(ইংরেজীতে প্রবন্ধটি লিখেছেন Sayeed Ibrahim Ahmed, senior lecturer in Finance, AIUB.
[প্রকাশের তারিখঃ ০২.০৫.২০২০]
ভাষান্তর করেছেনঃ Rashed Rahgir, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।)

সত্য কখনো গল্পকেও হার মানায়, কারণ গল্প সম্ভাবনার কথা ভেবেই আগায়, কিন্তু সত্যের সে দায় নেই। ২০ এপ্রিল, সোমবার তেলের মূল্য যখন নেগেটিভ হয়ে যায়, সেই ঘটনাকে মার্ক টোয়েইনের এই কথার সাথে মেলানো যায়।

প্রতি ব্যারেল ক্রূড অয়েল (অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম) এর মূল্য মাইনাস ৩৭.৬৩ ইউএস ডলার পর্যন্ত নেমে গেছে। কোভিড-১৯ প্যান্ডেমিকের সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি যখন থমকে গেছে, আমেরিকান এনার্জি কোম্পানিগুলোর অব্যবহৃত তেল রাখার জায়গার সংকট দেখা দিল।

মে মাসে সরবরাহকল্পে যেসব আগাম চুক্তির মেয়াদ ২১ এপ্রিল শেষ হচ্ছিল সেসব ব্যবসায়ীরা শেষ সময়ে চুক্তি বাতিল করার কারণে অপ্রত্যাশিত বাড়তি সরবরাহের চাপ সামলাতে গিয়ে একটি বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। উৎপাদিত তেল রাখার যখন জায়গা নেই তখন শিগগির মেয়াদোত্তীর্ণ হতে যাওয়া চুক্তি সম্পর্কে সবাই সন্দিহান হয়ে পড়েন।

নেগেটিভ প্রাইসের অর্থ হল, বিক্রেতা নিজের কাছে থাকা অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম হাতবদল করার জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে বাধ্য হয়। ২১ তারিখ যখন বাজার চালু হয় তখন ইউরোপিয়ান বেঞ্চমার্ক, ব্রেন্ট ক্রূড সরবরাহ ২ শতাংশ কমিয়ে বাজারমূল্য ১৮.৭৩ ইউএস ডলারে ফিরিয়ে আনে যা পুর্বের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কম।

রাশিয়া এবং সৌদি আরবের মধ্যকার মূল্যযুদ্ধ বিনিয়োগকারীদের হাত পা বেঁধে দিয়েছিল যা পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করেছে। প্যান্ডেমিকের ধাক্কা সামলানোর জন্য এ দুটি দেশ অন্যান্য শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সাথে মিলে গত মাসের শুরুর দিকে দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সম্মত হয়। যাহোক, পরদিন মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল, ইউএস বেঞ্চমার্ক West Texas Intermediate (WTI) ব্যারেলপ্রতি ১০ শতাংশ বাড়িয়ে ১২.৬৮ ডলারে ব্যবসা করে যা এশিয়ার বাজারে খোলার দিন ২০ শতাংশ বৃদ্ধির ফল হিসাবে দেখা যায়।

কিন্তু কী কারণে তেলের মতো এমন উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন একটি দ্রব্যের এমন অভূতপূর্ব দরপতন ঘটল? ইউএসএ WTI গ্রেডের ক্রূড উৎপাদন করে, উত্তর সাগরের পেট্রোলিয়াম খনিগুলো থেকে ব্রেন্ট ক্রূড এবং দুবাই, ওমান, আবু ধাবি ও অন্যান্য মিডল ইস্টের দেশগুলো দুবাই/ওমান ক্রূড ইত্যাদি উৎপাদন করে।

বৈশ্বিক লকডাউনের কারণে তেলের চাহিদা কমে গেছে। একটি চলমান অর্থনীতির প্রায় সব কাজ যেমন পণ্য পরিবহন, বিমান চালনা, গণপরিবহন, শিল্পকারখানা সবকিছুতেই জ্বালানি দরকার। মার্কিন সরকার তেল উৎপাদকদেরকে তেলের উৎপাদন কমানোয় রাজি করাতে ব্যর্থ হয় যার কারণে পরিস্থিতি আরো শোচনীয় হয়েছে, কারণ তেলখনি বন্ধ করে দেওয়া খুব একটা সহজসাধ্য বিষয় নয়।

সাধারণভাবে, তেল সবসময় ভবিষ্যৎ মূল্যে কেনাবেচা হয়। এর মানে হচ্ছে, সামনের মাসে যে তেল কেনা হবে তার চুক্তি হবে এই মাসে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি মে মাসে এক মিলিয়ন ব্যারেল তেল কিনতে চায়, তাহলে তার অর্ডার হবে এপ্রিল মাসে এবং দামও পূর্বনির্ধারিত হবে।

৩৭.৬৩ ডলার ছিল মে মাসের ডেলিভারি মূল্য আর ২১ এপ্রিল, মঙ্গলবার ছিল এই আগাম চুক্তির মে মাসের ডেলিভারি নিশ্চিত করার শেষ দিন। মে মাসে যেসব বিনিয়োগকারীর ডেলিভারী নেয়ার কথা ছিল, তারা বাড়তি তেলের স্থান সংকুলান না হবার কারণে ডেলিভারী নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

জুন, ২০২০ এর আগাম চুক্তির ব্যারেল প্রতি মূল্য প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৩.৮০ ডলার। আর জুলাই এর দাম ধরা হচ্ছে ৩০ ডলারের আশেপাশে। কারণ, ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন এই সময়ের মধ্যে বিশ্বব্যাপী লকডাউন শিথিল হবে আর তেলের চাহিদা বাড়বে।

তাছাড়া তেল ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, মার্কিন সরকার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বেশী পরিমাণ তেল মজুদ করে রাখার সুযোগ তৈরি করবে। বাড়তি তেল ক্রয় এবং মজুদের জন্য জাতীয় রিজার্ভের ব্যবহার এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।

অর্থনীতির যোগান বিধি অনুযায়ী দাম এবং চাহিদার পরিমাণ বিপরীতভাবে সম্পর্কিত। যখন কোন পণ্যের দাম বাড়ে, তখন সেই পণ্যের চাহিদা কমে। সুতরাং, নেগেটিভ প্রাইস ক্রয় বাড়ানোর জন্য মার্কিন তেলশিল্পের একটি মরিয়া প্রচেষ্টা। পণ্যের এই নেগেটিভ প্রাইসিং সাময়িক এবং সময়ের সাথে সাথে দাম আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

অনেকেই মনে করেন এর ফলে বাংলাদেশের সামনে সুবর্ণ সুযোগ এসেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বিগত দশক অবধি দীর্ঘদিন ধরে লোকসান দিয়ে আসছিল এবং সরকারী ভর্তুকির উপর টিকে ছিল। ইউএসএ এবং সিঙ্গাপুর এই দুটি তেলের বাজারের মধ্য থেকে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর থেকেই তেল কিনে। এই অঞ্চলে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্ল্যাটস বেঞ্চমার্ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জ্বালানি ও ধাতব পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে থাকে।
প্রথম আলোর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিপিসি বাংলাদেশের জন্য দুইভাবে তেল কিনে। সরকারের সাথে সরকারের চুক্তি (জিটুজি) আর আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে। এর মধ্যে সৌদি আরব এবং আবু ধাবি থেকে জিটুজি ভিত্তিতে ১.৫ মিলিয়ন টন ক্রূড অয়েল সরাসরি কিনে থাকে। এছাড়া ৭টি দেশের ৮টি কোম্পানী থেকে জিটুজি ভিত্তিতে পরিশোধিত তেল কেনা হয়। অন্যদিকে বছরে দুইবার আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে নিয়মিত তেল কেনা হয়।

এই দুই পদ্ধতির যেটাই হোক না কেন, তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকে। এটাই হচ্ছে দর কষাকষির সেই প্রিমিয়াম। বিপিসির জন্য জাহাজে তেল তোলার দুই দিন আগের দাম, যেদিন তেল তোলা হবে সেদিনের দাম এবং পরবর্তী দুই দিনের দাম প্ল্যাটস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত দাম অনুযায়ী গড় করে বাংলাদেশে পৌঁছানো পর্যন্ত ব্যারেলপ্রতি দাম ঠিক করা হয়।
সোজা কথায়, এটা হচ্ছে তেল জাহাজে তোলার দিন থেকে জাহাজ থেকে নামানোর দিন পর্যন্ত মোট ৫ দিনের গড় মূল্য। যদি ২০ এপ্রিল বিপিসি’র জন্য জাহাজে তেল তোলা হয়, তাহলে প্ল্যাটস এ প্রকাশিত দাম অনুযায়ী এপ্রিলের ১৮, ১৯, ২০, ২১ এবং ২২ তারিখের মূল্যের গড় তেলের মূল্য হিসেবে ধরা হবে।

সরকারী চুক্তি বা আন্তর্জাতিক দরপত্র যেভাবেই তেল কেনা হোক না কেন একমাত্র দর কষাকষির জায়গা থাকবে প্রিমিয়াম। শিপমেন্ট খরচ, আন্তর্জাতিক ট্যাক্স, ভ্যাট, সার্ভিস চার্জ, ইনস্যুরেন্স এসবের উপর প্রিমিয়াম নির্ভর করে। বাংলাদেশ বর্তমানে ভিটল এবং ইউনিপ্যাক এর কাছ থেকে ১.৬ মিলিয়ন টন তেল কিনে। দু’টি প্রতিষ্ঠানই ২০১৯ এর ডিসেম্বরেই তেল কেনার ক্রয়াদেশ পায় যখন তেলের মূল্য ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬৪ ডলার।

তেলের দাম হ্রাসমান হওয়ার কারণে বিপিসি এখনো বিদ্যমান বাজারদরে তেল পাবে। যদিও সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে দুইটি প্রতিষ্ঠানই ২.৩৩ ডলার প্রিমিয়াম পাচ্ছে এবং তা অপরিবর্তিত থাকবে।
অতএব, এটা পরিষ্কার যে, এই প্যান্ডেমিক সত্ত্বেও তেলের নেগেটিভ প্রাইস যেমন স্থায়ী হবেনা, বাংলাদেশের মতো দেশগুলো সেই প্রাইস থেকে লাভবানও হতে পারবে না।

মূল প্রবন্ধঃ https://tbsnews.net/thoughts/could-bangladesh-benefit-negative-oil-prices-76324

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •