মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

সরকারি অনুদান পাওয়া থেকে বাদ পড়ল কক্সবাজার শহরের ঐহিত্যবাহাহী প্রাচীন কওমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রহমানিয়া মাদ্রাসা, হেফজখানা ও এতিম খানা। বিশ্বজুড়ে সংক্রামক করোনা ভাইরাসের কারণে সারাদেশে লকডাউন চলছে। করোনা পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশের কওমী মাদ্রাসা ও প্রতিষ্ঠান সমুহকে আর্থিক অনুদান দিচ্ছেন। এর ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার জেলায়ও ১৭৫ টি কওমী মাদ্রাসা প্রধানমন্ত্রীর অনুদান পেয়েছে।

করোনা পরিস্থিতিতে আর্থিক সংকট দূরীভূত করতে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া এই মানবিক সহায়তা থেকে বাদ গেল রহমানিয়া মাদ্রাসা, এতিমখানা ও হেফজখানা।

১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রহমানিয়া মাদ্রাসা, এতিমখানা ও হেফজখানা। ১৯৯২ সালে এই মাদ্রাসার এতিমখানাটি সর্বপ্রথম সরকারি গ্রান্ট লাভ করে। বর্তমানে এই মাদ্রাসায় প্রায় সাড়ে ৭শ’ শিক্ষার্থী রয়েছে। ৩২ জন শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় কর্মচারী আছে। এতিমখানায় ২০১৯ সালে সরকারিভাবে জরীপে ২৪০ জন এতিম শিক্ষার্থী পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬০ জন এতিম শিক্ষার্থী সরকারি গ্রান্ট পায়। এই মাদ্রাসাটি যেকোনো নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার হয়ে আসছে প্রতিষ্ঠাকালীন থেকে। সম্প্রতি পৌর মেয়র মুজিবুর রহমানও এই মাদ্রাসার মাঠ ব্যবহার করে এলাকার মানুষকে ত্রান সামগ্রী বিতরণ করেছেন। এই মাদ্রাসাটি কক্সবাজার পৌরসভার সবচেয়ে বৃহত্তম কওমী মাদ্রাসা। মাদ্রাসাটি সম্পূর্ণ মানুষের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হয়।

কক্সবাজার পৌরসভার ৭নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়তলীতে ঐতিহ্যবাহী ৪৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত রহমানিয়া মাদ্রাসা, এতিম ও হেফজখানাটির অবস্থান। কক্সবাজার পৌর এলাকায় একটি কওমি মাদ্রাসা যদি সরকারি অনুদান পায়, তাহলে এই রহমানিয়া মাদ্রাসা, এতিম ও হেফজখানা পাওয়ার কথা। কিন্ত গত ৩ মে কক্সবাজার সদর উপজেলার যে কয়টি কওমি মাদ্রাসাকে করোনা সংকট জনিত কারণে সরকারি অনুদান দেওয়া হয়েছে, তারমধ্যে রহমানিয়া মাদ্রাসা, এতিম ও হেফজখানা নেই। কক্সবাজার সদর উপজেলায় সরকারি অনুদান পাওয়ার জন্য মনোনীত কওমি মাদ্রাসার তালিকায়ও রহমানিয়া মাদ্রাসা, এতিম ও হেফজখানার নাম নাই।

সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি ত্রাণ ও অনুদানের জন্য উপকারভোগী ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা সংশ্লিষ্ট মেয়র, চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর, মেম্বারের মাধ্যমে নিজ নিজ উপজেলার ইউএনও বৃন্দ করে থাকেন।

এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলার ইউএনও মু. মাহমুদ উল্লাহ মারুফ এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেসব কওমি মাদ্রাসায় সরকারি গ্রান্ট প্রাপ্ত এতিমখানা রয়েছে সেসব কওমি মাদ্রাসাকে মনোনীত করে কক্সবাজার সদর উপজেলায় সরকারি অনুদান দেওয়া হয়েছে। রহমানিয়া মাদ্রাসা, এতিম ও হেফজখানা ১৯৯২ সাল থেকে সরকারি গ্রান্ট প্রাপ্ত হয়েছে। তারপরও কেন মনোনীত হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে সদর উপজেলার ইউএনও মু. মাহমুদ উল্লাহ মারুফ বলেন, কওমি মাদ্রাসা অনুদান পাওয়ার জন্য তালিকাটি সমাজসেবার কক্সবাজারস্থ উপ পরিচালকের কার্যালয় থেকে করা হয়েছে। একই বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আশরাফুল হুদা ছিদ্দিকী জামসেদ এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসা অনুদান পেতে তালিকা মনোনয়নে তাকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। কক্সবাজার শহরের বৃহত্তম কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রহমানিয়া মাদ্রাসা, এতিম ও হেফজখানা সরকারি কোন অনুদান না পাওয়াতে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, কক্সবাজার পৌর এলাকায় যদি একটি কওমি মাদ্রাসাকে সরকারি অনুদান দেওয়া হয়, তাহলে এই রহমানিয়া মাদ্রাসা, এতিম ও হেফজখানা সেই অনুদান পাওয়ার ন্যায্য হকদার বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

ধর্মীয় প্রসার ও কওমীভূক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমুহ অর্থ সংকট লাঘব করতে প্রধানমন্ত্রীর এ মানবিক উদ্যোগ স্বাগত জানিয়ে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জিয়া উদ্দিন আহমদ বলেন, রহমানিয়া মাদ্রাসা, এতিম ও হেফজখানা সরকারি অনুদান না পাওয়ার বিষয়টি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এ মানবিক সহায়তা থেকে এই কওমি মাদ্রাসাটিকে বাদ দেওয়া কোনভাবেই উচিত হয়নি।

রহমানিয়া মাদ্রাসা, এতিম ও হেফজখানা’র নির্বাহী মুহতামিম মুফতি মাওলানা সোলাইমান কাসেমী বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানটি একটি বহুমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একদিকে মাদ্রাসা অন্যদিকে এতিমখানা, হেফজখানা ও নুরানি বিভাগ রয়েছে। অনাথ ও দরিদ্র পরিবারের বহু শিক্ষার্থী হেফজখানা ও এতিমখানায় অধ্যয়নরত। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সংকট লেগেই আছে। প্রতিষ্ঠানটিতে অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে ২ একর জমির উপর। মানুষের অর্থ সহায়তার উপর নির্ভরশীল। শুভাকাঙ্ক্ষী ও বিত্তশালীদের অনুদানের উপর এ প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়।

মাদ্রাসার পরিচালক আনিসুল কবির জানান, রহমানিয়া মাদ্রাসা, এতিম ও হেফজখানা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একটি প্রতিষ্টান। ১৯৭৭ সাল থেকে এটি শিক্ষা বিস্তারে কক্সবাজারে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখে আসছে। ভয়াবহ করোনা সংকট মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কওমি মাদ্রাসার অনুকুলে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন। এটি প্রধানমন্ত্রীর দুরদৃষ্টি সম্পন্ন জ্ঞান ও মানবিক উদারতা হিসেবে সবার আজীবন স্মরণ থাকবে। তবে আমরা হতাশ হয়েছি। স্বীকৃতি প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানসমুহ এ অনুদান থেকে বাদ পড়ছে। আমাদের প্রতিষ্টানটি ১০০ ভাগ সরকারি অনুদান পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। আমরা আহবান করছি পুণরায় কওমি মাদ্রাসা বাছাই করা হউক। যেসব কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রকৃতপক্ষে সরকারি অনুদান পাওয়ার যোগ্য, সেসব প্রতিষ্ঠানকে অনুদান পাওয়ার জন্য নির্বাচিত করা হউক।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •