ফিচার ডেস্ক:

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস। চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানে জ্বর-সর্দি-কাশি নিয়ে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন এক নারী। প্রথমে সাধারণ ফ্লু হিসেবে ধরে নেওয়া হলেও যখন এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করলো; তখন শনাক্ত করা হলো এটি করোনাভাইরাসের উপসর্গ। নতুন নামকরণ করা হলো কোভিড-১৯। সেই থেকে জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলছে আক্রান্তের সংখ্যা। ইউরোপীয় রাঘব বোয়ালদের নাকানি-চুবানি খাইয়ে পরবর্তী বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ আক্রান্ত শনাক্ত হয়। একই মাসের ১৮ তারিখে মারা যায় প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী। আক্রান্তের সংখ্যাটি এখন ২১ হাজার ছুঁই ছুঁই আর মৃতের সংখ্যা তিন শতাধিক। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে এখন পর্যন্ত ৯২৯ জন করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।

এ সময়ে কেমন আছে মঠবাড়িয়া? দেশের অন্য ৪৯১টি উপজেলার মতো মঠবাড়িয়াও সাধারণ একটি উপজেলা। পুরো দেশ যখন কোভিড-১৯ এ পর্যুদস্ত; তখন মঠবাড়িয়ার চিত্র কেমন সেটাই দেখবো এবার। হাঁড়ির একটি ভাত টিপলেই পুরো হাঁড়ির খবর জানা যায়।

মঠবাড়িয়ায় প্রথম কোভিড-১৯ আক্রান্ত শনাক্ত হয় ১৩ এপ্রিল। ঢাকা ফেরত ওই যুবককে রাখা হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আইসোলেশন ইউনিটে। ক’দিন পরে জানা গেল, তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। আশার সংবাদ বৈকি। আশা হতাশায় পরিণত হলো পরবর্তীতে একই দিনে তিন জন শনাক্ত হয়ে। পরের দিন পুনরায় দুই জন। তবে সবাই ঢাকা বা চট্টগ্রাম ফেরত। এখন পর্যন্ত সর্বমোট ৬ জন আক্রান্ত এ উপজেলায়। তার মধ্যে ৪ জন নারী, ২ জন পুরুষ। তবে যতজন শনাক্ত, আক্রান্তের সংখ্যা ততজনেই সীমাবদ্ধ- এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারছি না। আশার কথা হলো, এখনও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি এবং লোকাল কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়নি।

স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে জানা যায়, আক্রান্তদের বাড়ি লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক প্রশাসনের নজরদারিতে থাকছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ চলাচলে কতটা সতর্ক থাকছেন? স্বাস্থ্যবিধি কতটুকু মানছেন? সে প্রশ্ন থেকেই যায়। মাঠপর্যায়ে আমি যতটুকু দেখেছি, তাতে এখানকার সাধারণ মানুষ থোড়াই কেয়ার করে এ ভাইরাস আর বিধি-নিষেধকে। অবাধ চলাচল, চায়ের দোকানের আড্ডা আর বিকিকিনি সবই চলছে হরদম। লকডাউন এদের স্পর্শ করতে পারেনি। কেননা আগে থেকেই শিথিল করে নিয়েছেন তারা। আর প্রশাসনের সঙ্গে চলছে চোর-পুলিশ খেলা। তবে শতভাগ মানুষই বিধি-নিষেধ মানছেন না এমন নয়। যারা মানছেন; তারা নিতান্তই সংখ্যালঘু। কেন মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি? এ প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা জনের নানা অজুহাত এবং বদ্ধমূল কিছু কুসংস্কার।

আগে অনেককেই বলতে শুনেছি, ও আমাদের এদিকে হবে না। অনেকে আবার মুফতি ইব্রাহীমের মতবাদেও বিশ্বাসী। তারা ভাবছেন, মুসলমানদের সংক্রমণ হবে না। তবে শনাক্তের পরে যে মুখে কুলুপ এঁটেছেন, তা নয়।

লোকজনের মধ্যে এক অদ্ভুত রকমের ভীতিও কাজ করে। যেমন- আমার পরিচিত এক বন্ধুসম প্রতিবেশী জ্বর-জ্বর বোধ করলে করোনা টেস্ট করতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু তার বাবা-মা না করার জন্য বললেন। তারা ভাবছেন, টেস্ট করানোর পরে করোনা শনাক্ত হলে কী হবে! লোকে কী ভাববে? তবে একই কারণে দেশে এখন পর্যন্ত দু’জন আত্নহত্যা করেছে। এমন কোনো ঘটনা এখানে ঘটেনি- এটাও সুখবর বটে। এ ভয়ের কারণেও হয়তো তুলনামূলক কম টেস্ট করানো হচ্ছে এবং শনাক্তও কম হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের তথ্যমতে, দেশে করোনা সংক্রমণ নিয়ে ৭৯টি গুজব বিদ্যমান রয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, গ্রামাঞ্চলে তার চেয়েও বেশি রয়েছে। তার মধ্যে- ঈশ্বরপ্রদত্ত গজব, প্রত্যেক শতকে এমন মহামারীর আগমন ঘটে, অবিশ্বাসীদের নিধন করে প্রকৃতিকে শুদ্ধ করার জন্য, রোদে দাঁড়িয়ে থাকলে ভাইরাস মরে যায়, ওঝা-দরবেশের তাবিজ-তদবির অন্যতম। অনেকে তো করোনা নামটিই পরিবর্তন করে ‘করুনা’, ‘ক্যারিনা’সহ নানা নামে আখ্যায়িত করেন।

আলবেয়ার কামুর ‘দ্য প্লেগে’ জা তারিউ তার দিনিলিপিতে লিখেছিলেন, শহরের তাবৎ দোকান থেকে হঠাৎ পিপারমেন্ট লজেন্স উধাও হয়ে গেল। কারণ লোকেরা বিশ্বাস করে, এটা মুখে দিলে প্লেগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। তেমনি একদিন আমার মা রাত তিনটার সময় বললেন, থানকুনি পাতা খেতে। কারণ কোনো এক হুজুর স্বপ্নে দেখেছেন, এটা খেলে করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। আমি অবশ্য খাইনি।

এক বৃদ্ধার ধারণা, করোনা শনাক্ত হলে ধরে নিয়ে ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলা হয়। এ জন্যও তারা টেস্ট করান না। তার সমগোত্রীয় অনেকেরই এ রকম অনেক ধারণা রয়েছে অবশ্য। এ ছাড়াও অধিকাংশ সাধারণ মানুষই অদৃষ্টে বিশ্বাসী। একজন শ্রমজীবী মানুষকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, করোনা সংক্রমণ রোধে কতটুকু সতর্ক থাকা উচিত? তিনি বললেন, ‘কপালে যা আছে, তা-ই হবে। মৃত্যু থাকলে সতর্কতা আমাকে রক্ষা করতে পারবে না।’ তবে অনেকে পেটের টানেও অদৃষ্টবাদী। কাজ না করলে নিরন্ন থাকতে হবে। তাই হয়তো অদৃষ্টকেই হাতিয়ার বানাচ্ছেন।

একজন প্রবাসী করোনাকালে বাড়িতে এলেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আলাদা থাকতে বলা হয়। এতে তিনি ভীত হয়ে পড়েন। তাকে কখন ধরে নিয়ে যায় এই ভয়ে। তিনি কোয়ারেন্টাইনকে গ্রেফতার জ্ঞান করেন। তাই তিনি পালিয়ে পালিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করেন।

হতাশার কাব্য আর লিখতে চাই না। পৃথিবীর শেষ করোনাভাইরাসটিও নিঃশেষ হয়ে যাক, প্রাণখুলে প্রশান্তির নিশ্বাস ছাড়ুক এ গ্রহের শ্রেষ্ঠ প্রাণিগুলো। অন্ধকার কেটে আলো আসবে এ বিশ্বাসে বেঁচে থাকি।আলো আসবে, আসতেই হবে।

লেখক: মো. আরিফুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •