মোহাম্মদ নজিবুল ইসলাম


কোভিড-১৯ এর কারণে বাংলাদেশ আজ জাতীয়ভাবেই এক দূর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশে দিনে দিনে কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। পিছিয়ে নেই সমুদ্র জনপদ কক্সবাজারও।

গত এক সপ্তাহে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে গেছে অনেকগুণ। আক্রান্ত ব্যক্তিদের আইসোলেশন করে রাখার মত পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কক্সবাজারে নেই (সরকারী ও বেসরকারী উভয়ক্ষেত্রেই)। এর ফলে বেশিরভাগ রোগীকেই রাখা হচ্ছে হোম আইসোলেশানে, মানে নিজের বাসায় আলাদা করে। কিন্তু ব্যাপারটা কতটা ফলপ্রসূ? সব কোভিড আক্রান্তের মধ্যেই একই রকম সচেতনতা আশা করা বোকামি। হোম আইসোলেশনে থাকা সব রোগী সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সচেতনতা নিয়ে আইসোলেশনে থাকবে না এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এতে করে ওই রোগীর নিজের পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও প্রতিবেশিদের আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেড়ে যায় অনেকগুণ। তাই এলাকা লকডাউন, হোম আইসোলেশনের সাথে সাথে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রথমত, আক্রান্ত রোগীদের আইসোলেশানের সাথে সাথে ওই রোগীর কন্টাক্ট পার্সন যারা যারা আছে, অর্থাৎ, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে যারা যারা ছিল, তাদের সবার কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা এবং কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা।

দ্বিতীয়ত, কন্টাক্ট পার্সনদের কোভিড-১৯ টেস্ট নিশ্চিত করা। যাতে কোন কেস unreported থেকে না যায়।

তৃতীয়ত, হোম আইসোলেশানের চেয়ে ইন্সটিটিউশনাল আইসোলেশন অনেক বেশি কার্যকর। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কোন জায়গায় আক্রান্তদের আইসোলেশন করে রাখা। যেহেতু কক্সবাজারে আইসোলেশন সেন্টারের রোগী ধারণ ক্ষমতা সীমিত, সেক্ষেত্রে কক্সবাজারের বর্তমানে পর্যটকহীন অব্যবহৃত পরে থাকা উন্নত ও মধ্যম উন্নত হোটেলগুলোকে আইসোলেশনের কাজে ব্যবহার করা যায়, যদি প্রশাসন ও মালিকপক্ষ ঐক্যমত্যে আসতে পারে।

আরেকটি বিষয় যা গত কয়েকদিন ধরে কক্সবাজারবাসীর জন্য অত্যন্ত চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগী সনাক্ত হওয়া। এটা এজন্যই অতিমাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ, কেননা অসেচতন বিশাল একটা জনগোষ্ঠী হলো এই রোহিঙ্গা কমিউনিটি। তাদের অসেচতনতা, অপর্যাপ্ত আবাসন, অনিয়ন্ত্রিত পরিবার পরিকল্পনা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অপরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি কারণে করোনা ভাইরাস বিদ্যুতবেগে পুরো রোহিঙ্গা কমিউনিটি এমনকি স্থানীয়দের মধ্যে বিস্তার লাভ করবে অতি অল্প সময়ে। যদিও বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার (আইওএম, এম এস এফ, রেডক্রস, আর টি এম ইন্টারন্যাশনাল ইত্যাদি) কল্যাণে ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কিছু আইসোলেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতিসংঘ সহ সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য বিভাগকে বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আরও বিস্তারিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

প্রথমত, ক্যাম্পের অভ্যন্তরেই আরও কিছু আইসোলেশন সেন্টার বিনির্মাণ করা।

দ্বিতীয়ত, ক্যাম্পে রোহিঙ্গা স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কেননা, স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি প্রতিদিনের ডিউটি শেষ করে আবার নিজ আবাসে ফিরে আসে, তাতে তার পরিবার ও আশেপাশের মানুষ আক্রান্ত হবার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।

তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা রোগীদের কোভিড-১৯ টেস্টের সিংখ্যা বাড়ানো, যার কোন বিকল্প নেই।

চতুর্থত, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে স্থানীয় জনগণের অপ্রয়োজনীয় (স্বাস্থ্যখাত, খাদ্য ও পুষ্টি এবং অন্যান্য জরুরী সেবায় নিয়োজিত কর্মী ব্যতীত) যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ করা, যাতে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের সুযোগ না থাকে।

দ্রুত প্রাতিষ্টানিক আইসোলেশন সেন্টার বৃদ্ধি করা না হলে কক্সবাজার কোভিট ১৯ আক্রান্তের হটস্পটে পরিনত হবে ঈদের আগেই। রোহিঙ্গা ক্যাম্প করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ব্যাবস্থাপনা পুরোপুরি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে না নিলে ক্যাম্পে কোভিট ১৯ মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।

তাছাড়া চকরিয়া পেকুয়া দুই উপজেলা উপকূল, পার্বত্য জেলা ও চট্টগ্রামের প্রবেশ দ্বার হওয়ায় এখানে আক্রান্তের হার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এখান থেকে মহেশখালীর চলমান মেগা প্রকল্পে নিয়োজিত বিদেশী এবং দেশী প্রকৌশলী সহ হাজার হাজার শ্রমিক আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এতে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও ভবিষৎ অর্থনীতী মুখ থুবড়ে পড়বে । এই উপজেলা সমুহে করোনা চিকিৎসা সমন্বয় এর জন্য জেলা সিভিল সার্জন এর একটি ইউনিট চকরিয়ায় চালু করে পিসিআর ল্যাব স্থাপন করে প্রতিদিন আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা সবাই কে টেষ্ট বাধ্যতা মূলক এবং আইসোলেশন সেন্টার এ রাখা জরুরী হয়ে পড়েছে।

কক্সবাজার সদর ও পৌর সভায় কোন আইসোলেশন সেন্টার না থাকায় কক্সবাজার এ কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগি দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে যার কারনে পজিটিভ রোগিদেরকে হোম আইসোলেশনে রাখতে হচ্ছে যার কারনে বাসার অন্য সদস্যরা আক্রান্ত হচ্ছে যা আমরা গত কয়েকদিনের পজিটিভ কেইস বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই বাদ যাচ্ছেনা ১০ মাস বা ১৫ মাসের শিশু পযর্ন্ত। তাই এখানেও প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশন সেন্টার করা উচিত যেটা ইতিমধো ঢাকা ও চট্রগ্রাম এ শুরু করেছে । প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশন এর কাজে আমরা কক্সবাজারের উন্নতমানের হোটেল গুলোকে ব্যবহার করতে পারি । কক্সবাজার মৎস অধিদপ্তরের কাছে ২ টি উন্নয়নে মানের পিসিআর ল্যাব আছে। এই ২ টি ল্যাব কোভিট ১৯ টেষ্ট এর কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারী মতে কক্সবাজার জেলা জনসংখ্যা ২৩ লক্ষ যা বর্তমানে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে এর উপর যোগ হরেছে আরো ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা । এই ৩৪ লক্ষ জনবসতির কোভিট ১৯ ভাইরাস সংক্রমণ রোধের জন্য টেকনাফ -উখিয়া কে ১ টি জোন, রামু -কক্সবাজার কে একটি জোন এবং চকরিয়া-পেকুয়া -মহেশখালী -কুতুবদিয়া কে পৃথক জোন করে চিকিৎসার, টেষ্ট এবং আইসোলেশন সেন্টার দ্রুত গঠন করা জরুরী হয়ে পড়েছে।


লেখক : সাংবাদিক ও করোনা স্বেচ্ছাসেবক।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •