আজহারুল ইসলাম বিপ্লব,চবি :

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার ওনার ফেইসবুক পেইজে গত ১৬  মে রাত ১১ টায় ভিডিও ম্যাসেজ রুপে এক খোলা চিঠি প্রেরণ করেছেন। ৪ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে উপাচার্য তাঁর সকল শিক্ষার্থীদের শূন্যতা অনুভব করছেন বলে জানিয়েছেন।তিনি আরো বলেছেন, আমি তোমাদের সেদিনের জন্য ক্যাম্পাসে অপেক্ষা করবো, যেদিন করোনা মুক্ত এই বাংলাদেশে যেন সবাই ফিরে আসো এই সবুজ বনভূমিতে।

ভিডিওতে উপাচার্য যা বলেছেন সিবিএন’র পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হল……..

“প্রিয় শিক্ষার্থীরা,
এভাবে তোমাদের কাছে খোলা চিঠি লিখবো,ভাবিনি কখনো।

করোনা কালের এই দুঃসময়ে পরম করুণাময়ের কাছে একটাই প্রার্থনা, তিনি যেন তোমাদের সবাইকে ভালো রাখেন।ক্যাম্পাসের সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ এবং দেশের সকল স্থানে বসবাসকারী সবাই যেন সুস্থ থাকে, এ দোয়াই প্রতিদিন জানাই তার কাছে।

প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা,
তোমরা এই সবুজ ক্যাম্পাসের প্রাণ। আমি এই সবুজ-শ্যামলীল মায়া-ভরা ক্যাস্পাসেই রয়ে গেছি। কিন্তু তোমাদের জন্য প্রতিদিন দুঃশ্চিন্তায় থাকি।

প্রতিদিন ভোরে সূর্য উঠে জাগিয়ে দেয় পৃথিবীকে, এই ক্যাস্পাসকেও নতুন আলোয় আলোকিত করে দেয়। ভোরের মৃদুবন্ধ সমীরে হিল্লোলিত হয় বৃক্ষরাজি, বনলতা এবং পুষ্পরাজি; পাখিরা ডেকে উঠে শোচকীত করে দেয় ক্যাম্পাসকে। আমি প্রতিদিন দেখি-ফিরি ক্যাস্পাস। বিভিন্ন অনুষদের সামনে দিয়ে গেলে হাহাকার করে উঠে হৃদয়। ক্লাসরুমগুলোর দিকে তাকাই।

তোমরা নেই বলে বেঞ্চগুলাতে ধুলো জমে আছে। তোমরা নেই বলে শাটল ট্রেন ভেঁপু বাজিয়ে আর তোমাদের নিয়ে আসে না, বাসগুলো ভিড় জমায় না ১নম্বর গেইটে। তোমরা নেই বলে বন্ধ হয়ে গেছে জারুলতলার হাসি-উল্লাস,উৎসব-আনন্দ। তোমরা নেই বলে চাকসুর ক্যাফেটরিয়াও নির্জীব,নিষ্প্রাণ। তোমরা নেই বলে প্রতিদিন কেঁদে-কেঁদে উঠে কাটা-পাহাড়। কখনো সন্ধ্যায় হরিণ নেমে আসে কাটা-পাহাড়ে। কোনদিন প্রস্তুষে অথবা প্রদশে ভিসির বাংলোর পাহাড়ের পথে নেমে আসে হরিণ। বন্যবরাহ। জঙ্গলের প্রাণীদের অনশন চলছে আহারের অভাবে। তাই হয়তো লোকালয়ে এসে তোমাদের স্নেহ খোঁজে।

ক্যাম্পাসের বিভিন্ন রঙের পাখিরা প্রতিদিন তোমাদের ডাকে। তোমরা নেই বলে ওদেরও মন খারাপ। তোমরা নেই বলে প্রাণ-প্রকৃতি আজ বিষন্ন, পাখিরা স্তব্ধ। ওদের ভাষা আমি বুঝতে পারি প্রতিক্ষণ।

বিভিন্ন অনুষদগুলোর ক্লাসরুম, বারান্দা, ট্রেন সব যেন বিপন্ত বোধ করে তোমাদের ছাড়া। সবুজ পাহাড়, ঝর্না, ল্যাম্পপোস্ট, হলের গেইট শুধু প্রতিক্ষা করছে কবে তোমরা ফিরবে। জ্ঞান গ্রহণের জন্য তোমরা এসেছো। এই মায়াভরা ক্যাম্পাসে। হঠাৎ এক জীবনঘাতি অনুজীব আমাদের থমকে দিয়েছে সবকিছু।

ভেবো না; সব ঠিক হয়ে যাবে। আবার স্টেশন তোমাদের আলিঙ্গন করবে, ক্লাসরুম তোমাদের অভিবাধন জানাবে। চাকসু, জারুলতলা, সবুজ পাহাড়, ঝর্ণা, প্রাণ-প্রকৃতি আবার আনন্দে আত্মহারা হবে তোমরা ফিরে এলে।

তোমরা ফিরে এলে আবার সব প্রিয় শিক্ষকেরা তোমাদের পেয়ে পূর্ণ জীবনশক্তি নিয়ে দান করবেন তাদের মেধা আর মনন। তোমরা ফিরে এলে বিশ্বের সব আধুনিক জ্ঞানরাশি তোমাদের চারপাশে এসে দাড়াবে। মাঝেমধ্যে খবর পাই আমার প্রিয় ছাত্ররা বসে নেই। জাতির এই দুঃসময়ে তারা দুস্থদেহে প্রাণ দিচ্ছে, এতিমদের খাবার দিচ্ছে, অসহায় চাষীর ধান কেটে দিচ্ছে। আমরাও চেষ্টা করছি মেধাবী অসহায় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অনুদান দিয়ে সাহায্য করতে।

এরইমধ্যে খবর পাই, আমাদের প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে ভালো স্কলারশিপ পাচ্ছে। ওদের দেখে আমি সীমাহীন আনন্দ অনুভব করি। এইতো আমাদের প্রাণপ্রিয় সোনার ছেলে-মেয়েরা। যারা একদিন সোনার বাংলার স্বপ্নকে সফল করে তুলবে।

তবুও তোমাদের কাছে আমার একান্ত আবেদন। তোমরা পরিবারের সঙ্গে থেকো, স্বাস্থ্য সচেতন থেকো, পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয় পরিজনকে, সকলকে নিয়ে নিরাপদে থেকো। তোমাদেরকে এজন্য করোনা ঘাতকের কবলে পড়ে আক্রান্ত না হও, সেদিকে খেয়াল রেখো।

আর আমি তোমাদের সেদিনের জন্য ক্যাম্পাসে অপেক্ষা করবো, যেদিন করোনা মুক্ত এই বাংলাদেশে যেন সবাই ফিরে আসো এই সবুজ বনভূমিতে। “

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •