Sayeed Ibrahim Ahmed

Senior Lecturer in Finance, AIUB. 

 

একটি আবদ্ধ অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ জাতীয় জীবনে কী প্রভাব ফেলে ?

একটি উদীয়মান বাজারের আর্থসামাজিক দিক যেমন- ঘনবসতিপূর্ণ শহর, একটি বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাত, জনসংখ্যার শ্রেণীবিভাজন ইত্যাদি কারণে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার উপর জোর দিয়ে মহামারী নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ও ইচ্ছা একটি প্রশ্নবিদ্ধ ব্যাপার।

একটি দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা খাত ও ঢিলেঢালা লকডাউনের ফলে তুলনামূলকভাবে বিশাল সংখ্যক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হতে পারে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও সে অনুপাতে বাড়তে পারে। বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির কারণে সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশংকাও বিদ্যমান।

একইসাথে উন্নত বিশ্বের চাইতে উন্নয়নশীল বিশ্বে প্যান্ডেমিকের সময় আর্থিক খাত ও রাজস্ব খাতে প্রণোদনার কার্যকারীতা কম। ঋণের স্থায়ীত্বকরণ ও ব্যাপক মূদ্রা অবমূল্যায়ন ব্যতীত রাজস্ব খাতের প্রণোদনার কার্যকারীতা সীমিত, যদিও এটা দেশভেদে ভিন্ন।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মাত্র ১৫% লোক দৈনিক ৬ ডলারের উপরে আয় করে এবং ৯০% এর বেশি কর্মশক্তি অনানুষ্ঠানিক খাতের সাথে জড়িত। ২৬ মার্চ দেশজুড়ে লকডাউনের সাথে সাথে লক্ষ লক্ষ রিকশাওয়ালা, দিনমজুর, কারখানা শ্রমিক ঢাকাকে খালি করে গ্রামে ছুটে গেছে।
কিন্তু একটি আবদ্ধ অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ জাতীয় উন্নয়নে কীভাবে প্রভাব ফেলে? সময়োচিত এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি যেকোন সময় মন্দার কবলে পড়তে পারে। সীমিত তথ্য উপাত্তের উপর ভিত্তি করেও বলা যায়, বাংলাদেশ একটি অপ্রত্যাশিত মন্দার সামনে পড়তে যাচ্ছে।
জিডিপিতে মাত্র ৯.৩% এর মতো নিম্ন‘কর-জিডিপি অনুপাত’ দিয়েবাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বড় ধরণের রাজস্ব প্রণোদনা দেয়ার সুযোগ নেই। এমতাবস্থায় একমাত্র সমাধান হচ্ছে আর্থিক সম্প্রসারণ যা ইতোমধ্যেই উন্নত অর্থনীতিগুলোতে চালু হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারও একই রকম আর্থিক সম্প্রসারণ নীতি গ্রহণ করার চেষ্টা করছে যদিও এর কার্যকারীতা কতটুকু তা সময়ই বলে দেবে। ইউরোজোনের বেশিরভাগ দেশ আক্রান্ত হওয়ায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে জুলাই, ২০১৯ এর তুলনায়, ফেব্রুয়ারি, ২০২০ এ রপ্তানী প্রায় ৪.৮% হ্রাস পেয়েছে।
এমনকি কোভিড-১৯ এর আগেও ক্রমহ্রাসমান চাহিদা এবং অতিমূল্যায়িত স্থানীয় মূদ্রার কারণে দেশীয় রপ্তানিকারকরা বাজার হারাচ্ছিলেন। বাংলাদেশের মোট রপ্তানীর ৭২% যায় মাত্র দশটি জায়গায় যার ৯০% হচ্ছে তৈরি পোশাক ও অ্যাপারেল খাত।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানীর ৫৮% যায় যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স এবং ইতালিতে যাদের অর্থনীতি এই প্যান্ডেমিকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দেশসমূহ হয় তাদের ক্রয়াদেশ বাতিল করছে অথবা স্থগিত করছে।
এ যাবৎ ১.৮ বিলিয়ন ডলারের ক্রয়াদেশ স্থগিত ও ১.৪ বিলিয়ন ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল করা হয়েছে যা এপ্রিল-ডিসেম্বর, ২০২০ সময়কালের মধ্যে ডেলিভারি দেয়ার কথা ছিল। এই বাতিল ও স্থগিত ক্রয়াদেশের পরিমাণ ৯ মাসের মোট রপ্তানির ১০.৯%।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত রেমিট্যান্স আয় মার্চ, ২০২০ এ বিগত বছরের তুলনায় ১১.৬% কমে গেছে। সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এ পাঁচটি শীর্ষ রেমিট্যান্স পাঠানো দেশের অবদান মোট রেমিট্যান্সের ৬৩%। এর প্রত্যেকটা দেশই হয় লকডাউন অথবা তেলের দরপতনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এছাড়া সম্ভাব্য ছাঁটাই কিংবা বেতন কর্তনের ফলেও রেমিট্যান্স আয় হুমকিতে পড়তে পারে। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের সময়কালে মোট ১ কোটি প্রবাসীর মধ্যে ১০ লাখ প্রবাসী দেশে দেশে ফেরত এসেছে। বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০% অবনমন ধরা হলে, মার্চ-জুন, ২০২০ এই চার মাসে বাংলাদেশ ১.৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স হারাতে পারে যা জিডিপির ০.৬%।
একমাত্র ইতিবাচক ব্যাপার হচ্ছে তেলের মূল্যহ্রাস। ২২ এপ্রিল, মঙ্গলবার ব্যারেল্প্রতি তেলের দাম মাইনাস ৩৭.৬৩ ডলারে নেমে গিয়েছিল। ঋণাত্মক দামের অর্থ হলো তেল রপ্তানীকারক দেশসমূহের তেল মজুদ করে রাখতে যা খরচ হয় তার চেয়ে মজুদ খালি করে ফেলতে পারলে খরচ কম হয়।
বাংলাদেশ যদি এর আমদানী অংশীদারদের সাথে দর কষাকষি করতে পারে তাহলে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সাশ্রয় করতে পারবে কারণ, বাংলাদেশের মোট আমদানীর ১২% (৫৫.৬ বিলিয়ন ডলার) খরচ হয় শুধু তেল আমদানীতে। যদিও সূত্র বলছে দেশে অতিরিক্ত মাত্র ৫০ দিনের তেল মজুদ করে রাখার সুযোগ আছে, তবুও এটা বিনিময় ভারসাম্যের উপর চাপ কমাবে।
বিদেশী বিনিয়োগ, রাজস্ব আয় এবং সরকারী মেগা প্রকল্পের খরচ সংকোচনের আশংকা রয়েছে যা চলতি হিসাবের ঘাটতি ১.২% বাড়াতে পারে। কর্পোরেশনগুলোর বেতন কর্তন, সুদ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া এবং শ্রমিক ছাঁটাই ইত্যাদি প্রণোদনা প্যাকেজ সমূহ বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি চাপে ফেলবে।

ঋণ পরিশোধ ও আমানত সংগ্রহের হার কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়তে পারে। মার্চ থেকে জুন সময়কালের বেসরকারী খাতের ক্রেডিট বিগত বছরের তুলনায় ৫-৬% কমতে পারে। বাধ্যতামূলক ক্যাশ রিজার্ভ (CRR) এর পরিমাণ ১% কমালে ব্যাংকিং খাতে প্রায় ১৩০০ কোটি টাকার তারল্য বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংককে অগ্রিম আমানতের হার শিথিল করতে হবে। যেহেতু বেশিরভাগ কর্পোরেশনগুলো এই ক্ষেত্রে সহায়তা দিতে পারবে না, দাতা সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি এর কাছে সহায়তা চাওয়া যেতে পারে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক এর ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ সক্ষমতা থেকে বাংলাদেশ যথাক্রমে ৭০০ মিলিয়ন ডলার এবং ১০০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা পেতে পারে।

যদি পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিমাণগত সহজীকরণের মাধ্যমে টাকার সরবরাহ বাড়াতে পারে এবং সরকার প্রণোদনানির্ভর রাজস্বনীতির আওতায় একটি সার্বজনীন মৌলিক আয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা থাকা সত্বেও ১৬ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে এই প্রণোদনা সরাসরি বিতরণ করা প্রশ্নসাপেক্ষ কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের অবনমন অনিবার্য।
জিডিপির ৭% বাজেট ঘাটতি ধরে নিলে এসব পদক্ষেপ আদৌ অর্থনৈতিকভাবে কোন ফল বয়ে আনবে কিনা সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবুও, দক্ষতার সাথে এই প্যান্ডেমিক মোকাবেলা করা গেলে এর দীর্ঘকালীন ফলাফল অর্থনীতিকে আবার সুবিধাজনক অবস্থায় নিয়ে যাবে যেটা হবে ভবিষ্যতের “নতুন স্বাভাবিকতা”

ইংরেজি থেকে ভাষান্তরঃ Rashed Rahgir, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Graph: The arrow will point up again BIGSTOCK
মূল কলামঃ https://bit.ly/35YdSCt

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •