সিবিএন ডেস্ক:

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের (আরএসএফ) ২০২০ সালের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক অনুযায়ী আগামী ১০ বছরের মধ্যেই নির্ধারিত হবে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ। এই সূচক পর্যালোচনা করে দেখা গেছে; যে সংকটগুলো সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার বাধা হয়ে দাঁড়ায়, কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে তা আরও বেশি করে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। আরএসএফ বলছে, শুভবোধসম্পন্ন মানুষেরা সাংবাদিকদের পাশে না দাঁড়ালে চলমান দশক সংবাদপত্রের ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ সর্বনাশা হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বের ১৮০টি দেশের সাংবাদিকদের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আরএসএফ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক প্রকাশ করেছে। ২০২০ সালের এই সূচক বলছে, বেশ কিছু সংকট কেন্দ্রীভূত হয়ে ওঠার কারণে আগামী দশ বছর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব সংকটের মধ্যে রয়েছে ভূরাজনৈতিক সংকট (কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসী হয়ে ওঠার কারণে), প্রযুক্তিগত সংকট (গণতান্ত্রিক নিশ্চয়তার অভাবে), গণতান্ত্রিক সংকট (মেরুকরণ ও নিপীড়নমূলক নীতির কারণে), বিশ্বাসের সংকট (সংবাদমাধ্যমের সন্দেহজনক ভূমিকা এবং কখনো কখনো ঘৃণা ছড়ানোর কারণে), এবং অর্থনৈতিক সংকট (মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার অভাব)।

ভূরাজনৈতিক সংকট

অন্যতম নীরব সংকট হলো ভূরাজনৈতিক সংকট। স্বৈরতান্ত্রিক, কর্তৃত্ববাদী কিংবা জনতোষণবাদী শাসক দলের নেতারা প্রত্যেকেই যথাযথ তথ্যের টুটি চেপে ধরতে সিদ্ধহস্ত। ভিন্নমত ও স্বাধীন সাংবাদিকতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তারা বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে তাদের নিজস্ব মতামত। কর্তৃত্ববাদী শাসকগুলো তাদের দুর্বল র‍্যাঙ্কিং ধরে রেখেছে। ‘বিশ্ব মিডিয়ার নতুন ক্রম’ তৈরির চেষ্টায় থাকা চীন তথ্যের ওপর তাদের মারাত্মক নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া বজায় রেখেছে। যার নেতিবাচক প্রভাব সারা বিশ্বেই করোনাভাইরাস সংকটের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। চীন, সৌদি আরব (দুই ধাপ ওপরে উঠে ১৭০তম) ও মিসর (তিন ধাপ নেমে ১৬৬তম) বিশ্বের শীর্ষ তিনটি সাংবাদিক আটককারী দেশ। রাশিয়া (১৪৯তম)তথ্য নিয়ন্ত্রণে অনলাইনে স্পর্শকাতর প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই বাড়াচ্ছে। ভারত (দুই ধাপ নেমে ১৪২তম) কাশ্মিরে ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ইলেক্ট্রনিক কারফিউ আরোপ করে রেখেছে। মিসরে ‘ফেইক নিউজ’ অভিযোগ ব্যবহার করে ওয়েবসাইট ও ওয়েবপেজে প্রবেশ বন্ধ রাখা হচ্ছে আর অ্যাক্রিডিটেশন প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে।

প্রযুক্তিগত সংকট

ডিজিটালাইজড ও বিশ্বায়িত যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগে যথাযথ নিয়ন্ত্রণের উপস্থিতির অভাবেই তথ্য বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। প্রচারণা, বিজ্ঞাপণ, গুজব আর সাংবাদিকতা সরাসরি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও সম্পাদকীয় বিষয়বস্তুর মধ্যে পার্থক্য নিয়ে ক্রমেই দ্বিধা বাড়ছে। আর এতে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার গণতান্ত্রিক নিশ্চয়তা। এতে  বিপদজনক আইন প্রণয়ণ উৎসাহ পাচ্ছে। ‘ফেইক নিউজ’ বন্ধের অজুহাতে এসব আইনের মাধ্যমে স্বাধীন ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার ওপর কঠোর দমনপীড়ন চালানো যাচ্ছে। মহামারির মধ্যে গুজব ও ফেইক নিউজ ভাইরাসের মতো দ্রুত ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাশিয়া, ভারত, ফিলিপাইন (দুই ধাপ নেমে ১৩৬তম) এবং ভিয়েতনামে (১৭৫তম) রাষ্ট্রীয় মদদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গণতান্ত্রিক সংকট

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকের আগের দুটি সংস্করণেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঘৃণা এবং সহিংসতা বৃদ্ধির সংকট প্রতিফলিত হয়। বর্তমানে এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর ফলে শারীরিক সহিংসতা আরও বেশি তীব্র ও নিয়মিত হয়ে উঠেছে। আর সে কারণে কয়েকটি দেশে ভীতির মাত্রা অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে। শীর্ষ রাজনীতিবিদ এবং তাদের ঘনিষ্ঠরা প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো অব্যাহত রেখেছেন। দুইটি দেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের (৩ ধাপ এগিয়ে ৪৫তম) ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ব্রাজিলের (দুই ধাপ নেমে ১০৭তম) জইর বলসোনারো সংবাদমাধ্যমকে হেয় করা এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর ক্ষেত্রে উসকানি অব্যাহত রেখেছেন। সরকারের গোপণীয়তা প্রকাশ করে দেওয়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অনলাইনে বড় আকারের আক্রমণের নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন ব্রাজিলীয় নেতার চারপাশে থাকা ‘হেট কেবিনেট’। করোনাভাইরাসের মহামারির শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ বাড়িয়েছেন।

বিশ্বাসের সংকট

বিশ্বাসযোগ্য নয় এমন তথ্য প্রকাশ ও সম্প্রচার করায় সংবাদমাধ্যমের প্রতি অবিশ্বাস বেড়ে চলেছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জনগণের বিশ্বাসের ওপর জরিপ পরিচালনা করা এডেলমান ট্রাস্টের সর্বশেষ আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী ৫৭ শতাংশ মানুষই মনে করে  সংবাদমাধ্যমগুলো অবিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রকাশ করে। বিশ্বাসের এই সংকটের কারণে বিশ্বের নানা প্রান্তে রাজপথে বড় বড় বিক্ষোভের সময় সাংবাদিকেরা মানুষের ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। এর মধ্যে ইরাক, লেবানন (১ ধাপ নেমে ১০২তম), চিলি (৫ ধাপ নেমে ৫১ তম), বলিভিয়া (এক ধাপ নেমে ১১৪তম) ও ইকুয়েডর (এক ধাপ নেমে ৯৮ তম) রয়েছে। এছাড়া ফ্রান্সেও (দুই ধাপ নেমে ৩২ তম) পুলিশি সহিংসকতার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকেরা। আরেকটি দৃশ্যত ক্রমবর্ধমান অবস্থা হলো জাতীয়তাবাদী কিংবা ডানপন্থী অ্যাকটিভিস্ট গ্রুপগুলো প্রকাশ্যে স্পেনে (২৯তম), অস্ট্রিয়ায় (দুই ধাপ নেমে ১৮তম), ইতালিতে (দুই ধাপ নেমে ৪১তম) এবং গ্রিসে (৬৫তম) সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। এছাড়ান আফগানিস্তানে (এক ধাপ নেমে ১২২তম) তালেবান এবং মিয়ানমারে (এক ধাপ নেমে ১৩৯তম) কয়েকটি বৌদ্ধ উগ্রবাদী গ্রুপ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ব্যবহারে কোনও কিছুর তোয়াক্কা করেনি।

অর্থনৈতিক সংকট

ডিজিটালাইজেশনের কারণে বহু দেশেই সংবাদমাধ্যম চাপের মধ্যে পড়েছে। বিক্রি কমে যাওয়া, বিজ্ঞাপনের দাম পড়ে যাওয়া আর উৎপাদন ও বিতরণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় কথা বলে সংবাদপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্বিন্যাস এবং সাংবাদিক ছাঁটাই করেছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে গত দশ বছরে সংবাদমাধ্যমের  চাকুরির সংখ্যা অর্ধেক কমে গেছে। অর্থনৈতিক এই সমস্যার সামাজিক প্রভাব রয়েছে। আর সারা বিশ্বেই তা সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলেছে। সংবাদপত্রগুলো বেশি দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। আর স্বাভাবিকভাবে তারা চাপ সামলাতে সক্ষম হচ্ছে কম।

আরএসএফ-এর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে মূল্যায়িত হওয়া এই পাঁচ ধরণের সংকটের সঙ্গে বর্তমানে যোগ হয়েছে বিশ্ব জুড়ে চলমান জনস্বাস্থ্য সংকট।

সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা এই সংগঠনের মহাসচিব ক্রিস্টোফি ডেলোইরি বলেন, ‘আমরা সাংবাদিকতার ভবিষ্যত আক্রান্ত করতে পারা সংকট সঙ্গে নিয়ে একটি নীতিনির্ধারণী দশকে প্রবেশ করছি।’  তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসের মহামারি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়ার অধিকারের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা নেতিবাচক ফ্যাক্টরগুলোকে সামনে আনছে আর এই মহামারি নিজেই এসব ফ্যাক্টরগুলোকে বাড়িয়ে তুলছে। ২০৩০ সালে তথ্যের স্বাধীনতা, বহুমাত্রিকতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা কেমন হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর আজকেই নির্ধারণ করতে হবে।’

করোনাভাইরাসের মহামারির সময়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা এবং ওই সূচকে সংশ্লিষ্ট দেশের র‍্যাঙ্কিংয়ের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছে আরএসএফ। চীন (১৭৭তম) এবং ইরান (৩ ধাপ নেমে ১৭৩তম) উভয়েই তাদের করোনাভাইরাসের মহামারি নিবিড়ভাবে সেন্সর করেছে। ইরাকের (৬ ধাপ নেমে ১৬২তম) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সরকারি সংখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সংবাদ প্রকাশের পর তিন মাসের জন্য বাতিল করা হয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের লাইসেন্স। এমনকি ইউরোপেও হাঙ্গেরির (২ ধাপ নেমে ৮৯তম) প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান বিতর্কিত করোনাভাইরাস আইন পাশ করেছেন। এই আইনে মিথ্য তথ্যের কারণে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সমালোচকেরা এটিকে সম্পূর্ন অযৌক্তিক এবং নিপীড়নকারী পদক্ষেপ আখ্যা দিয়েছেন।

ক্রিস্টোফি ডেলোইরি বলেন, ‘জনস্বাস্থ্যের এই সংকট কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোকে কুখ্যাত ‘শক ডকট্রিন’ প্রয়োগের সুযোগ করে দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক সুযোগ কম থাকা এবং জনগণের প্রতিবাদের সুযোগ কম থাকার সুবিধা নিয়ে সরকারগুলো এমন সব পদক্ষেপ নিচ্ছে যা স্বাভাবিক সময়ে অসম্ভব ছিলো।’ আরএসএফ মহাসচিব মনে করেন এই নীতিনির্ধারণকারী দশক সর্বনাশা হয়ে উঠবে না যদি শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষগুলো সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ায়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •