মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতাল জেলার সর্বোচ্চ ও সর্ববৃহৎ চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সংশ্লিষ্ট ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি এখনো নির্মাণ না হওয়ায় কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা কক্সবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে এসে হাতে কলমে শিক্ষা ও ইন্টার্নিশীপ করেন। এ হাসপাতালটি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতাল হলেও এখানে ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ মতো রোগী সবসময় ইনডোরে চিকিৎসাধীন থাকে। সীটের অভাবে মেঝে, বারান্দায়, করিডোরে রোগী রাখতে হয় নিয়মিত।

অনেক কিছুর সীমাবদ্ধতা সত্বেও এই ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালটির চিকিৎসা সেবার মান তুলনামূলক অনেক ভালো। হাসপাতালটির চিকিৎসক ও অন্যান্য স্টাফদের অল্প কিছু পদ শূন্য থাকলেও প্রায় সব বিভাগে এখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। যা দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন প্রায় মেটানো যায়। এ হাসপাতালে রয়েছে আধুনিক জরুরি বিভাগ, আউটডোর, অত্যাধুনিক মেডিকেল যন্ত্রপাতি, সেমি আইসিইউ, লিফট, রেম, সিড়ি, পুলিশ বিট সহ প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছু। আগামী ২২ মে’র মধ্যে নতুনভাবে সংযোজন হচ্ছে অত্যাধুনিক ১০ বেডের আইসিইউ এবং ১০ বেডের এইসডিইউ। ইউএনএইচসিআর-এর অর্থায়নে জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেনের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় নির্মাণাধীন এই আইসিইউ এবং এইসডিইউ-তে থাকবে উন্নত ভেন্টিলেটর সুবিধা। বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে তখন এই হাসপাতালকে একটি উন্নত আধুনিক হাসপাতাল বললে মনে হয়, বেশি অত্যুক্তি করা হবেনা।

দেশে করোনা ভাইরাস সংকট শুরু হওয়ার পর এই ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালটিতে ১০ শয্যার একটি আইসোলেশন ইউনিট প্রস্তুত করে রাখা হয়। এই হাসপাতালে আসা কোন রোগীর শরীরে করোনা ভাইরাস আক্রান্তের উপসর্গ পরিলক্ষিত হলে, তাকে উক্ত আইসোলেশন ইউনিটে সম্পূর্ণ সাময়িকভাবে পৃথক করে রাখা হবে। পরে করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর শরীরের দ্রুততম সময়ে স্যাম্পল সংগ্রহ করে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ল্যাবে টেস্টের জন্য পাঠানো হবে। যদি স্যাম্পল টেস্টে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে থাকা কোন রোগীর শরীরে করোনা ভাইরাস সনাক্ত হয়, তাহলে উক্ত রোগীকে সাথে সাথেই শুধুমাত্র করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার জন্য রামু ও চকরিয়ায় যে ২টি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ডেডিকেটেড কোভিড আইসোলেশন হাসপাতাল চালু করা হয়েছে, পজেটিভ রিপোর্ট পাওয়া রোগীকে সেখানেই স্থানান্তর করা হবে। এটা ছিলো, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কক্সবাজার সদর হাসপাতালটিতে ১০ বেডের আইসোলেশন ইউনিট প্রস্তুত করে রাখার মূল উদ্দেশ্য।

কক্সবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালটিতে কক্সবাজার জেলায় মৃত্যু হওয়া প্রথম করোনা রোগী রামু’র কাউয়ার খোপ ইউনিয়নের পূর্ব কাউয়ার খোপ গ্রামের সাবেক মেম্বার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এর স্ত্রী ছেনু আরা ভর্তি ছিলো ২৮ এপ্রিল থেকে। তার স্যাম্পল টেস্টের ‘পজেটিভ’ রিপোর্ট হওয়ার খবর আসে ৩০ এপ্রিল বিকেল পৌনে ৩ টার দিকে। তখন ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালেই করোনা সনাক্ত হওয়া উক্ত মহিলা রোগীকে সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে রেখেই করোনা চিকিৎসা সেবা দিতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দেন বলে হাসপাতালটিতে ভর্তি থাকা রোগী ও তাদের সহযোগীদের কাছ থেকে জানা গেছে। ফলে ভর্তি থাকা অন্যান্য রোগী, তাদের স্বজন, মেডিকেল রিপেজন্টেটিভ সহ হাসপাতালের আশে পাশের এলাকার সবাই চরমভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ভর্তি থাকা অনেক রোগী সুস্থ না হওয়া সত্বেও রোগীদের স্বজনেরা তাদের রোগীদের অনেকটা জোর করে ডিশ্চার্জ করে অন্যত্র নিয়ে যেতে প্রস্তুতি নেন। এ নিয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল এলাকায় বেশ কানাঘুষা চলতে থাকে। সবার মুখে একটি কথা ছিলো। তা হচ্ছে, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল তো কোভিড হাসপাতাল নয়। যেখানে রোহিঙ্গা শরনার্থী সহ সবসময় ৩ শতাধিক রোগী ইনডোরে চিকিৎসাধীন থাকে, যেখানে প্রতিদিন আউটডোরে আরো ৫ শতাধিক রোগীর চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়, যেখানে একটি মাত্র সিঁড়ি, একটি মাত্র রেম, যেখানে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত শতাধিক চিকিৎসক, ইন্টার্নি চিকিৎসক, নার্স, ইন্টার্নি নার্স, স্বাস্থ্য কর্মী, টেকনিশিয়ান, ল্যাব কর্মী, ওয়ার্ডবয়, আয়া, ক্লিনার, সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীর আনাগোনা, যেখানে পুলিশ বক্স, যেখানে হাসপাতালের রান্নাঘর, যেখানে প্রতিদিন শত শত মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ এর পদচারনা, যেখানে মাননীয় সংসদ সদস্যের নেতৃত্ব হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়, যেখানে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত নিয়মিত বিভিন্ন সভা-সেমিনার হয়, যেখানে জেলার একমাত্র ময়নাতদন্তের কার্যক্রম হয় এবং আরো অনেক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ের নিয়মিত কার্যক্রম চলে, সেখানে কিভাবে বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস এর মতো ভয়ংকর গায়েবী সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা হবে? এসব প্রশ্ন সবার মাথায় তখন শুধু ঘুরপাক খাচ্ছিল। যদিও উক্ত মহিলা করোনা রোগী ৩০ এপ্রিল রাত পৌনে ৯ টার দিকে সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। কিন্তু স্যাম্পল টেস্টের রিপোর্ট পজেটিভ আসার পর ৩০ এপ্রিল বিকেল পৌনে ৩ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৬ ঘন্টা মৃত্যুবরণ করা মহিলা করোনা রোগীটি কক্সবাজার সদর হাসপাতালেই ছিলো। যা মোটেও কাম্য নয়।

এরকম উম্মুক্ত পরিবেশ, জনবহুল ও ব্যস্ততম এলাকায় কিভাবে ভয়ংকর করোনা ভাইরাস (COVID-19) রোগের চিকিৎসা করা হবে। যদি এখানে করোনা ভাইরাস জীবাণু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা হয়, হাসপাতালটির জেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থান হওয়ায় শুধু রোগী, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী সহ হাসপাতাল কেন্দ্রিক লোকজন নয়, পুরো শহরবাসী সবসময় করোনা ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালটির চতুর্দিকে চলাচলের রাস্তা রয়েছে। এ রাস্তা দিয়ে লকডাউন (Lockdown) থাকা অবস্থায়ও প্রতিদিন শত শত গাড়ি ও মানুষ চলাচল করছে। কোন বিচ্ছিন্ন এলাকায় হাসপাতালটির অবস্থান নয়, সম্পূর্ণ উম্মুক্ত এলাকায় হাসপাতালটির অবস্থান। তাই এ হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসা করার আগে বিশাল বিশাল কিছু গৌরস্থান তৈরি করে রাখতে হবে। নাহয়, করোনায় মৃতদের লাশ দাফনের জন্য বর্তমান গৌরস্থান সমুহে যখন আর জায়গা হবেনা, তখন সংকট আরো ঘনীভূত ও প্রকট হবে।

এছাড়া কক্সবাজার-টেকনাফ রোডের উখিয়া কলেজের একটু দক্ষিণে ইউএনএইচসিআর-এর অর্থায়নে নির্মাণাধীন ২শ’ শয্যা বিশিষ্ট করোনা আইসোলেশন হাসপাতালটি আগামী ১৫/১৬ মে’র মধ্যে চালু করা হবে বলে নির্ভরযোগ্য সুত্র নিশ্চিত করেছেন। তাহলে আর মাত্র সর্বোচ্চ ১৫ দিন পরেই উখিয়ায় নির্মাণাধীন আইসোলেশন হাসপাতালে কক্সবাজার জেলার সমস্ত করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। কারণ সেটি ২শ’ শয্যা বিশিষ্ট করেনা আইসোলেশন হাসপাতাল। আর উখিয়ায় নির্মাণাধীন আইসোলেশন হাসপাতালটি রোহিঙ্গা শরনার্থীদের ব্যবহার করার কোন প্রয়োজন নেই। রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পের অভ্যন্তরে ১২০০ শয্যার ১১ টি পৃথক আইসোলেশন হাসপাতাল নির্মাণ করা হচ্ছে। যার মধ্যে ৮০০ শয্যার নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যে শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে বলে কক্সবাজার আরআরআরসি অফিস সুত্র নিশ্চিত করেছে। তাছাড়া গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত কোন রোহিঙ্গা শরনার্থী করোনা ভাইরাস জীবাণুতে আক্রান্ত হয়নি। এজন্য রোহিঙ্গা শরনার্থীদের উখিয়ায় নির্মাণাধীন ২শ’ শয্যার আইসোলেশন হাসপাতালটি ব্যবহার করার মোটেও প্রয়োজন নেই।

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালটি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও কক্সবাজার-৩ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন, সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ও উপ পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন সহ সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে নিবেদন করবো- আল্লাহর দোহায়, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালকে কোভিড হাসপাতাল বানাবেন না। আপনারা প্রয়োজন মনে করলে, কক্সবাজারে শত শত মানসম্মত আবাসিক হোটেল রয়েছে, প্রাইভেট হাসপাতাল গুলো প্রায় দেড় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে, সেগুলোকে কাজে লাগান। অথবা আরো অন্যান্য বিকল্প চিন্তা করুন। তারপরও কোন অবস্থাতেই ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালটিকে কোভিড-১৯ হাসপাতাল বানাবেন না। পুরো জেলা সদরকে করোনার উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে ফেলবেন না।

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে অবস্থান করা কোন রোগীর স্যাম্পল টেস্ট পজেটিভ হলেই তাকে সর্বোচ্চ এক ঘন্টার মধ্যে নির্ধারিত হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরের ব্যবস্থা নিন। করোনা পজেটিভ রোগী স্থানান্তরের আনুষ্ঠানিকতায় যেন ঘন্টার পর ঘন্টা সময় ক্ষেপন না হয়। করোনা পজেটিভ রোগী নির্ধারিত কোভিড ডেডিকেটেড আইসোলেশন হাসপাতালে দ্রুত স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতা যেন আগে থেকেই ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেওয়া থাকে। কারণ পরে এ সিদ্ধান্ত নিতে আর যেন সময় ক্ষেপন ও অহেতুক বিড়ম্বনার শিকার হতে না হয়। এম্বুলেন্স সহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা যেন সবসময় স্টেনবাই থাকে।

ইতিমধ্যে অভিযোগ এসেছে, ডেডিকেটেড আইসোলেশন হাসপাতাল গুলোর কর্তৃপক্ষের মাথার বোঝা ও অহেতুক ঝামেলা হবে মনে করে, করোনা রোগীদের ডেডিকেটেড আইসোলেশন হাসপাতালে সুকৌশলে ভর্তি করাতে চান না। বিভিন্ন অজুহাত ও তালবাহানা করার গুরতর অভিযোগ উঠছে। এ অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তাহলে বলবো, এটা দায়িত্ব জ্ঞানবোধহীনতা, অপেশাদারিত্ব, মনুষ্যত্বহীনতা, নৈতিকতাহীনতা ও চরম অমানবিকতা। যেটা চিকিৎসক সুলভ আচরন নয়। যেটা মহান চিকিৎসা পেশাকে কলংকিত করবে নিঃসন্দেহে।

তাই সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে অনুরোধ রাখবো, কক্সবাজার জেলা সদরের মানুষজনকে কিছুটা হলেও ভয়ংকর করোনার হিংস্র থাবা থেকে নিরাপদ রাখতে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালকে স্বাভাবিক হাসপাতাল হিসাবে থাকতে দিন। কোভিড আইসোলেশন হাসপাতাল বানিয়ে মানুষকে ২৪ ঘন্টা আতংকে রাখবেন না। আশা করছি, বৃহত্তর জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।

(লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, ঢাকা।)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •