মাহফুজা আজাদ


 

ছেলেটি বেঁচে রইলোনা, তবে যে স্কুলে সে খুব মেধাবী ছাত্র ছিল, সে স্কুলটি ঠিকই রয়ে গেলো।ক্লাস টেন,এসএসসি পরীক্ষা… কিছুই বদলায়নি।এই ঘটনা আমার মনকে খুব নাড়া দিয়েছিলো।আমার সেকেন্ড বেবিটা ছিল মেয়ে।জন্মের একদিন পর সে মারা যায়।নয় মাস সন্তান গর্ভে ধারন করার কস্ট,সন্তান জন্মদানের কস্ট এবং সন্তান মারা যাওয়ার কস্ট…. এই তিন কস্ট আমি ফেইস করেছি।আমার কন্যাটি খুবই সুন্দরী ছিল।নাম রেখেছিলাম… রুসাফা।ইরানের প্রাচীন এক নগরীর নামে।সদ্যজাত শিশুরা যেমনটি হয় সে তেমনটি ছিলোনা।দেখলে মনে হতো দু’মাস বয়সী পরিপক্ক শিশু।আমি এখনও তাকে ভুলতে পারিনি।তাহলে যে মা দশম# শ্রেণী পর্যন্ত একটা বাচ্চাকে প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হতে দেখেছেন তার অবস্থা মা মাত্রই বুঝতে পারবেন।
আমরা খুব সহজেই অন্যের বাচ্চাদের নিয়ে মন্তব্য করি।কিন্তু মায়েদের কাছে সবার ওপরে তার সন্তান।আমি পেশায় একজন কলেজ শিক্ষক।ব্যস্ত থাকতে হয়। আমার বড় বাচ্চাটা নিয়ম করে পড়েছে।তাকে কখনও বলতে হয়নি পড়তে বস।বরাবর রেজাল্ট ভালোই করেছে।পিএসসি তে জিপিএ ফাইভ (গোল্ডেন) পাবার পর সরকারী স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় সে টেকেনি।আমিও এটা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলাম।তা একবার ওকে সাথে নিয়ে একটা দাওয়াতে যাই।সেখানে পরিচিত একজন বললেন.. তুমি কোন স্কুলে পড়?
…. বিমানবন্দর কেজি স্কুলে।
….. সব ভালো স্টুডেন্ট তো সরকারী বয়েজ আর গার্লস এ টেকে। তুমি টেকোনি?
আমার মেয়ে লজ্জায় আমার সাথ আর কখনো কোন দাওয়াতে আর যায়নি।যথারীতি জেএসসি তে গোল্ডেন,এসএসসি তে জিপিএ ফাইভ পেয়ে সে এখন সরকারী কলেজে ইন্টার পরীক্ষার্থী। তো সরকারী স্কুলে ভর্তিপরীক্ষায় টিকা ভালো রেজাল্টের কোন প্লাটফর্ম নয়।তার উপর বড় কথা মা হিসেবে আমার কেমন লেগেছিল তা পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবেন।
আমার ছোটটা ছেলে। পড়াতে বড্ড কস্ট হয়েছে। মেয়েটার মতন তাড়াতাড়ি ক্যাচ করতে পারতোনা। সারাদিনের কর্মব্যাস্ততা সেরে তাকে নিয়ে বসতে হতো। মুখে মুখে শুনে শুনে পড়া মুখস্ত করাতে হতো। টিচারের কাছে পড়তে চাইতোনা।….” তুমি আমাকে পড়াও, আমি পারব।”কি আর করা। রুটি বেলেছি,আর রান্নঘরের টেবিলে ওকে মুখে মুখে পড়া শিখিয়েছি। মাঝখানে ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে পা ভেঙে ক্লাস থ্রী শেষ। গ্যাপ না দিয়ে ক্লাস ফোরে সরকারী প্রাইমারী থেকে এই গাধা ছেলেটা পিএসসিতে জিপিএ ফাইভ(গোল্ডেন) পেল। সরকারী স্কুলের ভর্তি পরীক্ষাতেও আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে টিকে গেলো।আমার ঘরেই আমারই দুসন্তানের দুধরনের মেধাগত পার্থক্য দেখেছি।কাজেই মেধা জাজ করার মানদন্ড সবার এক নয়।আপনার বাচ্চা আপনার কাছে কেবলই আপনার বাচ্চা। অন্যের বাচ্চা ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার হলেই যে আপনার বাচ্চাও তা হবে এটা ঠিক নয়।তার কপালে থাকতে হবে,মেধাও থাকতে হবে। আপনার বাচ্চার মেধা ঠিক কতটুকু সেটা আপনাকেই বুঝতে হবে।ভালো থাকুক পৃথিবীর সব সন্তানেরা তাদের মা বাবার স্নেহের স্পর্শে।স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়,ডিগ্রী,চাকরী সব পৃথিবীতে থাকবে।কোনকিছুই আপনার সন্তানের জীবনের চেয়ে মূল্যবান নয়।সকল মা বাবার প্রতি রইলো অশেষ শুভকামনা।

(লেখাটি জীবন থেকে নেয়া )

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক , ইংরেজী বিভাগ , কক্সবাজার সিটি কলেজ ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •