বিশ্বজিত সেন

প্রতিবছর ২৯ এপ্রিল আসলে সমগ্র কক্সবাজারবাসীসহ উপকূলবাসীর মন বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে আসে স্বজন হারানোর বেদনায় মানুষের চক্ষু অশ্রুসজল হয়। উপকূলবাসীর মনমানসিকতা ফিরে যায় সেই অতীতের দিকে সেই ইতিহাসের দিকে। সেই ব্যাথা বেদনা শোকাবহ স্মৃতিশ্বর দিন হচ্ছে ২৯ এপ্রিল। ১৯৯১ সালের সেই ভয়াবহ ২৯ এপ্রিল একটি দুঃসহ যাতনা শোকের কথা এই উপকূলের মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় বলে ২৯ এপ্রিল এই উপকূলের কাছে সবসময়ে জীবনাচারণের অংশ হিসাবে বারবার ফিরে আসে। ফিরে আসবে চিরদিন স্মৃতি জাগানিয়া অন্যতম দিন হিসাবে।

১৯৯১ এর ২৯ এর এপ্রিল এদেশের মানুষের মনেও চিরদিন বেঁচে থাকবে। কারণ ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের সেই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাসের পর ২৯ এপ্রিল ’৯১ হচ্ছে আরেকটি মানব বিপর্যয়কর সর্বনাশা প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ১২ নভেম্বরের পর এতবেশী মৃত্যু এখনো পর্যন্ত কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ঘটেনি, আর বিশেষ করে কক্সবাজার উপকূলে ২৯ এপ্রিল হচ্ছে শতাব্দীর সবচাইতে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। সেজন্য ২৯ এপ্রিলের কথা এই এলাকার মানুষের স্মৃতি থেকে কোনদিন মুছে দেওয়া সম্ভব নয়।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছাসের বিপর্যয়কর অবস্থার বিষয়টি প্রথমে সাধারণ বিষয় মনে হলেও এর ভয়াবহতা বুঝা যায় ঘূর্ণিঝড় শেষ হওয়ার পর। ২৯ এপ্রিলের সারারাত ব্যাপী ঘূর্ণিঝড়ের তা-বে শুধুমাত্র বাড়ীঘর ধ্বংস হয়নি ঘরবাড়ীর চাইতে সবচাইতে বেশী মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যায় অসংখ্য মানুষের মৃত্যুতে। কক্সবাজারের সমগ্র উপকূল জুড়ে মানবমৃত্যুর মিছিল এত দীর্ঘ ছিল যে, উপকূলের কোন না কোন ঘর থেকে একজন মানুষ বা তাদের একজন আত্মীয় চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। সেই জন্য ২৯ এপ্রিল এক শোকাবহ স্মৃতির নাম। মানুষের ঘরবাড়ী প্রাণ হারানোর সাথে সাথে এই ঘূর্ণিঝড়ে যে বিশাল সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, তা বাংলাদেশের অন্য কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ঘটেনি। এই সম্পদ শুধু মাত্র ফসলী জমি নয়, এই ঘূর্ণিঝড়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা সম্পদের প্রচুর ক্ষতি হয়েছিলো। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ঘূর্ণিঝড়ে বেশ কিছু বিমান এবং নৌ জাহাজ নষ্ট হয়ে যায়। এই সম্পদ ধ্বংসের বিষয় এতবেশী ছিল যে এর জন্য বাংলাদেশকে পরবর্তীতে একটি বড় অর্থনৈতিক ধাক্কার সম্মুখীন হতে হয়। তাছাড়া অন্যান্য বিপর্যয়তো ছিল।

২৯ এপ্রিল ৯১ এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল যে ঘূর্ণিঝড় পূর্ববর্তী মানুষের অসচেতনতা এবং কিছু দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির দায়িত্বহীনতা। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় শুরু এবং শেষ হবার প্রাক্কালে মানুষকে অসচেতনতা, উদ্ধারপর্ব এবং সহযোগিতার ব্যাপারে চরম গাফলতি দেখা গিয়েছিল। তার উপর দেখা গেছে ঘূর্ণিঝড়ের পর এতবড় মানব বিপর্যয়কর অবস্থা হয়ে যাবার পরও তৎকালীন সরকারী মহলের উদাসীনতা। সরকার ঘূর্ণিঝড়ের নিরূপন না করে আরো ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা বিষয়টিকে চাপা দিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। এটাই ছিল তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দুঃখজনক।

২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের পর সেই সময় সরকারী পর্যায় থেকে কোন ভালো ত্রাণ তৎপরতা হয়নি। যেটা সব সময় সমালোচিত থেকেছে। বাংলাদেশে বিদেশী সাহায্যকারী দল সাহায্যসংস্থা আসার পর তখন বুঝা যায় কত বড় মানব বিপর্যয় এদেশে ঘটে গেছে। পরবর্তীতে ভালোভাবে ত্রান তৎপরতা শুরু হলেও প্রাথমিক দায়িত্বহীনতার কথা এখনো মানুষের স্মরণ আছে।

২৯ এপ্রিল আমাদের জীবনের স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসে বারবার স্মৃতিকাতর হয়, যাঁরা সেদিন এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন তাঁরা আর কোনদিন ফিরে আসেনি। সেই জন্য ২৯ এপ্রিল সকল দিক থেকে কক্সবাজারবাসী তথা উপকূলবাসীর জন্য ব্যথা বেদনার, দুঃখজনক এক মহাকাব্য, যেটা হাজার হাজার মৃত্যুর মাধ্যমে রচিত।

২৯ এপ্রিলের এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সেই বিপর্যয়কর দিনে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছিলেন তাঁদের কথা। এই দিনে আমরা তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। আজকের দিনে নিহতদের আত্মীয় স্বজন পরিবার পরিজনদের প্রতি আমরা সমবেদনা প্রকাশ করছি। জীবনের কাছে স্মৃতিশ্বর দিন হিসেবে ২৯ এপ্রিল বেঁচে থাকবে হাজার বছর ধরে শোকাবহ দিন হিসেবে, স্বজন হারানোর দিন হিসাবে।

লেখক : সম্পাদক-কক্সবাজার ভয়েস ডট কম,সাংবাদিক, গবেষক, পরিবেশবিদ, ।

ই-মেইল : [email protected]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •