আবুল ইরফান আজিজুল হক

 

তাফসীরে মাআরিফুল কুরআনে মুফতি শফী র. বলছেন, ‘সবর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সংযম অবলম্বন ও নফস এর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করা। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় এ ‘সবর’ এর রয়েছে তিনটি শাখা। এক. নফসকে সকল প্রকার হারাম এবং নাজায়েয বিষয়াদি থেকে বিরত রাখা, দুই. নফসকে আল্লাহর এবাদত ও আনুগত্যে বাধ্য করা, তিন. যেকোন বিপদ ও সংকটে ধৈর্যধারণ করা। অর্থাৎ যেসকল বিপদাপদ এসে উপস্থিত হয়, সেগুলোকে আল্লাহর বিধান বলে মেনে নেওয়া এবং এর বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান প্রাপ্তির আশা করা।

একজন মুসলিমকে ঈমান ও ইসলামের উপর অটল অবিচল থাকতে হলে সবরের উপরোক্ত তিনটি শাখার উপর তাকে অবশ্যই আমল করতে হবে। সাধারন মানুষের ধারণায় সাধারণতঃ ৩য় শাখা তথা বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করাকেই সবর হিসাবে গণ্য করা হয়। ‘সবর’ এর প্রথম দু’টি শাখা তথা সকল প্রকার হারাম ও নাজায়েয বিষয়াদি থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এবং নফসের অসনস্তুষ্টি স্বত্ত্বেও নিজেকে আল্লাহর এবাদতে নিয়োজিত রাখা মুসলিম জীবনে যে, সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, তা মোটেও লক্ষ্য করা হয়না। অথচ কুরআন হাদীসের পরিভাষায় সাবের বা ধৈর্যধারণকারী সেসব লোককেই বলা হয়েছে, যারা উপরোক্ত তিন প্রকার ‘সবর’ অবলম্বন করে। আল্লাহ বলেন, يا ايها الذين آمنوا استعينوا بالصبر والصلواة، ان الله مع الصابرين. অর্থাৎ হে মু’মিনগণ! তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থণা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সাবের তথা ধৈর্যশীলগণের সাইে রয়েছেন। আল্লাহ অন্যত্র বলেন, انما يوفى الصابرون اجرهم بغير حساب. অর্থাৎ সবরকারী Ÿান্দাহগণকে তাদের পুরস্কার বিনা হিসাবে প্রদান করা হবে। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ সবরকারী লোক দ্বারা তাদেরকেই বুঝিয়েছেন, যারা ‘সবর’ এর তিন শাখাতেই যথাযথ আমল করে জীবন অতিবাহিত করেছেন।

মানব জাতিসহ সৃষ্টিকুলের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা আল-ইসলাম। সমগ্র সৃষ্টির কল্যাণ সাধনই হল ইসলামের প্রধানতম উদ্দেশ্য। এ মহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য মানব সমাজে সবর এর উক্ত তিন শাখাতেই অনুশীলন অপরিহার্য। যাতে করে মানুষ হত্যা-লুণ্ঠণ, যেনা-ব্যাভিচার, লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, অনাচার-অত্যাচার ইত্যাদি গর্হিত কাজ পরিত্যাগ করে সত্য ও সুন্দরের পথে ধাবিত হতে পারে। এ লক্ষ্যেই প্রতি বছর সবর ও আত্মশুদ্ধির আহবান নিয়ে বিশ্ব মানবের দ্বারে হাযির হয় মাহে রমযান। এ মাস সবর ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের প্রশিক্ষণের মাস। রমযান Ñ মানে জ্বালিয়ে দেওয়া, পুড়িয়ে ফেলা। মিশকাত শরীফে হযরত সালমান ফারেসী র. থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে দেখা যায়, মহানবী স. রমজানকে شهر الصبر বা সবরের মাস বলে আখ্যায়িত করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে এক মাসের সিয়াম সাধনা মানুষের সারা বছরের নানাবিধ গর্হিত ও নাজায়েয কাজ, পার্থিব ঝুট ঝামেলা ও প্রবৃত্তির নানা লোভ-লালসার মোহে আচ্ছন্ন যাবতীয় কুচিন্তা, শয়তানী ওয়াস্ওয়াসা, সকল পাপাচারমূলক আচরণ ও এর অনুভূতিকে পুড়িয়ে ফেলার এক কার্যকর অনুশীলন। শরীয়তের যাবতীয় বিধি-বিধান মেনে আন্তরিকতার সাথে মাস ব্যাপী এ সিয়াম সাধনা দ্বারা একজন ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে তার পাশবিক প্রবৃত্তিকে সংযত ও অবদমিত করতে এবং আত্মিক শক্তিকে জাগ্রত ও বিকশিত করতে সক্ষম হয়।

রমজানের সিয়াম ‘সবর’ এর উল্লিখিত তিন শাখার উপরই মানুষকে অভ্যস্থ বানায় বলে সে অনেক সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও কিংবা নির্জনে পানাহার বা ইন্দ্রিয়তৃপ্তির মত সিয়ামের পরিপন্থী আচরণের সুযোগ পেয়েও তেমন আচরণের সাহস করেনা। কেননা তার বিশ্বাস, সে সর্বত্র-সর্বদা আল্লাহর দৃষ্টিসীমার মধ্যেই রয়েছে। কোন হারাম ও নাজায়েয কাজে লিপ্ত হলে বা তাঁর আদেশ লংঘনে তিনি শাস্তি দিতে পারেন। তাই আল্লাহর আদেশ লংঘনের দুঃসাহস সে দেখায়না। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মানুষকে সংযত বানানোর ক্ষেত্রে সিয়াম সাধনা যে কতখানি প্রশিক্ষকের ভূমিকা পালন করে, তা রোজার বিধি-বিধানের দিকে তাকালে সহজেই অনুধাবন করা যায়।

সুবহে সাদিক উদয়ের সাথে সাথে রোযা পালনে ইচ্ছুক প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তির জন্য প্রধানত তিনটি কাজ নিষিদ্ধ বা হারাম হয়ে যায়। খাওয়া, পান করা, স্বামী-স্ত্রীর মিলন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত এ কাজগুলো নিষিদ্ধ থাকে। এ সময়ের মধ্যে কেউ ক্ষুধায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়লেও কোন খাদ্য গ্রহন করেনা। পিপাসায় বুক ফেটে গেলেও এক ফোঁটা পানি পান করেনা। যৌন কামনায় অদম্য মাত্রায় উত্তেজিত হলেও তা চরিতার্থ করেনা। কারণ, একজন রোযাদার ভাল ভাবেই জানে যে, এসব কাজ প্রকাশ্যে না করে গোপনে করলে সমাজে সে রোজাদার হিসাবে গণ্য হলেও আল্লাহর কাছে সে রোজাদারের কোন মর্যাদা পাবেনা। সে আরো জানে যে, রোজা রাখলে তার পুরস্কার এ জগতে পাবেনা এবং না রাখলে তার শাস্থিও এ জগতে পেতে হবেনা। সে এ ও জানে যে, সে সঠিক ভাবে রোজা রাখছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণের জন্য তার পেছনে কোন চৌকিদার-পাহারাদার বা পুলিশ-গোয়েন্দাও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তাস্বত্তেও প্রকৃত রোযাদার কখনো রোযা রেখে প্রকাশ্যে বা গোপনে পানাহার কিংবা ইন্দ্রিয়তৃপ্তিতে লিপ্ত হয়না।

কেননা সে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ সর্বক্ষণ সর্বত্র বিরাজমান। তিনি গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু সম্পর্কে পরিপূর্ণ ভাবে অবগত। পুরস্কার ও শা¯িতর জন্য এ পার্থিব জগতই শেষ জীবন নয়, বরং এর জন্য রয়েছে আখিরাত। সেখানে তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। এ বিশ্বাসের ফলশ্রুতিতে সে সবর এর তিন শাখার উপরই আমল করে, এতে তার আত্মশুদ্ধি ঘটে এবং তার মধ্যে স্বত:স্ফূর্ত ভাবে এমন দায়িত্বানুভূতি সৃষ্টি হয় যে, তার সকল জৈবিক চাহিদা, লালসা সব কিছুই আল্লাহর নির্দেশের সামনে জলাঞ্জলি দিতে তৈরী থাকে।

মাস ব্যাপী সবর এর এ প্রশিক্ষণ তার রূহানী শক্তিকে এতটাই দৃঢ় ও তেজস্বী করে তোলে যে, পার্থিব সকল লাভ ও লোভ-লালসাকে আখিরাতের সাফল্যের আকাঙ্খায় অতি তুচ্ছ ও সামান্য জ্ঞান করে। অন্যথায় তার পক্ষে কঠোর বিধি-বিধানের এ রোজা পালন করা কখনো সম্ভব হতনা। এ ভাবেই রামাদানের রোযা মানুষের আত্মশুদ্ধি ঘটায়।

অধ্যক্ষ্য (ভারপ্রাপ্ত), ককসবাজার হাশেমিয়া কামিল মাদরাসা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •