এম. মোস্তাক আহমদ


পবিত্র রমজানুল মোবারক মহান স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিশ্ব মানবগোষ্ঠির জন‍্য এক বিশেষ রহমত। এই মাস বিশ্ব মানবতার জন‍্য বিশ্বব‍্যাপী এক প্রশিক্ষণ কর্মশালা যা বিশ্বমানবের সামগ্রিক জীবনে সুখ -সম‍ৃদ্ধি ও শান্তির দিশা প্রদান করে। যার কোনো বিকল্প নেই। প্রতি বছর বিশ্ব মানবতার জন‍্য নির্ধারিত এই কর্মশালা মানবতার জাগতিক ও পারলৌকিক জীবনে সুখ, সম‍ৃদ্ধি ও শান্তির বার্তা বিশ্বব‍্যাপী ছড়িয়ে দেয়।রমজানুল মোবারক তার সত‍্যিকার অনুসারীদের পাপ পঙ্কিলমুক্ত নতুন ও সুন্দর জীবন উপহার দেয়। মানবতার কল‍্যাণে বিশ্বের সকল পর্যায়ের দায়িত্বশীলগণকে শ্রেনীভেদে নিম্নরূপ আহবান জানাচ্ছে। আসুন আমরা রমজানুল মোবারক কার প্রতি কি আহ্বান জানাচ্ছে জেনে নেই:

রমজানুল মোবারক বিশ্বনেতৃবৃন্দকে আহবান জানাচ্ছে, আপনি যদি সত‍্যি মানবতার কল‍্যান, সুখ-শান্তি কামনা করেন, কামনা করেন একটি কল‍্যাণকর বিশ্ব, তা হলে আপনার নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রসমুহে আল্লাহ্ পাকের আনুগত‍্যের পরিবেশ সৃষ্টি করুন। আপনি যদি স্বীয় নেতৃ্ত্বকে বর্তমান অস্থায়ী জগত ও স্থায়ী জগত তথা পরকালীন জীবনে স্বীয় আসন ধরে রাখতে চান, তবে স্বীয় রাষ্ট্রীয় আইন ও কাঠামোকে আল্লাহর ঘোষিত আইনের সাথে সাংঘর্ষিক না করে সামঞ্জস‍্যশীল করে প্রণয়ন করুন। অন‍্যথায় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে লাঞ্চনাকর ও লজ্জাজনক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। আপনি মানবমন্ডলীকে তাদের রবের সান্নিধ‍্য অর্জনে বাধ সাজার কাজ থেকে বিরত থাকুন এবং সত‍্য ও ইন্সাফের পরিবেশ স‍ৃষ্টি করুন।

মানবতার জীবিকান্বেষণের প্রধান বাহন হচ্ছে অর্থ। রমজানুল মোবারক বিশ্ব অর্থনীতিবিদগণকে আহবান জানাচ্ছে, আপনারা বিশ্ব অর্থনীতিকে মানুষের সামগ্রিক জীবনের কল‍্যাণে বর্তমানে প্রচলিত অত‍্যাচার ও নিপীড়নমুলক অর্থনীতি থেকে মুক্তি দিয়ে মহান আল্লাহ পাকের ঘোষিত সূদমুক্ত ও হালাল অর্থনীতি চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করে দিন।আল্লাহ পাকের আইন ও ঘোষণার সাথে সাংঘর্ষিক সূদ ভিত্তিক অর্থনীতি পরিহার করে সূদমুক্ত অর্থনীতি প্রণয়ন করে সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বের সর্বস্তরে মানবগোষ্ঠীর মধ‍্যে সুষমবণ্টনের নীতি প্রবর্তন করে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির ফোয়ারা বয়ে দিন। সূদের দুষ্ট ক্ষতে সৃষ্ট বিশ্ব মন্দার পথ চিরতরে বন্ধ করে দিন। মানুষ তার স্রষ্টাকে প্রাণভরে ডাকার সুযোগ পাক।

রমজানুল মোবারক আহবান জানাচ্ছে মহান আল্লাহ পাক বিশ্বভ্রমান্ডের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। বিচার দিবসের তিনিই মালিক। ইহজগতের যাবতীয় কর্মকান্ডের পুঙ্খানুপঙ্খ বিচার হবে তাঁরই আদালতে।জাগতিক জীবনের বিচারকদেরও জবাবদিহি তাঁরই নিকট করতে হবে।দুনিয়ার বিচারকমন্ডলী তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে বিচারকার্য সম্পাদন করবেন। বিশ্বের রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রসমুহের রাজা, বাদশাহ্, আমীর, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রজাসাধারণ সকলের জন‍্য বিচারকমন্ডলী ন‍্যায়দন্ডকে সমুন্বত রাখবেন। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র সমুহে শিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমনের তিনিই প্রধান নায়ক। মূলত শিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমনের এই মহৎ প্রক্রিয়া বিশ্ব শান্তি, সুখ-সমৃদ্ধি ও মানবাধিকারের প্রধান রক্ষাকবচ। বিচারকমন্ডলী যেন জাতি, রাষ্ট্র ও বিশ্বে সত‍্য,ন‍্যায় ও ইনসাফের মানদন্ডকে সমুন্নত রেখে বিশ্ব শান্তির গ‍্যারান্টি নিশ্চিত করেন। অন‍্যথায় মহান বিচারক আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর লাঞ্চনাময় শাস্তির মুখোমুখী হওয়ার জন‍্য প্রস্তুত থাকেন- যা অলঙ্গনীয়।

রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রসমুহের পার্লামেন্ট ও আইন প্রনেতাগণের প্রতি রমজানুল মোবারকের আহবান হচ্ছে, বিশ্ব পরিচালনার একচ্ছত্র মালিক হচ্ছেন মহান আল্লাহ।বিশ্ব পরিচালনার সুন্দর, সুপরিকল্পিত ও নিখুঁত আইনও তিনি বিশ্ববাসীর জ্ঞাতার্থে জানিয়ে দিয়েছেন। তাঁরই প্রনীত আইনের ভিত্তিতে বিশ্বকে পরিচালনা করা হলে বিশ্বব‍্যাপী শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধি বিরাজ করবে। তাই রাষ্ট্র ও বিশ্বের আইন প্রনেতাগণ যেন আল্লাহর আইনের বিধানাবলীর সাথে নিজেদের আইনকে সামঞ্জস‍্যশীল করে প্রণয়ন করেন। এমন কোনো আইন যেন তারা স্বীয় জনগণের উপর চাপিয়ে না দেন-যা মানুষকে মহান স্রষ্টা আল্লাহ্ পাকের আইনের বিপরীতে অবস্থান নিতে বাধ‍্য করে। ফলে রাষ্ট্র ও বিশ্বে ফাসাদ ও অরাজকতা সৃষ্টি হয়ে যায় এবং জমিন মানুষের বসবাসের অযোগ‍্য হয়ে পড়ে। আর মানুষ আল্লাহ্ পাকের রোষাণলে পড়ে হাজারো বিপদ, মুসিবত ও বর্তমান করোনভাইরাসের মত মহা দুর্যোগের শিকার হয়ে পড়ে- যার থেকে মুক্তির কোন শক্তি মানুষের নাই।

রমজানুল মোবারক মানবতার কল‍্যাণকামী সত‍্যের আহবানকারীদের পারষ্পরিক বিচ্ছিন্নতা ও অনৈক‍্য পরিহারের আহবান জানাচ্ছে। স‍ত‍্যনিষ্ট দলগুলো “আপনিই মোড়ল” মনোভব পরিহার করে অহমিকা বর্জন করে একান্ত দলীয় স্বার্থ ও ব‍্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান‍্য না দিয়ে অপরের স্বার্থ ও অধিকারকে সম্মান ও স্বীকার করে ত‍্যাগের মনোভাব ও উদারতা দিয়ে সুবিশাল ঐক‍্যের প্লাটফর্ম তৈরীতে প্রস্তুত থাকার বাস্তবমুখী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানাচ্ছে। সত‍্য, ন‍্যায়, ইনসাফ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মহান দায়িত্ব আনজাম দেয়া সত‍্যনিষ্ট দলগুলোর ঐক‍্যবদ্ধ প্রয়াস ছাড়া কখনো সম্ভব নয়, এ কথা সত‍্যনিষ্ট দলগুলো যত শীঘ্র উপলব্ধি করে তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে ততই বিশ্ব মানবতার কল‍্যাণ নিশ্চিত হবে।

বিশ্বব‍্যাপী হানাহানিতে ব্যস্ত জাতি, রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অনৈক‍্যের কারণে মানবতা আজ নিগৃহীত, লাঞ্চিতও অত‍্যাচারে জর্জরিত। রমজানুল মোবারক মিল্লাতের শতধা বিচ্ছিন্ন দল, জাতি ও রাষ্ট্রগুলোকে মজবুত সত‍্যনিষ্ট নেতৃত্বের অধীনে ইস্পাতদৃঢ়ভাবে ঐক‍্যবদ্ধ হয়ে মানবতার কল‍্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করে অভিষ্ঠ লক্ষ‍্যে পৌঁছার আহবান জানাচ্ছে।

রমজানুল মোবারকের শেষে বিশাল ঈদের জামাতে যেমন মানুষ ছোট-বড়, দোস্ত-দুশমন পারষ্পরিক ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ক্ষমার মনোভব নিয়ে এক কাতারে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে থাকে, সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে দল ও রাষ্ট্রগুলোক পারষ্পরিক ছোটত্ব বড়ত্ব অহংকার ও অহমিকা ভুলে গিয়ে একই নেতৃত্বের অধীনে দৃঢ় ঐক‍্যবদ্ধ প্রয়াসের আহবান জানাচ্ছে।

বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারের প্রশাসন বিভাগের প্রতি রমজানুল মোবারকের আহবান হচ্ছে – আইন ও আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখতে মূলত : সরকারও রাষ্ট্রের প্রশাসন বিভাগের ভূমিকাই মূখ‍্য।

প্রশাসন বিভাগই আইনের‍ ইমপ্লিমেন্টেসন করে থাকে। মানবমন্ডলী রমজানের কর্মসূচি বাস্তবায়নে যেন কোন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন না হন, সেই লক্ষ‍্যে প্রশাসনের শাসন ও শৃঙ্খলা বিধিমালা যেন রমজানের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত শৃঙ্খলা ও নিয়ম কানুনের সাথে সামঞ্জস‍্যশীল করে নেন। যাতে মানুষ মহান আল্লাহ্ পাকের নিকট স্বীয় কৃতকর্মের অনুশোচনা পূর্বক তাঁর বিশেষ রহমত,মাগফেরাত ও নাজাত প্রাপ্তির সৌভাগ‍্য অর্জন করে এবং বর্তমানে বিশ্বব‍্যাপী সংক্রমিত “ভাইরাস” থেকে মুক্তি পেয়ে আসন্ন নিচ্ছিত বিশ্বমন্দার ধকল কাটিয়ে উঠ্তে পারে। আল্লাহ্ পাক বিশ্ববাসীকে “রমজানের আহবানে সাড়া দেয়ার ও তা বাস্তবায়নের সুমতি, স‍ৎসাহস,তৌফিক ও যোগ‍্যতা দান করুন। আমীন।

 

লেখক :  এম. মোস্তাক আহমদ ,গবেষক ও আহবায়ক ,আল কুরআন রিচার্স সেন্টার, বাংলাদেশ ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •