মো. ওমর ফারুক জয় :

মানুষ তার স্বপ্নের চেয়ে বড়। একমাত্র পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা অব্যাহত রাখলে কঠিন বিপর্যয় মোকাবেলা করেও স্বপ্ন বাস্তব রূপ লাভ করে। সংবাদপত্রের পৃষ্টা উল্টালেই রোজ দেখছি হার না মানা নানান মানুষের কত শত গল্প। প্রত্যেকটি গল্পের পেছনে একেকটি ট্রাজেডি ও ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা আমাদের জানান দেয় পরিশ্রম একমাত্র আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। তেমনি কক্সবাজার জেলার দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া’র হার না মানা এক নারী রাজিয়া বেগম। যিনি তার লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে জীবন সংগ্রামে নেমেছেন।
দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার লেমশীখালী ইউনিয়নের আলী বাপের পাড়া এলাকার মৃত আবুল কালামের মেয়ে রাজিয়া বেগম। বিয়ে করেছেন একই ইউনিয়নের আকবর আলী সিকদার পাড়া এলাকার মৃত হাজী আবদু ছমতের ছেলে মৌলভী শাহাজানের সাথে। ২০০৫ সালে সামাজিকভাবে তাদের বিয়ে হলেও মাত্র এক বছরের মাথায় স্বামী কর্তৃক তালাক প্রাপ্ত হন রাজিয়া বেগম। তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার সময় গর্ভবতী ছিলেন তিনি। পরে বাবার বাড়িতে তার এক কন্যা সন্তান জন্ম লাভ করে। কন্যা সন্তান জন্ম নেওয়ার পরে রাজিয়া বেগম প্রতিজ্ঞা করেছিলেন মেয়েকে পরিশ্রম করে হলেও উচ্চ শিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ করবেন। সে থেকে হাতের কাছে কোনো কাজ পেলেই শুরু করে দেন রাজিয়া বেগম। জীবনের তাগিদে কখনও মানুষের বাড়িতে, কখনও গার্মেন্টেস আবার কখনও দিনমজুরের কাজও করেছেন তিনি।
এক পর্যায়ে রাজিয়া বেগম মেয়ের স্বপ্নপূরণের কথা চিন্তা করে শহরে গিয়ে একটি পোশাক কারখানা বা গার্মেন্টসের চাকুরি নেন। এভাবে চলতে থাকে রাজিয়া বেগমের জীবন। ওদিকে মেয়ের পড়াশোনাও চলছে নিজ গ্রামের একটি স্কুলে। গত দুইবছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালে রাজিয়া বেগমের পিতা আবুল কালাম মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর রাজিয়া বেগম গার্মেন্টস কর্মীর কাজ ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসেন।
বর্তমানে তার একমাত্র মেয়ে উম্মে হাবিবা’র বয়স ১৩ বছর। সে পড়ছে লেমশীখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণীতে। মেধাবী শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা ক্লাসে ফার্স্ট গার্লও। গ্রামে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার জন্য রাজিয়া বেগম বর্তমানে কাজ করছেন লবণ মাঠে।
কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী ইউনিয়নের আলী বাপের পাড়া এলাকায় স্বামী পরিত্যক্ত রাজিয়া বেগমের লবণের মাঠে কাজ করার দৃশ্য চোখে পড়েছে স্থানীয়দের। । যা ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এখবর সংবাদমাধ্যমে দেখার পর টানা ২৪ ঘন্টা অপেক্ষার পর মুঠোফোনে কথা বলার সুযোগ হয় রাজিয়া বেগমের সাথে। রাজিয়া বেগমের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে একই কথা বলেন তিনি। চলতি মৌসুমে লেমশীখালী ইউনিয়নের আলী আকবর পাড়ায় ৩০ শতক জমি বর্গা নিয়ে লবণ মাঠ শুরু করেছেন বলে জানান। তিনি নিজেই এই লবণ মাঠের যাবতীয় কাজ একাই করছেন। তিনি বলেন, মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য দিনরাত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যাচ্ছি। আমি আমার মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত করতে চাই।
সারাবিশ্বের ন্যায় বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে কর্মহীন ও ঘরবন্দী দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ। দেশের চলমান এই পরিস্থিতিতে মেয়ের লেখাপড়া নিয়ে সন্দিহানে রাজিয়া বেগম। মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত হয়ে দেশের সেবা করার মানসে মানুষ হিসেবে তৈরি করতে চান তি। নানান সীমাবদ্ধতার কারণে তা পারছেন না। চলমান পরিস্থিতি ও লবণের মূল্য কম থাকায় রাজিয়া বেগমের সংসারে নেমে এসেছে অন্ধকার। মেয়ের পড়াশোনা নিয়েও বেশ চিন্তিত রাজিয়া বেগম।
রাজিয়া বেগমের জীবন সংগ্রামের গল্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হওয়ার পরপরই কুতুবদিয়া উপজেলা প্রশাসন উম্মে হাবিবা’র পড়াশোনার সকল দায়িত্ব নেন। সে সাথে একটি টেকসই ঘর করে দেওয়ারও সীদ্ধান্ত হয়।
একজন নারী কখনও কারও মা, কখনও কারও বোন, কখনও কারও স্ত্রী কিংবা আত্মার সর্ম্পকীয়। বাস্তবিক অর্থে আমাদের সমাজে নিগ্রীহ হয়ে পড়ে থাকা একটি অংশ হলো নারী। আমাদের সমাজে নারীদের একপ্রকার ধর্মীয় গোঢামী দিয়ে চার দেয়ালে আবদ্ধ রাখতে বেশ পছন্দ করি। কখনও জানতে চাইনা তাদের নিজস্ব অভিমত, নিতে চাইনা তাদের পরামর্শ কিংবা সহযোগিতা। কালের পরিক্রমায় অনেকটা বদলেছে এ রীতি। এখন নারীরাও ঘরে বসে নেই। নিজেরাই নিজেদের যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ করে সংসারে পুরুষের সমপরিমাণ সহযোগিতা করে যা”েছন। একজন নারী যখন কারও মা হন, তখন তার সন্তানদের জন্য ভালোবাসা অফুরন্ত। মায়েরা ভালোবাসার ক্ষেত্রে সন্তানদের জন্য কৃপণতা করেন না কোনোকালেই। সন্তানের মুখে হাসি ফুটাতে কতই না কিছু করেন মা। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে মায়েদের অফুরান ভালোবাসার গল্প যেনো চোখে পড়লে বুক জুড়িয়ে যায়। তেমনি আমি এমন একজন মা রাজিয়া বেগমকে খুঁজে পেয়েছি,যিনি সন্তানের উচ্চ শিক্ষার স্বপ্নের কথা ভেবে স্বামী পরিত্যক্তা হয়েও জীবনযুদ্ধে নেমে পড়েছেন। তার এমন পরিশ্রম ও সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও জীবনসংগ্রাম দেখে অনবরত আমার দু’চোখে ঝরেছে অশ্রু। রাজিয়া বেগমদের মতো মায়েরা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুক উদাহরণ হয়ে, স্যালুট।

 

লেখক- গণমাধ্যমকর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা- উই ক্যান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •