মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

বৈশ্বিক মহামারী করোনা যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনের অকুতোভয় সেনানী হিসাবে যাঁরা কাজ করছেন, তাদের অন্যতম একটা গ্রুপ হল চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য কর্মী, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ডবয়, হাসপাতালের ক্লিনার, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য বিভাগের সব ধরণের স্টাফ। করোনা সংকটের এই মহাদূর্যোগে তারাই নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা ঝুঁকি উপেক্ষা করে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন দিবা রাত্রি ২৪ ঘন্টা। কিন্তু করোনা যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনের দুঃসাহসিক এই যোদ্ধাদের সরকারিভাবে পর্যাপ্ত সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি সর্বত্র আজ প্রশ্নবিদ্ধ। চিকিৎসক সমাজ ও স্বাস্থ্য কর্মীদেরকে নীতিনির্ধারণী মহল থেকে ঢাল তলোয়ার ছাড়া যুদ্ধে অবতীর্ন হতে বাধ্য করার বিষয়টা দেশের সচেতন মহলের কাছে আজ সমালোচিত। সরকারিভাবে সরবরাহকৃত পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস, এন্টি ভাইরাস ক্যাপ ও জুতো, হ্যান্ড স্যানিটাজার ইত্যাদির মান, ব্রান্ড ও গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই। আবার মানহীন (!) এসব পণ্যের সরবরাহও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে চলমান এই মহাসংকটে এসব নিয়ে অযথা সমালোচনা করছিনা। এখন সমালোচনার সময়ও নয়। শুধুমাত্র যেটা বলতে চেয়েছি, সেটাকে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীতা উপলব্ধি করাতেই এসবের অবতারণা।

মানহীন ও অপ্রতুল সুরক্ষা সামগ্রী দিয়ে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা ঝুঁকি উপেক্ষা করে নিরন্তর সেবা দিয়ে যাচ্ছেন যেসকল চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মীরা ভয়ানক করোনা ভাইরাসে সংক্রামিত হনননি, সেটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। এ পযর্ন্ত সারাদেশে প্রায় আড়াইশো চিকিৎসক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ২৬ এপ্রিল টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নবীন একজন মহিলা চিকিৎসকের স্যাম্পল টেস্টে করোনা ভাইরাস জীবাণু সনাক্ত করা হয়েছে। এটা অবশ্যই আতংকজনক ও শিক্ষনীয় বিষয়।

জানা গেছে, টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. টিটু চন্দ্র শীল নিজ উদ্যোগেই সেখানকার ৯ জন চিকিৎসক, ১৬ জন নার্স, ২৮ জন স্টাফের স্যাম্পল টেস্টের জন্য গত ২৪ এপ্রিল কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ল্যাবে পাঠান। ৫৩ জনের মধ্যে ২৬ এপ্রিল কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের প্রথম শিফটের স্যাম্পল টেস্টে মাত্র ২৮ বছর বয়সী উক্ত মহিলা চিকিৎসকের রিপোর্ট ‘পজেটিভ’ আসে। স্যাম্পল টেস্টের আগে কেউ কি জানতেন, ৩৯ তম বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের নবীন এই চিকিৎসক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। সবাই বলবেন, অবশ্যই না। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হলো করোনা ভাইরাস জীবাণু সনাক্ত হওয়া উক্ত মহিলা চিকিৎসকের শরীরে এখনো কোন করোনা ভাইরাসের উপসর্গ দৃশ্যত পরিলক্ষিত হয়নি। তাই বলবো, জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত সকল চিকিৎসক, নার্স সহ সব স্বাস্থ্য কর্মীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্যাম্পল টেস্টের ব্যবস্থা করা হউক। কারণ চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য কর্মীরা সুস্থ থাকলেই সাধারণ রোগী ও করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন। আর তাঁরাই অসুস্থ ও আক্রান্ত হয়ে, ক্ষেত্র বিশেষে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সাবেক সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈনুদ্দিনের ভাগ্য বরণ করতে হয়, তাহলে তো পুরো জাতিই অসহায় হয়ে যাবে। দেশের পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন চিকিৎসকের শরীরে করোনা ভাইরাস সনাক্ত হওয়ায় হাসপাতালের আউটডোর, ইনডোর সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে সবাইকে হোম কোয়ারান্টাইনে পাঠানো হয়েছে। একটি ব্যাংক, একটি বেসরকারি হাসপাতাল, ১২টি দোকান লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেের সকল চিকিৎসক ও স্টাফদের মনোবল ভেঙ্গে পড়েছে। যার জন্য সিভিল সার্জন ডা. মো. মাহবুবুর রহমানকে টেকনাফে নিজে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে আশ্বস্ত ও মনোবল চাঙ্গা করতে চেষ্টা করেছেন।

এভাবে অপরিকল্পিতভাবে চলতে থাকলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আরো চরম বিপর্যয় নেমে আসবে। তাই সময় থাকতে স্বাস্থ্য বিভাগের সকল চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য কর্মী, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ডবয়, হাসপাতালের ক্লিনার, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য বিভাগের সব ধরণের স্টাফদের শরীরের দ্রুততম সময়ে স্যাম্পল টেস্টের ব্যবস্থা নিন। সম্ভব হলে বেসরকারি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদেরও এই স্যাম্পল টেস্টের আওতায় আনুন। প্রয়োজনে ১৫ দিন অন্তর অন্তর তাঁদের স্যাম্পল টেস্টের ব্যবস্থা নিন।

আর করোনা ভাইরাস যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনের সৈনিকদের বিনয়ের সাথে অনুরোধ করবো, সরকার কখন মানসসম্মত ও স্বাস্থ্য সম্মত সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ দেবেন, সেদিকে আর চেয়ে না থাকে, আপনারা নিজেরাই নিজের উদ্যোগে সার্বক্ষণিক সুরক্ষিত থাকার চেষ্টা করতে হবে। যেদিন আপনারা এমবিবিএস প্রথমবর্ষে ভর্তি হয়েছেন, সেদিনই নিশ্চয়ই মানবসেবার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে মিশন শুরু করেছিলেন। সুতরাং পথ যতই কঠিন ও ঝুকিপূর্ণ হউক, আপনারা দেশের এই ক্রান্তিকালে এই মহৎ পেশা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে আপনাদের মন সায় দেবেনা। তাই, এখন আর টকশো, ভিডিও কনফারেন্স, বিবৃতি বা অন্য কোনভাবে আলোচনা-সমালোচনা, উপদেশ নয়, কিভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রেখে সর্বোত্তম স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া যায়, সেটাই চিন্তা করতে হবে প্রাণপ্রিয় চিকিৎসক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সকলকে।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের দায়িত্বশীল সুত্রে জেনেছি, কলেজের ল্যাবটিতে ২ শিফটে কাজ করা হলে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৯২টি স্যাম্পল টেস্ট করা যাবে। কিন্তু সেজন্য ল্যাবে পর্যাপ্ত জনবল নেই। দিন দিন স্যাম্পল সংগ্রহের সংখ্যা বাড়ছে। তাই প্রথমদিকে, স্যাম্পল জমা হওয়ার পর পরবর্তী ২৪ ঘন্টায় টেস্টের রিপোর্ট পসওয়া গেলেও এখন নাকি ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। রিপোর্টের হার্ডকপি তৈরি করতে আরো বেশি সময় লাগছে শুধু জনবল স্বল্পতার কারণে। এজন্য কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ল্যাবে আরো স্বক্ষমতা বাড়ানো উদ্দেশ্যে খুব দ্রুত জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। না হয়, স্যাম্পলের জট লেগে যাওয়ারও একটা আশংকা রয়েছে। আবার টেস্ট কিটের সংকট যাতে না হয়, সেদিকে সুনজর রাখতে হবে।

কক্সবাজার সার্বিক করোনা পরিস্থিতি তদারকির জন্য সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের একজন প্রভাবশালী সদস্য, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতায় কক্সবাজারবাসী পেয়েছেন। যেটা কক্সবাজারবাসীর জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। তাই কক্সবাজারের মাননীয় জেলা প্রশাসক ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্ণধার সিভিল সার্জন মহোদয় স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয় ঠেকাতে এসব বিষয় বাস্তবায়নে সহসায় উদ্যোগ নেবেন বলে আশা করছি।

(লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা।)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •