আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
করোনাভাইরাসের চিকিৎসা খুঁজে পেতে বিশ্ব যখন ব্যস্ত তখন জাপান দেশটির একটি পুরনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আশা জাগাচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে এই ওষুধটির প্রশংসা করে উৎপাদনের জন্য ১২৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সরকারি তহবিল সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন।

তবে করোনার চিকিৎসার জন্য দেশটির এটিই একমাত্র সম্ভাব্য ওষুধ নয়। ওসাকাভিত্তিক ওনো ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির ৩৫ বছরের পুরোনো আরেকটি ওষুধ করোনার চিকিৎসায় জাপানি বিজ্ঞানীদের নজর কেড়েছে।

অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের (প্যানক্রিয়াটাইটিস) চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্যামোস্ট্যাট নামের এই ওষুধটি করোনা রোগীদের প্রয়োগে ইতিবাচক ফল পাওয়ার পর দেশটির সরকার এটি নিয়েও চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। বিশ্বজুড়ে কয়েকডজন ওষুধ ও ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলছে; সেই তালিকায় আছে জাপানি এ দুই ওষুধ।

জাপানি প্রধানমন্ত্রীর মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের ব্যাপারে প্রশংসা করেছেন। মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি গিলিয়াড সায়েন্সের তৈরিকৃত রেমডেসিভিরের পরীক্ষায় করোনা রোগীরা দ্রুত সেড়ে উঠছেন বলে জানানোর পর জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রে জরুরি মুহূর্তে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় এই ওষুধটি প্রয়োগের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

মৃত্যুর হার কমাতে তেমন কোনও ভূমিকা না রাখতে পারলেও রেমডেসিভির হাসপাতালে করোনা রোগীর অবস্থানের সময় কমিয়ে আনছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা। গত মার্চে অ্যাভিগানের প্রতি চিকিৎসকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়, যখন চীনা এক কর্মকর্তা বলেন, এই ওষুধটি প্রয়োগে কোভিড-১৯ রোগীদের দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে সহায়তা করেছে।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাপানি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধটির ১৪টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। এসব ট্রায়ালের ফল চলতির মাসের শেষের দিকে আসার কথা রয়েছে। কার্যকর ফল এলেই অ্যাভিগানের অনুমোদন দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিনজো অ্যাবে। নজিরবিহীন গতিতে ওষুধটি অনুমোদন পেতে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।

ওষুধটি পেতে বিশ্বের অন্তত ৪৩টি দেশ জাপানকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে। শিনজো অ্যাবের প্রশাসন এসব দেশকে ওষুধটি বিনামূল্যে সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অ্যাভিগানের উৎপাদনকারী কোম্পানি ফুজিফিল্মের চেয়ারম্যান শিগেতাকা কোমোরি অ্যাবের দীর্ঘদিনের সমর্থক। দেশটির সরকার অ্যাভিগানের প্রমোশন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এই অভিযোগের ব্যাপারে জাপানের মন্ত্রিসভা সরকারের সঙ্গে ফুজিফিল্মের সম্পর্কের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ফুজিফিল্মের মুখপাত্র কানা মাটসুমোতো বলেছেন, অ্যাভিগান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেবেন চিকিৎসকরা। ওষুধটির অনুমোদন মেডিক্যাল এবং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং বিশেষ কোনও কোম্পানির সঙ্গে অ্যাভিগানের ব্যবহারের কোনও সম্পর্ক নেই।

অ্যাভিগানের জেনেরিক নাম ফাভিপিরাভির। ১৯৯০ সালে জাপানের একটি কোম্পানি অ্যান্টিভাইরাল এই ওষুধটি তৈরি করে। পরে আলোকচিত্র ব্যবসাখাত থেকে স্বাস্থ্যসেবার দিকে সরে আসা ফুজিফিল্ম কর্তৃপক্ষ ওষুধটির স্বত্ব কিনে নেয়। ওষুধটি ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো নির্দিষ্ট আরএনএ ভাইরাসগুলোর প্রতিলিপি তৈরির প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়।

অ্যাভিগান সেবন করা যায়, যা গিলিয়াডের রেমডেসিভিরের চেয়ে বেশি সহজলভ্য হবে। বেশ কয়েকটি ভাইরাসের বিরুদ্ধে এই ওষুধটির প্রয়োগ চালানোর পর ২০১৪ সালে জাপান চূড়ান্তভাবে অ্যাভিগানের অনুমোদন দেয়। তবে ওষুধটি শুধুমাত্র ফ্লুবাহিত মহামারির সময় জরুরি মুহূর্তে ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। ওষুধটির লাইসেন্স এবং প্যাটেন্ট চীনে করা হয়।

অন্যদিকে, ক্লিনিক্যালি প্রমাণিত না হলেও জাপানের ওনো ফার্মাসিউটিক্যালসের ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত ক্যামোস্ট্যাট। যা মূলত প্রাথমিকভাবে প্যানিক্রিয়াটাইটিস এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। তবে অতীতে সার্স-কোভ-১ ভাইরাসের বিরুদ্ধে ল্যাবরেটরি এবং প্রাণীর দেহে প্রয়োগে ওষুধটি অ্যান্টিভাইরাল কাজ করছে বলে দেখা যায়।

গত মার্চে বিজ্ঞান সাময়িকী সেলে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, ফুসফুসে করোনাভাইরাস প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় একটি এনজাইমকে আটকে দেয় ক্যামোস্ট্যাট। এরপরই করোনার চিকিৎসায় এই ওষুধটি নিয়ে আশা দেখেন গবেষকরা।

এই গবেষকদের একজন ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক চিকিৎসক জোসেফ ভিনেৎজ। করোনার চিকিৎসায় ক্যামোস্ট্যাটের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। জোসেফ বলেন, ওষুধটির ৩৫ বছরের ট্র্যাক রেকর্ড রয়েছে। যে কারণে এটি খুবই নিরাপদ ওষুধ হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। আমি বলেছি, আমরা একটা চেষ্টা করার জন্য ওষুধটি পেয়েছি। আমি একজন চিকিৎসক। মানুষকে সুস্থ করে তোলার জন্য আমরা মরিয়া হয়ে আছি।

এই ওষুধটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগের ব্যয় বহনে তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, এই ওষুধটি আরও একমাস আগে ট্রায়াল করা দরকার ছিল। এবং আমরা একমাসের মধ্যেই চূড়ান্ত ফল পেতে পারি।

জাপানে ক্যামোস্ট্যাটের বাণিজ্যিক নাম ফইপ্যান। ১৯৮৫ সালে ক্রনিক প্যানিক্রিয়াটাইটিসের চিকিৎসায় ওষুধটির ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে জাপান এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের জন্য ওষুধটি সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ওনো ফার্মাসিউটিক্যালসের মুখপাত্র ইউকিও তানি।

গত এপ্রিলে এই ওষুধটির পরীক্ষা চালানো হয় ইসরায়েলে। দেশটির সেবা মেডিক্যাল সেন্টারে ১৪ জন করোনা রোগীকে ক্যামোস্ট্যাট প্রয়োগ করা হয়। আরেক দফায় ওষুধটির প্রয়োগের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের সেবা মেডিক্যাল সেন্টারের কর্মকর্তা আইজ্যাক লেভি।

মানব কোষে ভাইরাসের প্রবেশে ক্যামোস্ট্যাট বাধা দেয় কিনা সেটি জানতে ইউনিভার্সিটি অব কেন্টাকিতে ওষুধটির পরীক্ষা চালানো হয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •