একটি বড় হোটেল ভাড়া করা হয়েছে। ২টি বাস ও ২টি আধুনিক মডেলের মাইক্রোবাস তাদের যাতায়াতের জন্য রাখা হয়েছে। আবার তাদের ব্রেকফাস্ট সহ ৩বেলা উন্নতমানের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসম্মত খাওয়া, ২বেলা নাস্তা সরবরাহের জন্য অপর একটি রেস্টুরেন্টের সাথে চুক্তি করা হয়েছে। উখিয়ার কোভিড হাসপাতালটিতে সবসময় ৩টি এম্বুলেন্স স্টেনবাই থাকবে। ২টি এম্বুলেন্স আভ্যন্তরীণ রোগী আনা নেওয়া করবে। অপর এম্বুল্যান্সটি চট্টগ্রাম, ঢাকা সহ দুরে কোথাও রোগী রেফার করা হলে সেখানে রোগী নিয়ে যাবে।

UNHCR এর উর্ধ্বতন কর্মকতা ইফতেখার উদ্দিন বায়েজিদ আরো জানান, এই এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি রোহিঙ্গা শরনার্থী ও স্থানীয় নাগরিকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত কোভিড আইসোলেশন হাসপাতাল রয়েছে। তাই উখিয়ায় বৃহস্পতিবার উদ্বোধনকৃত এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটিতে করোনা আক্রান্ত রোহিঙ্গা শরনার্থীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কোনা দরকার নেই। সুত্র মতে, আগামী ২৪মে সোমবার থেকে এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটিতে নিয়মিত করোনা রোগী নিয়ম মেনে ভর্তি করা হবে। তবে কোন পুরাতন রোগী নয়। যেসব রোগীর স্যাম্পল টেস্টের রিপোর্ট ২৪ মে ‘পজেটিভ’ আসবে শুধু সেসব রোগীদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে সেখানে ভর্তি করা হবে। তবে মুমুর্ষ রোগীদের জরুরী চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সেন্টারটি এখন থেকে যেকোন সময় ব্যবহার করা যাবে। এই এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি ২৪ মে চালু করার পর কক্সবাজারের রামু ও চকরিয়ার ২টি ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালের উপর চাপ কিছুটা হলেও কমবে। সুত্র মতে, স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে কোন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী নিয়ম মেনে উখিয়া এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটিতে রেফার করলেই সেখানে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য ভর্তি করা হবে।

উখিয়া কলেজের একটু দক্ষিণ পার্শ্বে প্রায় ৩ একর জমির উপর কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের সামান্য ভিতরে এই সেন্টারটি নির্মাণ করা হয়েছে। অত্যাধুনিক সুবিধা সম্বলিত হাসপাতালটির সকল চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, স্বাস্থ্য কর্মী, এ্যাম্বুলেন্স, খাদ্য সহ মাসিক সকল ব্যয়ভার ইউএনএইচসিআর কর্তৃপক্ষ বহন করবেন। এ হাসপাতালে আপাতত শুধুমাত্র করোনা ভাইরাস রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেনের ঐকান্তিক আগ্রহ ও প্রচেষ্টায় ইউএনএইচসিআর এ করোনা সংক্রমণকালীন সময়ে এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি নির্মাণ করছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাঃ শাজাহান আলি।
এই এসএআরআই-আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি কক্সবাজারের প্রথম পরিপূর্ণ একটি করোনা আইসোলেন COVID-19 হাসপাতাল। ইউএনএইচসিআর এর অর্থায়নে নির্মিত বর্তমানে রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল কোভিড হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত রয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •