মাহফুজা আজাদ 

চারিদিকে হলুদ সর্ষের ক্ষেত।যেনো হলুদ কার্পেট বিছানো।সেই দিনগুলোর অপেক্ষায় কাটতো সারা বছর।কখন পরীক্ষা শেষে গ্রামে বেড়াতে যাবো।

হলুদ নদীর সেইদিনগুলোতে ব্যস্ততা তেমন ছিলোনা,ছিলোনা জীবনের কোন জটিল অংক। দিনগুলোয় বিয়েতে পাত্রপক্ষের মোটর সাইকেল দাবী ছিলোনা।সে দিনগুলোয় কনেরা পার্লারে সাজতে যেতোনা।রঙিন কাগজ তিনকোনা কেটে পাটের সুতায় লাগিয়ে জানান দেয়া হতো আজ কারো বিয়ে।নকশা কাটা কাগজ লাগিয়ে দেয়া হতো ঘরের দরজার উপরে।

পাটায় হুলস্থুল মেহেদী বাটা,হলুদ বাটার হইচই।গাঁয়ের কোন এক মুরুব্বী রান্নার বাবুর্চি হতেন।দই পাতা হতো মাটির হাড়িতে।তারও কারিগর থাকতেন কোন এক মুরুব্বী।মা খালা, চাচী,ফুপু, পাড়া- প্রতিবেশীরা হাতের কাজটা ভাগ ভাটোয়ারা করে নিতেন।শরবত কে বানাবে,জামাই আপ্যায়ন কে করবে,গেট ধরবে কে কে…. আনন্দ কোলাহলে বিয়ে বাড়ী ছিল মুখরিত।

আমার বাবার বাড়ী রাজশাহী।সেখানের গাঁয়ের বউ গরু বা মহিষের গাড়ীতে করে শশুড়বাড়ী যেতো। যতদূর চোখ যেত বিদায়বেলা মা চেয়ে রইতেন লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ীতে মোড়ানো নতুন একরুপের কন্যার প্রতি।সোনার গহনার বালাই নেই।রুপার একজোড়া কানের দুল আর আর একটা রুপার চেইন। ব্যাস্,অইটুকুতেই খুশি।

আমার নানার বাড়ী বি, বাড়ীয়া।ছোটবেলায় বেড়াতে গেলে বিয়ে বাড়ীতে খুব মজা হতো।রাতে কোন বিয়ে হতোনা।ইলেকট্রিসিটি ছিলোনা।তাই পথিমধ্যে যাতে কোন ঝামেলা না হয় সন্ধ্যার আগেই বউ নিয়ে যেতে হবে।পালকিতে বউ।দু’জন করে চারজন পালকি বইতো।আমি পায়ে হেঁটে বরযাত্রী ও হয়েছিলাম।পথের যাত্রা কমানোর জন্য পালকি বেয়ারারা গান ধরতো।

বিয়েতে দু’ জন মানুষ,দু’টিপরিবারের শুধু আন্তরিকতাটাই বড় ছিল।অর্থ বা বিত্ত নয়।দেনমোহরের অংক বাড়ানোটা তখন প্রচলণ ছিলোনা।সংসারটা গড়ে তোলাই বড় ছিল।তাই হয়তো ভগ্ন পরিবারগুলোও কম ছিল।

তখন ইলেকট্রিসিটি ছিলোনা,কিন্তু জোনাকি পোকার আলোর মিছিল ছিল,পালকি ছিল… স্বপ্নের পালকি।আকাশ ভরা জোৎস্না ছিল,এখন এনার্জি বাল্বের আলোয় শহরময় ঠিকই আলো।আমি তাই আজো আমার ছেলেমেয়েদের জোনাকি পোকা চেনাতে পারিনি।সময় নিয়ে মনে করি আমার সেই….হলুদ নদীর দিনগুলি …. Days by the yellow river.

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক , ইংরেজী বিভাগ , কক্সবাজার সিটি কলেজ । 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •