এডভোকেট মোহাম্মদ শাহজাহান

এক।

দুর্ভাগ্যই বলতে হবে আমাদের। করোনা নিয়ে একের পর এক গুজব আর ভুয়া খবরে খেই হারিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছি। করোনার কথিত অনেক প্রতিষেধকের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হলো গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ এন্টাসিড ট্যাবলেট!

এখানে পড়ুন-করোনা চিকিৎসায় এন্টাসিড ট্যাবলেট

দুই।

বাসি-পঁচা ও ক্ষতিকর বিষ-মেশানো ভেজাল খাবার আর কার্বাইড-মাখানো ফলমূল খেতে খেতে স্বাস্থ্যের বারোটা বাজিয়েছি আমরা। ফলে এসিডিটি/গ্যাস্ট্রাইটিস বা গ্যাস্ট্রিকে আক্রান্ত দেশের সিংহভাগ মানুষ। এ কারণে ঔষধের দোকানগুলোতে গ্যাস্ট্রিকের ঔষধের ছড়াছড়ি। এগুলো যুক্ত্ররাষ্ট্রে পেপসিড বা PEPCID নামে পরিচিত হলেও আমাদের দেশে এসিডিটি-বিরোধী ঔষধ বা এণ্টাসিড হিসেবে পরিচিত। ব্যবসাও রমরমা। গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ নানা রকম। এর মধ্যে এক ধরণের ঔষধ-শ্রেণিকে বলা হয় এইচটু ব্লকার অর্থাৎ H2 BLOCKER। এই এইচটু ব্লকারের মধ্যে অন্যতম এক ঔষধের জেনেরিক নাম হলো ফেমোটিডাইন অর্থাৎ FEMOTIDINE। এটি ঔষধের দোকানগুলোতে বিভিন্ন কোম্পানীর বিভিন্ন ব্র্যান্ড নামে পাওয়া যায়। মোটামুটি সস্তা দরেই। গণমাধ্যমে খবর বেরুচ্ছে, এটি করোনার ঔষধ।

পড়ুন এখানে-Drug Treatment of Acidity

তিন।

এ বিষয়ে অন্তর্জালে অনুসন্ধান করে জানা যায়, এই খবরটি গণমাধ্যমে চাওর হলেও এটি মূলতঃ ভিত্তিহীন ও অসমর্থিত একটি সংবাদ। ইউএসএ টুডে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন ছেপেছে। এতে বলা হয়েছে, খবরটির মূল উৎস চীনে। মাইকেল কালাহান নামের মার্কিন এক ডাক্তার করোনা মহামারী হয়ে উঠার আগ পর্যন্ত চীনে প্রথম দিকের করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছেন; পরে নিজ দেশে ফেরত গিয়ে চীনে করোনা চিকিৎসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন অন্যদের কাছে; তিনি জানান, চীনে তাঁরা অপেক্ষাকৃত কিছু গরীব করোনা রোগীকে ফেমোটিডাইন সেবন করতে দিয়েছিলেন; ওই রোগীগুলো ফেমোটিডাইন সেবন যাঁরা করেননি, তাঁদের চেয়ে সামাণ্য সংখ্যক বেশি সুস্থ হয়ে উঠেন; এ থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রেও কিছু করোনা রোগীকে পরীক্ষামূলকভাবে অন্য একটি ঔষধের সাথে ফেমোটিডাইন ইঞ্জেকশন দিয়েছেন; এটি নিয়মতান্ত্রিক কোন গবেষণা নয়; এটির ফল কী হবে তিনি জানেন না।

এখানে পড়ুন- Treat Covid-19 Theory Trending

চার।

ইউএসএ টুডে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে তাঁদের মতামত উল্লেখ করেছে প্রতিবেদনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস্ট্রিকের এই ঔষধটি করোনা সারাবে, এমন কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই; করোনায় আক্রান্তদের সুস্থ হয়ে উঠার হার অনেক বেশি; সিংহভাগ রোগী ঔষধ ছাড়াই সেরে উঠেন নিজের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার সাহায্যে; চীনের ওই রোগীদের তো ফেমোটিডাইনের সাথে অন্যান্য ঔষধও সেবন করানো হয়, কোন ঔষধে তাঁরা সেরে উঠেছেন তা জানা নেই; ওই রোগীরা আর্থিকভাবে তুলনামূলকভাবে অস্বচ্ছল আর কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন, তাঁদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বভাবতই অন্যদের চেয়ে বেশি, হয়তো সে কারণেই সেরে উঠেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত আদর্শ ভিমরাজ নামের একজন চিকিৎসকের এ বিষয়ে মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, কোন রোগী সেরে উঠলে আমরা বলি, আমাদের দেয়া অমুক ঔষধের গুণেই রোগী সেরে উঠেছে, আর সেরে না উঠলে বলি, রোগটা আসলেই জটিল ছিল!

এখানে পড়ুন- Treat Covid-19 Theory Trending

পাঁচ।

গণমাধ্যম ও সোশাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বিশ্বে করোনার চেয়ে করোনা-গুজবই দ্রুত ছড়াচ্ছে। আর এতে সোশাল মিডিয়াসহ মূলধারার গণমাধ্যমও জেনে-না জেনে, বুঝে-না বুঝে অনুঘটকের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

ছয়।

এই খবরে গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ কিনে ঘরে স্টক করে রাখার জন্য ঔষধের দোকানে হুমড়ি খেয়ে পড়া উচিত হবে না একেবারেই। এমনিতেই ভিটামিন সি ট্যাবলেটসহ অনেক মেডিকেল ড্রাগ আগের মতো সহজলভ্য নয় এখন আর। গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ প্রতিটি পরিবারের দৈনন্দিন সেব্য।ভুয়া খবর বা গুজবের ফলে এটির সংকট করোনায় মানুষের জীবনকে অধিকতর করুণ করে তুলবে। করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারের গবেষণা চলমান; সুনির্দিষ্ট, বিজ্ঞানসম্মত ও স্বীকৃত কোন প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হওয়া পর্যন্ত সবুর করা ছাড়া কোন উপায় নেই আমাদের।

 

এডভোকেট মোহাম্মদ শাহজাহানঃ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। মুঠোফোন-০১৮২৭৬৫৬৮১৬   

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •