শাহীন মাহমুদ রাসেল

সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের আপন, প্রিয় পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। আমরা শুধু ‘চাই, আরো চাই’। দেশের সাথে দেশের লড়াই, জাতির সাথে জাতির। নিজেকে বড় করার প্রবল ইচ্ছাই আমাদের শেষ করে দিচ্ছে। নানান মরণঘাতী অস্ত্র। যে কোনো মুহূর্তে এক নিমিষেই নিঃশেষ করে দিতে পারে মানব সভ্যতা। আধিপত্য বিস্তারে জল, স্থলসহ ভূমণ্ডলের সব জায়গা দাম্ভিকতা, কঠোরতা। অত্যাচার দেখতে দেখতে প্রকৃতি নিজের সহ্য ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

কিন্তু আপনি যদি এখন আকাশের দিকে তাকান তাহলে একে উজ্জ্বল দেখতে পাবেন না। আর নগরীর উঁচু ভবনের মাঝ থেকে আকাশ দেখা রীতিমতো দুষ্কর! বায়ুর কথা তো সবারই জানা। ঠিকভাবে প্রাণ খুলে কবে নিঃশ্বাস নিয়েছিলেন মনে পড়ে? ঠিক একইভাবে সূর্য আমাদের এখন আর মন্ত্রণা দেয় না, চাঁদও হাসতে শেখায় না। কারণ বর্তমান দুনিয়ার কেউ চাঁদ দেখার অবকাশ পায় না। মোবাইল-ল্যাপটপ আর নিত্য নতুন প্রযুক্তির ভিড়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার সুযোগও মেলে না সবার।

এই যে, এতো শত পরিবর্তন এসব কিন্তু একদিনে হয়নি। এ গল্প একবছর বা এক যুগেরও না। হাজার হাজার বছরে পরিবর্তন এসেছে। মানুষ প্রকৃতির সাথে নিষ্টুর থেকেও নিষ্টুরতম আচারণ করেছে। আকাশ, মাটি, পানি, গাছ, প্রাণী সব কিছুর ওপর চলছে অত্যাচার। আর প্রকৃতি শত, সহস্র বছর এসব অত্যাচার সইতে সইতে হয়তো এখন হাফিয়ে উঠেছে। তাই সেও একটু শ্বাস নিতে চাইছে, হাফ ছেড়ে বাঁচতে চাইছে!

যারা ফোন, কম্পিউটার বা ট্যাবের মতো জিনিস ব্যবহার করেন তারা কাজের সময় কিছুটা সচলভাবে এ ডিভাইজগুলো ব্যবহারের জন্য মাঝে মাঝে রিস্টার্ট করে থাকেন। করোনার কালে প্রকৃতিও মানব সভ্যতাকেও একটি প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাইছে ‘মানুষেরা থামো’! এখনও সময় আছে, যথেষ্ট হয়েছে।

করোনাভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাব থেকে মানবসভ্যতা মুক্তি পাবে ঠিকই; কিন্তু স্বাভাবিক পৃথিবীতে তারা যদি দাম্ভিকতা, স্বেচ্ছাচারিতা আর ধ্বংসের খেলা বন্ধ করতে না পারে তাহলে সামনে আরো খারাপ সময় দেখতে হতে পারে।

‘ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ’ ছোটকাল থেকে কতোবার আমরা এ কথা শুনেছি! কিন্তু আপনি কতোগুলো ঋতু দেখেছেন? যদি সত্যিকার অর্থে বলতে যাই, ভিন্ন ভিন্ন রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে পালাক্রমে আসা ছয়ঋতুর স্বাদ এখন আর আমরা পাই না। প্রতিটি ঋতুরই স্বতন্ত্র সৌন্দর্য ছিলো। বাংলাদেশের প্রকৃতি চির সজীব, চির বৈচিত্র্যময়। এমন অপরূপ বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিও দিনকে দিন পাল্টে যাচ্ছে। গরমের সময় অতিরিক্ত গরম। শীতের সময় মাত্রাতিরিক্ত শীত। আবার শীতের সময় পেরিয়ে গেলেও দেখা মেলে না গ্রীষ্মের। বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনের চিত্র আরো খারাপ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ঝুঁকি প্রবণ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় বিপদের পরিমাণ দিনকে দিন বাড়ছেই। দ্রুত বরফ গলছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

আমরা এখন হাজার কোটি টাকা খরচ করে অন্য গ্রহে গিয়ে অনুসন্ধান করছি ঠিকই কিন্তু নিজেদের বাসস্থান নিজেরাই ধ্বংস করছি। মানুষ আজ চাঁদে পৌঁছেছে, মঙ্গলে গিয়েছে কিন্তু পৃথিবীকে রীতিমতো অবহেলাই করছে। এখনই পরিবর্তন না আনতে পারলে কোটি কোটি মানুষ জলের তলায় হারিয়ে যাবে। বিশ্বের নামকরা সব দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে।

ধারণা করা হচ্ছে চোরাই পথে চীনে পাচার হওয়া মালয় প্রজাতির বনরুইয়ের মাধ্যমে মানব দেহে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। এই বনরুই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি চোরাই পথে পাচার হওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে একটি।

ভাবুন তো, আমরা কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। একটি প্রাণী যেখানে আমাদের থেকে রক্ষা পায় না! চোরাই পথে হলেও আমরা এক ভক্ষণ করছি। শেষ্ট্রত্ব জাহিলের এক উন্মাদনা আমাদের সব সময় তাড়া করে চলছে!

ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস এখনই মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তা না হলে প্রকৃতির আরো খারাপ রূপ দেখতে হবে সামনে। পোপের বক্তব্য, ‘করোনাভাইরাস বিশ্বে উৎপাদন এবং ভোগের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। এটা প্রকৃতিকে বুঝতে শেখাচ্ছে। আমরা আংশিক দুর্যোগকে পাত্তা দিইনি।’

মানব শিশু যখন মায়ের কোলে থাকে তখন এটিকে বলা হয় বিশ্বে তার সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। কিন্তু আমরা এমন এক অভিশাপের মধ্যে পড়েছি যেখানে মা চাইলেই তার সন্তানকে কোলে নিতে পারেন না। স্বামী-স্ত্রীকে ভালোবাসতে পারছে না, ভাইকে সহানুভূতি দেখাতে পারছে না বোন। যেই প্রাণঘাতি করোনা আক্রান্ত হচ্ছেনা কেন তার কাছ থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে পরিবারের অন্য সদস্যদের। একদিকে আতঙ্ক, অন্যদিকে মৃত্যুভয় দেখিয়ে প্রকৃতি আমাদের আবারো চোখ রাঙ্গিয়ে শাসন করেছে।

এর আগে মানুষ মহামারির নানান রূপ দেখেছে। যখনই প্রকৃতি সহ্য ক্ষমতা হারিয়েছে তখনই হিংস্র হয়ে উঠেছে। কেড়ে নিয়েছে শত কোটি মানুষের প্রাণ! দিনের পর দিন প্রকৃতির জায়গা ছেড়ে দিয়ে ঘরে বন্দি থেকেছে মানুষ।

কয়েক হাজার বছর আগের পৃথিবী শাসন করা মিসরের ফারাওয়দের অবিকৃত মমির গায়েও গুটিবসন্তের চিহ্ন মিলেছে। গোটা পৃথিবী শাসন করা এসব শাসকদেরও হার মানতে হয়েছিল মহামারির কাছে। সেসব এখন ইতিহাস।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের আবির্ভাবে ভালোবাসা, সম্প্রীতি, আবেগ, অনুভূতি সব পালিয়েছে। এ সমস্যায় নিরাপত্তার জন্য নানান ধরনের নিয়মনীতি বেঁধে দিয়েছে রাষ্ট্র। আর প্রাণের ভয়ে মানুষও যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সরকারের নির্দেশনা মেনে ঘরে থাকার।

এ সুযোগে আবার সবুজ হয়ে উঠছে প্রকৃতি। খালগুলোতে ভাসছে রাজহংস। সমুদ্রসৈকতে নির্বিঘ্নে ডিম পাড়ছে কাচ্ছিমের দল। নিশ্চিন্তে খেলছে ডলফিন। হরিণেরা শহরের প্রধান সড়কে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মানুষের ঘরে উঁকি দিচ্ছে। আর মানুষ বদ্ধ ঘরে সময় কাটাচ্ছে, ভালো হওয়ার প্রতিজ্ঞায়!

সাংবাদিক কক্সবাজার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •