মোহাম্মদ শাহজাহান

এক।

জাতিসংঘের ভাষ্যমতে, রোহিঙ্গারা দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত একটি জনগোষ্ঠি। এই মানুষগুলো মায়ানমারের বর্ণবাদী সরকার, সেনাবাহিনী আর ভিন্ন জনগোষ্ঠির দ্বারা যুগে যুগে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত হয়ে আছেন এই জনগোষ্ঠির সিংহভাগ মানুষ। বাংলাদেশ ছাড়াও মালয়েশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছেন অনেক রোহিঙ্গা। মালয়েশিয়াকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য স্বর্গ মনে করা হতো ক’দিন আগেও। অথচ, সম্প্রতি খোদ এই মালয়েশিয়াতেই নানারূপ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন রোহিঙ্গারা। মালয়েশিয়া সরকার কিছুদিন আগে রোহিঙ্গা শরণার্থী বহনকারী কয়েকটি বোট সেদেশের জলসীমায় প্রবেশ করতে না দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে। মালয়েশিয়া প্রবেশে ব্যর্থ হয়ে এই রোহিঙ্গারা সাগর পথে বঙ্গোপসাগরের উপকন্ঠে এসে বাংলাদেশ ভূখন্ডে প্রবেশ করতে চাওয়ায় নানা কান্ড ঘটেছে ও ঘটছে এখানেও। মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের ইতোপূর্বে সাদরে বরণ করা হলেও এখন আর সে অবস্থা আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু কারণ কী?

দুই।

মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের সাম্প্রতিক অনাদরের প্রধান কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গারা সম্প্রতি সেই দেশের নাগরিকত্ব দাবী করেছেন; এই দাবীকে মালয়েশিয়ার সরকার ও জনগণের একাংশ খুব নেতিবাচকভাবে নিয়েছেন; মালয়েশিয়ার গণমাধ্যম ও সোশাল মিডিয়াতে রোহিঙ্গা-বিরোধী প্রচার-প্রচারণাসহ Hate Speech এর সুনামি বয়ে চলেছে; গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিছু রোহিঙ্গাকে; মালয়েশিয়ানদের হাতে অপদস্থ আর প্রহৃতও হচ্ছেন রোহিঙ্গারা। তো, রোহিঙ্গারা কি আসলেই মালয়েশিয়ায় নাগরিকত্ব দাবী করেছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজ করার আগে নিচে উল্লেখিত পত্রিকাগুলোর খবরের শিরোনামে ক্লিক করে ওখানে রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থা জানার চেষ্টা করা যাক একবার।

THE STRAITS TIMES পত্রিকার শিরোনাম- ROHINGYAS FACE RISING HOSTILITY IN MALAYASIA 

THE STAR পত্রিকার শিরোনাম- PLEASE DON’T HATE US

 

তিন।

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গারা আসলেই সেদেশের নাগরিকত্ব দাবী করেছেন কিনা জানতে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত কিছু সচেতন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা জানালেন, প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দাবীর মতো কোন ঘটনাই ঘটেনি মালয়েশিয়ায়। তবে ওখানকার রোহিঙ্গাদের Myanmar Ethnic Rohingya Human Rights Organization (MERHROM) নামের একটি সংগঠন মালয়েশিয়া সরকারের নিকট ওখানে কর্মরত রোহিঙ্গা শ্রমিকদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি আর রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির আহবান জানিয়েছিল। ব্যাপারটি মালয়েশিয়ার কিছু নাগরিক সহজভাবে নেননি। তাছাড়া, মালয়েশিয়ার মূলধারার গণমাধ্যমে এ সংক্রান্তে অনুসন্ধান করে জানা গেলো, সমস্যাটির মূলে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত পূর্বোক্ত Myanmar Ethnic Rohingya Human Rights Organization (MERHROM) নামের রোহিঙ্গা সংগঠন কর্তৃক মালয়েশীয় সরকারের নিকট রোহিঙ্গা শ্রমিকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা ও রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির আহবান ও তা নিয়ে মালয়েশীয় নাগরিকদের একাংশের তীব্র বিরুপ প্রতিক্রিয়া। দ্বিতীয়ত রোহিঙ্গাদের করোনা ভাইরাস বহনকারী ভেবে আতঙ্ক। তৃতীয়ত মালয়েশিয়ার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার কেলাং নামের একটি পাইকারী বাজারে  রোহিঙ্গা শ্রমিকদের সংখ্যাধিক্যের কারণে রোহিঙ্গা কর্তৃক শ্রম-বাজার দখল হয়ে যাওয়ার ধারণা। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে নিচের লিঙ্কগুলো দেখে নেয়া যেতে পারে।

THE GUARDIAN পত্রিকার শিরোনাম- MALAYASIA CITES COVID-19 FOR ROUNDING UP ROHINGYAS  

 

 

CILISOS.MY পোর্টালের প্রতিবেদন- DID ROHINGYAS ACTUALLY ASK FOR MALAYASIAN CITIZENSHIP?  

চার।

প্রকৃত সত্য হলো, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গারা সেদেশের নাগরিকত্ব দাবী করেননি। তবুও মালয়েশিয়ার সোশাল মিডিয়াতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে  মাতামাতি চলছে। এর আঁচ বাংলাদেশের সোশাল মিডিয়াতেও লাগতে শুরু করেছে। অবশ্য, এখানকার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভারে ন্যুব্জ আমরা। মরার উপর খাড়ার ঘা’র ন্যায় সীমিত সংখ্যক কিছু দুর্বৃত্ত রোহিঙ্গার মাদক পাচার ও ডাকাতিসহ নানারূপ অপরাধের সাথে সম্পৃক্ততা আতঙ্কিত করে আমাদের।

করোনাকালের সমাপ্তি ঘটুক আর রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন শুরু হোক অচিরেই।

 

 

মোহাম্মদ শাহজাহানঃ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। মুঠোফোন-০১৮২৭৬৫৬৮১৬       

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •