মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

লবণ শ্রমিক স্বামী পরিত্যক্তা রাজিয়া বেগম। তার মেয়ে উম্মে হাবিবা। কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা। স্থানীয় একটি হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী উম্মে হাবিবা। গরীব হলেও পড়ালেখায় ধনী। তাই স্কুলে তার ক্লাসে উম্মে হাবিবা’র রোল নম্বর এক। কিন্তু উপায় নাই। সংসারের খরচ ও উম্মে হাবিবা’র পড়া লেখাপড়ার ব্যয় মেঠাতে মা-মেয়ে দু’জনই লবণ শ্রমিকের কাজ করে নিয়মিত।

তারা দু’জন প্রচন্ড রৌদ্রে কুতুবদিয়ার একটি লবণ মাঠে ঘাম ঝড়ানো হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করার একটা ছবি দিয়ে দৈনিক কালেরকন্ঠ’র কক্সবাজারস্থ বিশেষ প্রতিনিধি ও জেলা কমিউনিটি পুলিশিং এর সভাপতি এডভোকেট তোফায়েল আহমদ সহ আরো বেশ ক’জনের ১৭মে রোববার দেওয়া ফেসবুক পোস্ট কুতুবদিয়ার ইউএনও জিয়াউল হক মীর এর নজরে পড়ে। এতেই কপাল খুলে যায় লবণ শ্রমিক রাজিয়া ও তার মেধাবী কন্যা উম্মে হাবিবা’র।

নিজে স্বশরীরে গিয়ে তাদের অবস্থা জানার জন্য প্রচন্ড আগ্রহ থাকলেও করোনা সংকট বিষয়ক বহুমুখী কাজকর্ম, ঘুর্ণিঝড়ের আগাম প্রস্তুতি ইত্যাদির দাপ্তরিক ব্যস্ততা মানবিক ইচ্ছা পুরণ করতে দেয়নি কুতুবদিয়ার ইউএনও জিয়াউল হক মীর’কে। কিন্তু মন মানেনা। অফিসে নিয়ে আসার জন্য করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ কার্যক্রমে নিয়োজিত উক্ত লেমশীখালী ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক জাহিদুল ইসলাম’কে একটি গাড়িসহ পাঠানো হয় মা-মেয়ে’কে ইউএনও এর অফিসে আনতে। ১৭ মে রোববার বিকেলে
কুতুবদিয়ার ইউএনও এর বাসভবনে আসার পর পরই লবণ শ্রমিক, স্বামী পরিত্যক্তা রেজিয়া বেগমে’কে ইউএনও জিয়াউল হক মীর তাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন এবং মেয়ে উম্মে হাবিবা’কে বোন বলে সম্বোধন করেন। এরপর উভয়ের কাছ থেকে কুশলাদি আগ্রহ ভরে জেনে নেন। সবকিছু জেনে কুতুবদিয়ার ইউএনও জিয়াউল হক মীর মেধাবী ছাত্রী উম্মে হাবিবা’র পড়ালেখা ও আনুষাঙ্গিক সকল ব্যয় তিনি নিজ দায়িত্বে নেবেন বলে মা-মেয়েকে জানিয়ে দেন। এতে মানবিক ইউএনও এর তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেখে মা-মেয়ে সহ উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে যান। এ নিয়ে কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ফেসবুক আইডি’তে রোববার ১৭মে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে একটি স্ট্যাটাস দেন।

এবিষয়ে দেওয়া স্ট্যাটাসটি হুবুহু তুলে ধরা হলো :

“লবণ শ্রমিক রাজিয়া বেগমের মেয়ে উম্মে হাবিবার পড়ালেখার যাবতীয় খরচ সহ তার পরিবারের অন্যান্য দায়িত্ব নিলাম
,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
“মেয়ের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে কুতুবদিয়ায় লবণ মাঠে শ্রমিকের কাজ করছেন হতভাগী মা রাজিয়া” শিরোনামে কালের কন্ঠের সিনিয়র সাংবাদিক জনাব তোফায়েল আহমেদসহ আরো কয়েকজনের ফেইসবুক আইডি থেকে একটি পোস্ট দেখতে পেয়ে ওই পরিবারটির খোঁজ নিলাম, ঠিকানা বের করলাম। উক্ত পরিবারটি অত্র উপজেলার লেমশীখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা। ইচ্ছে ছিল আমি নিজেই ওই অসহায় মায়ের বাড়িতে যাব। কিন্তু অফিসিয়াল বেশ কিছু কাজ হাতে থাকায় উনাদেরকে আমার অফিসে নিয়ে আসার জন্য করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ কার্যক্রমে নিয়োজিত উক্ত লেমশীখালী ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক জাহিদুল ইসলামকে একটি গাড়িসহ পাঠালাম। উনারা আমার বাংলোর নিচ তলার অফিসে আসলে আমি মা সম্বোধন করে উনার কাছে সব জানতে চাইলাম। উনার পরিবারের বিস্তারিত খোঁজ খবর নিলাম। তখন তার অসহায়ত্ব এবং দূরবস্থার কথা আরো ভাল করে জানতে পারলাম। কথা প্রসংগে জানতে পারলাম স্বামী পরিত্যক্তা জনাব রাজিয়া বেগমের একমাত্র মেয়ে উম্মে হাবিবা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির একজন মেধাবী ছাত্রী। তার রোল নং ০১। তিনি চান তার একমাত্র মেয়েটিকে পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষের মত মানুষ করতে। এজন্য তিনি অপরের জমি বর্গা হিসাবে নিয়ে এই গরমে প্রচণ্ড তাপদাহ সহ্য করে নিজেই লবণ চাষ করেন। কিন্তু অর্থাভাবে উনার এই মেধাবী মেয়েটির পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার পথে। উনাদের পরিবারের বিস্তারিত জেনে জনাব রাজিয়া বেগমকে বললাম, মা আপনার মেয়ে উম্মে হাবিবা আমার বোন। তাৎক্ষণিকভাবে উনাদেরকে কথা দিলাম-
১.উম্মে হাবিবার পড়ালেখার সকল খরচ আমি বহন করব।
২. তার স্কুল ড্রেস, কেডস এবং যাবতীয় শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থাকরণ। উল্লেখ্য, তার স্কুল ড্রেস এসিল্যান্ড দিবেন মর্মে জানিয়েছেন।
৩.গৃহহীন এই পরিবারের জন্য সরকারিভাবে একটা গৃহ নিমার্ণ করে দেওয়া হবে।
৪. স্বামী পরিত্যক্তা ভাতার ব্যবস্থা
৫. ভিজিডি’র চাল পাওয়ার ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ
৬.তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্য সহায়তা হিসেবে ২০ কেজি চাল, ৪কেজি ডাল, ২ লিটার তেল, ৪কেজি আলু, ২ কেজি লবণ প্রদান।
৭. এছাড়া এই পরিবারের বিপদে-আপদে আর্থিক সহায়তা প্রদান সহ যাবতীয় বিষয়ে দেখভালের দায়িত্বও বহন করা হবে।”

কুতুবদিয়ার ইউএনও জিয়াউল হক মীর এর এই অসাধারণ মানবিক কার্যক্রমে থেকে অনেক কিছুর শেখার আছে। শুধু বড়কর্তার নির্বাহী পোস্টের চেয়ারে বসে থেকে অধীনস্থদের আদশ করা নয়, তৃণমূল থেকে সকল পর্যায়ে খোঁজখবর রাখাও বড় দায়িত্বশীলদের অন্যতম কর্তব্য। স্যালুট! কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার জিয়াউল হক মীর। আপনি আরো বড় হোন। আপনার প্রতি দরদ মাখা অফুরান ভালোবাসা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •